কল্পনা করুন, জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আপনি একটি দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটছেন। বাতাস হালকা হয়ে আসছে, পা দুটো ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, আর সামনের পথটা একদমই অচেনা। আপনি একটু থমকে দাঁড়ালেন এই আশায় যে, আপনার ভালোবাসার মানুষটি অন্তত একটু থামবেন, সাহায্যের হাত বাড়াবেন কিংবা ফিরে তাকিয়ে দেখবেন আপনি ঠিক আছেন কি না। কিন্তু তিনি থামলেন না। বরং আপনাকে ফেলে রেখেই সামনে এগিয়ে গেলেন এবং একসময় চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। আপনার পানির বোতলটি তার কাছে, ফোনের সিগন্যালও খুব দুর্বল। একাকী এই নির্জন দুর্গম পথে একটি ভুল বাঁক আপনার জীবনের জন্য কাল হতে পারে। ভীতি আর ক্লান্তির মাঝে আপনার মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাবে, আপনার যত্ন নেওয়ার কথা যার, তিনি কেন এভাবে একা ফেলে চলে গেলেন?
এই ভয়ংকর পরিস্থিতিটিই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, রেডিট আর এক্সে এখন এই শব্দবন্ধটি নিয়ে তোলপাড় চলছে। নারীরা শেয়ার করছেন পাহাড়ি অভিযানে গিয়ে সঙ্গীর হাতে পরিত্যক্ত হওয়ার সব রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা। আর এই আলোচনার মূলে রয়েছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা।
যে ঘটনায় শুরু এই তোলপাড়
৩৩ বছর বয়সী কার্স্টিন গার্টনারের মৃত্যু এই পুরনো আলোচনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গ্রসগ্লকনারে কার্স্টিনকে ফেলে চলে যাওয়ার দায়ে তার ৩৭ বছর বয়সী প্রেমিক থমাস প্লামবার্গারকে ‘গুরুতর অবহেলার কারণে মৃত্যু’র দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই জুটি যখন চূড়ার কাছাকাছি ছিলেন, তখন কার্স্টিন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। থমাসের দাবি, তিনি সাহায্য খুঁজতে নিচে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে চূড়ার মাত্র কয়েক মিটার নিচে কার্স্টিনের জমে যাওয়া মৃতদেহ পাওয়া যায়। আদালতের কৌঁসুলিরা যুক্তি দেন, ফোনের সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও থমাস যথাযথভাবে সাহায্য চাননি। বিচারক নরবার্ট হোফার রায়ে বলেন, ‘তিনি (কার্স্টিন) আপনার ওপর ভরসা করে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।’ বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিচারে থমাসের এক সাবেক প্রেমিকা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, ২০২৩ সালেও থমাস তাকে একই পাহাড়ে ফেলে চলে গিয়েছিলেন কারণ তার মনে হয়েছিল ওই নারী ‘খুব ধীরগতির’।
কী এই ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’?
‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ শব্দটির শেকড় অনেক পুরনো। ১৮৯৩ সালে স্কটিশ-কানাডিয়ান লেখক রবার্ট বারের একটি ছোটগল্পের নাম ছিল ‘অ্যান অ্যালপাইন ডিভোর্স’, যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যার পরিকল্পনা করেন। সময়ের বিবর্তনে এটি একটি অনানুষ্ঠানিক শব্দবন্ধে পরিণত হয়েছে, যা মূলত দুর্গম বা বিপজ্জনক স্থানে সঙ্গীকে ফেলে আসাকে বোঝায়। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীরা একে অপরকে সতর্ক করছেন এই বলে যে, ‘কখনও কোনও পুরুষের সঙ্গে একা পাহাড়ে যেও না’। ইনস্টাগ্রামে এক নারীর পাহাড়ে একা কান্নার ভিডিও কয়েক মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে, যেখানে লেখা ছিল, ‘সঙ্গীর সঙ্গে পাহাড়ে গিয়ে বুঝতে পারলেন সে আপনাকে কখনোই পছন্দ করত না।’
রেডিট ও কমেন্ট বক্সের হাড়হিম করা গল্প
সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্সগুলো যেন এখন একেকটি ‘স্বীকারোক্তি কেন্দ্র’। এক নারী লিখেছেন, তার বন্ধুর সাবেক সঙ্গী তাকে পাহাড়ে একা ফেলে এসেছিলেন। পরে ওই নারী পাহাড়ের পথ ভালো চেনার কারণে সঙ্গীর আগেই গাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। অন্য একজন লিখেছেন, তিনি এক নারীকে বিধ্বস্ত অবস্থায় পাহাড়ের পথে খুঁজে পান, যার বাগদত্তা তাকে কোনও খাবার, পানি বা ফোন ছাড়াই পেছনে ফেলে নিজের মতো হাঁটতে শুরু করেছিলেন। যখন তারা নিচে পৌঁছান, তখন ওই ব্যক্তিকে দেখা যায় গাছের ছায়ায় আরামে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সবচেয়ে শিউরে ওঠা গল্পটি এক মায়ের। তিনি দাবি করেছেন, তার সাবেক সঙ্গী তাকে এবং তার নবজাতক সন্তানকে এক জঙ্গলের ভেতর ফেলে চলে গিয়েছিলেন, যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল এবং চারপাশে নেকড়েরা ডাকছিল। রেডিটে এক নারী পেরুতে চার দিনের ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তার প্রেমিক পেশায় একজন ট্রেকিং গাইড হওয়া সত্ত্বেও তর্কের জেরে মাঝপথে তাকে খাবার-পানি ছাড়াই ফেলে উধাও হয়ে যান। ওই নারী লিখেছেন, ‘আমি শুধু নিজেকে বারবার বলছিলাম, সে আমাকে ফেলে চলে গেলো! সে সত্যি আমাকে ফেলে গেলো!’
মনস্তত্ত্ব কী বলে?
আচরণগত মনোবিজ্ঞানী জো হেমিংস জানান, ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ কোনও আইনি শব্দ না হলেও এর পেছনের আচরণটি বাস্তব। এই ধরনের মানুষেরা সাধারণত সহমর্মিতার অভাব এবং এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখান। তারা সরাসরি সমস্যার সমাধান না করে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া পছন্দ করেন। হেমিংস আরও বলেন, পাহাড়ি পরিবেশে সঙ্গীদের মধ্যে ক্ষমতার একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। একজনের হাতে হয়তো দিকনির্ণয় বা গতির নিয়ন্ত্রণ থাকে। সঙ্গীর সঙ্গে তাল না মিলিয়ে সামনে হাঁটা আসলে নিজের কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ জাহির করার একটি সূক্ষ্ম পথ হতে পারে। আর দুর্গম এলাকায় এই মানসিক দূরত্বই জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
সূত্র: সিএনএন



