মিশরে উৎসবমুখর ঈদ উদযাপন প্রবাসী বাংলাদেশিদের
মিশরে উৎসবমুখর ঈদ উদযাপন প্রবাসী বাংলাদেশিদের

হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা ও ইসলামী ঐতিহ্যের ধারক প্রাচীন দেশ মিশরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, কুরবানির আবহ এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। স্থানীয় মিশরীয়দের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। রাজধানী কায়রোসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে ঈদের দিন ছড়িয়ে পড়ে তাকবির, ইবাদত, কুরবানি ও মানবিকতার অনন্য আবহ।

তাকবির ধ্বনিতে মুখর কায়রো

বুধবার (২৭ মে) ভোর হতেই কায়রোর আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে তাকবির ধ্বনিতে। ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ এই সুমধুর ধ্বনি মিশরের অলিগলি, মসজিদ ও আশপাশের পরিবেশে সৃষ্টি করে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ। ফজরের নামাজের পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে দলে দলে মুসল্লিরা ছুটে যান ঈদের জামাতে অংশ নিতে।

ঐতিহাসিক মসজিদে উপচেপড়া ভিড়

রাজধানী কায়রোর ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদ, আমর ইবনুল আস মসজিদ, সায়্যিদা জয়নব মসজিদসহ দেশটির বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদে মুসল্লিদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। দেশটির প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয়ের প্রায় ২০ মিনিট পর সারাদেশে একযোগে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। শাফেয়ি মাযহাব অনুসরণকারী অধিকাংশ মিশরীয় মুসল্লি প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত সাত তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ তাকবিরের মাধ্যমে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নামাজ শেষে ভিন্ন সংস্কৃতি

নামাজ শেষে খুতবা অনুষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশের মতো দীর্ঘ সময় অবস্থান, সম্মিলিত মোনাজাত কিংবা ব্যাপক কোলাকুলির সংস্কৃতি মিশরে খুব একটা দেখা যায় না। অধিকাংশ মুসল্লিকে সালাম ফিরিয়েই দ্রুত মসজিদ বা ঈদগাহ ত্যাগ করতে দেখা যায়। তবে যেসব মসজিদ ও মাঠে বাংলাদেশিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন, সেখানে ভিন্ন এক আবহ চোখে পড়ে। নামাজ শেষে কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময়, একসঙ্গে ছবি তোলা এবং স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার দৃশ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। অনেক সময় বাংলাদেশিদের এই আন্তরিক সামাজিক সংস্কৃতি স্থানীয় মিশরীয়দেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

কুরবানির ব্যাপক আয়োজন

ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ কুরবানিকেও ঘিরে ছিল ব্যাপক আয়োজন। স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিভিন্ন স্থানে কুরবানির আয়োজন করেন। বিশেষ করে কায়রোর বিভিন্ন এলাকায় উট, গরু ও দুম্বা কুরবানি করতে দেখা যায়।

মানবিক কার্যক্রমে বাংলাদেশি সংগঠন

এবারও মানবিক কার্যক্রমে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনগুলো। গত বছরের ধারাবাহিকতায় মিশরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কুরবানির মাংস বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশের একাধিক মানবিক সংগঠন। এ বছর অন্তত ১০টি বাংলাদেশি সংগঠন এ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। এসব সংগঠনের উদ্যোগে কায়রোর বিভিন্ন এলাকা থেকে কুরবানির পশু সংগ্রহ করে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মাঝে মাংস বিতরণ করা হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশি সংগঠনই নয়, মিশরের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরাও অসচ্ছল মানুষের মাঝে বিপুল পরিমাণ কুরবানির মাংস বিতরণ করছেন। ফলে ঈদের আনন্দের পাশাপাশি মানবিক সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও ফুটে উঠেছে দেশটিতে।

শুভেচ্ছা বিনিময়ের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য

মিশরে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ধরনেও রয়েছে আলাদা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হলে তারা সাধারণত ‘কুল্লু সানা ওয়া আনতুম তাইয়িব’ অথবা ‘কুল্লু সানা ওয়া আনতুম বিখাইর’ বলে শুভেচ্ছা জানান। যার অর্থ ‘আপনাদের প্রতিটি বছর আনন্দ, শান্তি ও কল্যাণে ভরে উঠুক।’

প্রবাসে ঈদের আনন্দ

প্রবাসের মাটিতে পরিবার-স্বজন থেকে দূরে থেকেও ঈদের আনন্দ, ধর্মীয় আবেগ এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে নিজেদের একত্রিত রাখতে দেখা গেছে বাংলাদেশিদের। অনেকেই জানিয়েছেন, প্রবাসের ঈদে দেশের পরিবারের অভাব অনুভূত হলেও মিশরের ইসলামী পরিবেশ, তাকবিরের ধ্বনি এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের আবহ সেই শূন্যতাকে অনেকটাই পূরণ করে দেয়।

ইতিহাস, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে মিশরের এবারের ঈদ উদযাপন যেন আবারও স্মরণ করিয়ে দিল ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক মহিমান্বিত প্রতীক।