গত কয়েক দশক ধরেই ভয়ানকভাবে প্লাস্টিক দূষণের মুখে পড়ছে পৃথিবী। মানুষের মস্তিষ্ক, রক্ত, বুকের দুধের পাশাপাশি নাড়ি ও ধমনিতে প্রবেশ করছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এখন নদ-নদী ও সমুদ্রের মাছের পেটেও প্লাস্টিকের কণা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্লাস্টিক দূষণ এখন আর কেবল দূর সমুদ্র বা শিল্পাঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি সরাসরি মানুষের প্রতিদিনের খাবার টেবিলে যাচ্ছে। সেখান থেকে পেটে।
গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ। ১০-৩০ সেন্টিমিটার গভীরতার পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ক্যাডমিয়াম-সিসার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যা পরিবেশবিদদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর প্রভাবে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
গত জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস’-এ প্রকাশিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। যবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিশাত সালসাবিল, মো. তৌহিদুজ্জামান, তাপস কুমার চক্রবর্তী ও গোপাল চন্দ্র ঘোষ গবেষণাটি করেন। গবেষণার জন্য ভৈরব ও রূপসা নদীর ৯টি জনবহুল পয়েন্ট থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষকরা ভৈরব-রূপসার নদীর দূষণ পর্যবেক্ষণে ভৈরব নদের যশোর অংশের রূপদিয়া, নওয়াপাড়া, খুলনার ফুলতলা, সিএসডি ঘাট, শোলপুর, জেলখানা ঘাট, রূপসা নদীর রূপসা সেতু, তেঁতুলতলা বোট ঘাট ও বটিয়াঘাটা এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে রূপদিয়া উজান ও বটিয়াঘাটা ভাটির স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
নদীর ১০-৩০ সেন্টিমিটার গভীরতায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিক
এসব স্থানের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৭০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা রয়েছে। গড়ে এই সংখ্যা ৩ হাজার ৬০০টি। মধ্যস্তরে এই সংখ্যা কমে গড়ে ২ হাজার ৭৪৪টি ও নিচের স্তরে ১ হাজার ৭৭টি আছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে প্রধানত ফ্র্যাগমেন্ট মিলেছে ৫১ শতাংশ, ফাইবার ২৬ শতাংশ ও ফিল্ম ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে পলিইথিলিনের হার ২৩ শতাংশ, পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ ও ও পলিপ্রোপিলিন ১৮ শতাংশসহ ৭ ধরনের পলিমারের উপস্থিতি ছিল। নমুনায় নদীর তলদেশের ১০-৩০ সেন্টিমিটার গভীরতায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া
মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি নদীর তলদেশে ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া উচ্চমাত্রায় ধরা পড়েছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। এর ফলে বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলো মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
লোকালয়ের প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে, যাচ্ছে মাছের পেটে
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীসহ যশোর নওয়াপাড়া ও আশপাশ এলাকা থেকে প্রচুর বর্জ্য পড়ছে ভৈরব ও রূপসা নদীতে। খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খাল-নালা থেকে ২২টিরও বেশি ড্রেন হয়ে ভৈরব ও রূপসা নদীতে মিশছে বর্জ্য। নওয়াপাড়া এলাকায় গড়ে ওঠা ট্যানারিসহ শিল্প-কারখানার কেমিক্যাল বর্জ্য সরাসরি পড়ছে ভৈরব নদে। ফলে দিন দিন বিষাক্ত ধাতুতে ভারী হয়ে উঠছে নদীর তলদেশ।
জাতিসংঘের ওয়েস্ট ওয়াইজ সিটিস টুল-এর মাধ্যমে ২০২১ সালের সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে খুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৭৩২ টন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। যার মধ্যে সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৪৬১ টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে। বাকি বর্জ্য ড্রেন, খাল ও নদীতে ফেলা হয়। এসব বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে রান্নাঘর বা ক্যান্টিনের বর্জ্য ৭৭-৮০ শতাংশ, ফিল্ম ৩-৫ শতাংশ, কাগজ-বোর্ড ৫ শতাংশ ও বাকি অংশ কঠিন প্লাস্টিক, ধাতু, কাচ ও টেক্সটাইল প্রভৃতি। অবশ্য বেসরকারি হিসেবে মহানগরীতে প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। গবেষক ও পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রোনেটসিয়াল রিকস ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স (পিইআরআই) বা পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, এই নদীর পলিতে দূষণের মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ বা ক্লাস ভি পর্যায়ের। ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের আধিক্য নদীটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং সরাসরি নর্দমার সংযোগ নদীর স্বাস্থ্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সুন্দরবনেও প্লাস্টিকের আগ্রাসন
পরিবেশবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাবে অনেকে সুন্দরবনে গিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল, প্লেট ও গ্লাস ফেলছেন বনের মধ্যে মাটি ও নদীতে। বন-সংলগ্ন ৮০টি গ্রাম থেকে ৫২টি নদী-খাল হয়ে জোয়ারের পানিতে বনে ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিক। এতে বনের পুরো জীববৈচিত্র্য প্লাস্টিকের আগ্রাসনের মুখে পড়ছে। এটি বন্ধে নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর আইন ও টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামের বাজার ও বসতবাড়ির আশপাশে নদীতীরে প্লাস্টিকের বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। শাকবাড়িয়া, কয়রা ও সিবসা নদীর তীরবর্তী বাজারগুলোতে কাপ, প্লেট, বোতল ও চিপসের প্যাকেট জমে আছে, যা জোয়ারের পানিতে ভেসে যাচ্ছে সুন্দরবনে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে রূপসা, আঠোবেকী ও ভৈরবে মাছ শিকার করেন পূর্ব রূপসা পাড়ের মৎস্যজীবী জাবেদ হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দিন দিন নদীর মাছ কমছে। পানি ভালো না। আগে নদীতে জাল ফেললেই মাছ পেতাম। এখন আর সেই অবস্থা নেই। বেঁচে থাকাই কষ্ট। একাধিক স্থানে জাল ফেলেও মাছ পাওয়া যায় না। এখন নদীর তীরে ও পানিতে প্লাস্টিকের বোতলসহ নানা আবর্জনা ভাসতে দেখি।’
গবেষণা কী বলছে
কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুন্দরবনভিত্তিক গবেষণা ও তথ্যসমৃদ্ধ ম্যাগাজিন ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’-তে বলা হয়েছে, হুগলি নদীর মাধ্যমে কলকাতা শহর থেকে প্রতিদিন বিপুল বর্জ্য সুন্দরবনে যায়। হুগলির পানিতে প্রতি ঘনমিটারে ৪৫০ থেকে ১ হাজার ২০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। আর বাংলাদেশের সুন্দরবনের পশুর নদে গবেষণায় দেখা গেছে, বর্ষার আগে পানিতে গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮১ হাজার ৫৬টি কণা ও পলিতে ৪৭টি কণা, যা বর্ষার পরে কমে যথাক্রমে ৭৩ হাজার ৭২২ ও ৪১টি কণায় নেমেছে। ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবনে ফাইবারজাতীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি।
ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়ন ভট্টাচার্য বলেন, ‘সুন্দরবনে মাছ ধরার পরিত্যক্ত প্লাস্টিক জাল থেকে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়। এতে গাছের বৃদ্ধি ও অঙ্কুরোদ্গম ব্যাহত হয়। সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরের প্রাণিদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলের মানুষ প্রতিদিন বাদাবন থেকে ধরা মাছ খাওয়ায় তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব সূক্ষ্ম কণা ফুসফুস ও বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে
নদীর তলদেশে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক বলে জানালেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভৈরব-রূপসাসহ আশপাশের নদীতে প্রতিনিয়ত শিল্পকারখানার কেমিক্যাল, শহর ও নগরের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বাধাহীনভাবে পড়ছে। এসব নদীর প্রবাহ সরাসরি সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত। জোয়ার-ভাটার কারণে এই দূষিত পলি ও কণাগুলো ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে। যা সুন্দরবনের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও ভারসাম্যকে আরও বিপদাপন্ন করে তুলছে। এ অবস্থা থেকে সুন্দরবন, উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী দূষণমুক্ত ও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে আমাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।’
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘জোয়ার ভাটার প্রভাবে এসব বিষাক্ত ও ভারী বর্জ্য সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুরো উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এই থেকে উত্তরণে এখন থেকেই কলকারখানাসহ গৃহবর্জ্য সরাসরি নদ-নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। শিল্পবর্জ্য রিসাইকেল করে দূষণের মাত্রা কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য আগে জনসচেতনতা সৃষ্টি জরুরি। শিল্প বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। না হয় হুমকিতে পড়বে মানুষের জীবন ও পরিবেশ।’
বাঁচবেন কীভাবে
মাছের পেটে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচতে মাছ খাওয়ার আগে তার পেট (নাড়িভুঁড়ি) ফেলে দেওয়া এবং ধোয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত ছোট মাছ এবং গভীর জলের মাছ বেছে খাওয়া বেশি নিরাপদ। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণাগুলো মূলত মাছের পাকস্থলী ও অন্ত্রে জমে থাকে। তাই মাছ রান্নার আগে খুব ভালোভাবে পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি ও ময়লা অংশ ফেলে দিন। নাড়িভুঁড়ি ফেলার পর মাছটি প্রবাহিত পানির নিচে বা কলের পানিতে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিন, যাতে পেটের ভেতরের কোনও অংশ লেগে না থাকে। বড় মাছের চেয়ে তুলনামূলক ছোট মাছ খাওয়া ভালো। এ ছাড়া সামুদ্রিক ও নদীর দূষিত এলাকার মাছের চেয়ে চাষ করা (ফার্মের) মাছ বা গভীর জলের মাছ খাওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। মাছ খাওয়ার সময় কাঁটার পাশাপাশি পেটের দিকের অংশ বা চামড়া এড়িয়ে চলতে পারেন, কারণ অনেক সময় চামড়ার নিচেও ক্ষতিকর কণা জমে থাকতে পারে। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। সচেতনতা ও সঠিক প্রক্রিয়ায় মাছ প্রস্তুত করার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।



