সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন, জুলাই থেকে শতভাগ এ-চালান
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন, জুলাই থেকে শতভাগ এ-চালান

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের সব সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি শতভাগ অনলাইনভিত্তিক ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে চালু থাকা ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার (১৯ মে) প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে, নগদ অর্থের প্রকৃত অবস্থান রিয়েল টাইমে জানা যাবে এবং অপ্রয়োজনীয় ঋণনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংকে ছড়িয়ে থাকা সরকারি অর্থ কেন্দ্রীয় হিসাবের আওতায় চলে এলে সরকারের নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কেন এই সিদ্ধান্ত

অর্থ বিভাগ বলছে, সরকারি অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ছড়িয়ে থাকার কারণে সরকারের প্রকৃত নগদ স্থিতি নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কমছে, অপরদিকে সরকারের হাতে থাকা অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য খাতে প্রয়োজন মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অলস পড়ে থাকছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট মূলত সরকারের কেন্দ্রীয় নগদ ব্যবস্থাপনার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সরকারের সব আয়-ব্যয় একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর মধ্যে আসে। এতে সরকারের হাতে কত নগদ অর্থ রয়েছে, কোথায় কত জমা আছে এবং কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে— এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০১৮ সাল থেকে চালু ‘এ-চালান’

সরকার ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে অনলাইনে সরকারি রাজস্ব জমা দেওয়ার জন্য ‘এ-চালান’ ব্যবস্থা চালু করে। ৫৬ ডিজিটের বিশেষ কোডের মাধ্যমে নাগরিকরা অনলাইনে সরকারি ফি, কর, ভ্যাট, সেবা মূল্য ও অন্যান্য অর্থ জমা দিতে পারেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকে সরাসরি না গিয়েও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও অনেক সরকারি অফিস পুরোপুরি এই ব্যবস্থায় আসেনি। কোথাও কোথাও পুরনো চালান বই ও ম্যানুয়াল কোড ব্যবহার করে অর্থ জমা নেওয়া হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে দুর্নীতি, বিলম্ব ও হিসাব জটিলতা অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আসবে।

কী কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে

পরিপত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি সম্পূর্ণ বন্ধ হবে এবং সরকারি সব ধরনের রাজস্ব ও প্রাপ্তি শতভাগ ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে জমা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা অধীনস্থ অফিস যদি নিজস্ব কোনো আলাদা রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা বা সফটওয়্যার চালু রাখে, তবে তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারি দফতরগুলোর নামে বাণিজ্যিক ব্যাংকে থাকা সব অর্থ আগামী ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে হবে।

বাড়বে নজরদারি, কমবে অনিয়ম

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় সংস্কার পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নিজস্ব ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করায় অর্থ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। অনেক সময় কোন দফতরের কাছে কত অর্থ জমা আছে, তা কেন্দ্রীয়ভাবে জানা যেতো না। এখন সব অর্থ টিএসএ-তে চলে এলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক একই প্ল্যাটফর্মে সরকারি নগদ প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এতে ব্যয় পরিকল্পনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।

তবে বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক সরকারি অফিস এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল অবকাঠামোর আওতায় আসেনি। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও ম্যানুয়াল পদ্ধতির সঙ্গে অভ্যস্ত। ফলে শতভাগ এ-চালান বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কঠোর তদারকি প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুদের ব্যয় কমানোর কৌশল

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের নগদ অর্থ একক হিসাবের আওতায় এলে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমবে। কারণ বর্তমানে অনেক সময় সরকারের একদিকে ব্যাংকে অলস অর্থ পড়ে থাকে, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হয়। এই বৈপরীত্য দূর করতেই মূলত টিএসএ-কেন্দ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হচ্ছে। এতে সরকারের ঋণের সুদ ব্যয় কমবে এবং সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।