মা-সন্তানের সম্পর্ক সবসময়ই আবেগ, দায়িত্ব আর ভালোবাসার মিশেলে গড়া। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বদলেছে এই সম্পর্কের ধরন। বিশেষ করে ‘জেনারেশন জেড (জি)’ বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের সঙ্গে তাদের মায়েদের সম্পর্ক যেন পেয়েছে নতুন এক মাত্রা। রবিবার (১০ মে) আন্তর্জাতিক মা দিবস উপলক্ষে এ বিষয়ে অভিমত জানতে চাওয়া হয় কয়েকজন নতুন প্রজন্মের সন্তানদের কয়েকজন মায়ের কাছে। তারা বলছেন, নতুন মাত্রার এই সম্পর্কে বন্ধুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি এসেছে বোঝাপড়ার নতুন ধরন। সেইসঙ্গে এক ধরনের দূরত্বের অনুভূতিও বেড়েছে। যেখানে একই ছাদের নিচে থেকেও যেন তাদের অবস্থান যোজন-যোজন দূরে।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন তাদেরই মূলত বলা হয় ‘জেনারেশন জেড’ বা ‘জেন জি’ প্রজন্ম। এই প্রজন্মের সদস্যদের বয়স বর্তমানে ১৪ থেকে ২৯ বছর। আর এদের আগের প্রজন্মের ক্যাটাগরি ‘জেনারেশন ওয়াই’; যাদের ‘মিলেনিয়ালস’ও বলা হয়। এদের জন্ম ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে।
আলোচিত এই ‘জেন-জি’ জেনারেশনের অভিভাবকরা বলছেন, সন্তানের পড়াশোনা, শাসন ও প্রয়োজন পূরণে তারা দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জায়গাটিও সমানভাবে বজায় রাখেন। অনেক সময় সন্তানদের কাছ থেকেও তারা নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কেও জানতে পারেন, শিখতে পারেন। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এই প্রযুক্তিই তাদের মধ্যে তৈরি করছে এক অদৃশ্য দেয়াল।
জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে মায়েদের সম্পর্ক কেমন
বর্তমানের জেন-জি প্রজন্মের সন্তানদের সঙ্গে মায়েদের সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে বলে মনে করেন এই প্রজন্মের সন্তানের মা আফসারি খানম মিষ্টি। নিজের সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, এই সম্পর্কটা মূলত বন্ধুত্বপূর্ণ। একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি মেয়ের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করার চেষ্টা করেছেন, যাতে ভাইবোন না থাকার কারণে একাকিত্ব অনুভব না করে। অভিভাবক হিসেবে সন্তানের পড়াশোনা, শাসন ও প্রয়োজন পূরণে তিনি দায়িত্ব পালন করেন, তবে বন্ধুত্বের জায়গাটিও সমানভাবে বজায় রাখেন।
অবশ্য এই বন্ধুত্বের জায়গাটার ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিমত আছে জেন-জি প্রজন্মের সন্তানের আরেকজন মা, উদ্যোক্তা কাকলী তানভীরের। তার মতে, আসলে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় না। তিনি বলেন, ‘সন্তান যদি মা-বাবাকে বন্ধু মনে করে, তাহলে সে নিজের বাউন্ডারি শেখে না। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চারা মা-বাবার কাছ থেকে শেখে—কতটা কথা বলা যায়, অন্যের সামনে মা-বাবাকে অসম্মান করা যায় কিনা, কতটা রূঢ় আচরণ করা যায়, ইতিবাচক ও নেতিবাচক আবেগ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়; সবকিছু। এই ইমোশন ও বিহেভিয়ারের রেগুলেশন বাচ্চারা প্যারেন্টসদের কাছ থেকেই শেখে। যদি সে মনে করে মা-বাবা তার বন্ধু, তাহলে সেই সীমারেখাগুলো আর তৈরি হয় না।’
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে কাকলী বলেন, ‘আমি অনেক বাচ্চাকে দেখেছি যাদের মা-বাবা ছোটবেলা থেকে “আমি তোমার বন্ধু” বলতে বলতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে তারা বন্ধু মানে ‘ইয়ার-দোস্ত’ ভেবে ফেলে। ফলে গায়ে হাত রেখে কথা বলা, যা খুশি তাই বলা, অন্যের সামনে মা-বাবাকে অপমান করা—এসব আচরণ বেড়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানদের স্পষ্ট করে বলেছি ‘‘আই অ্যাম ইওর প্যারেন্ট, নট ইওর ফ্রেইন্ড’’। আমি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করি। তারা সবকিছু আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। তাদের সবকিছুকেই আমি গুরুত্ব দিই। কিন্তু তার মানে এই না যে তারা বেয়াদবি করবে বা সীমা অতিক্রম করবে। তাই আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্ব নয়, বরং বন্ধুত্বপূর্ণ একটি অভিভাবকসুলভ সম্পর্ক।’
আবার একই প্রজন্মের আরেক সন্তানের মা জ্যোতি তার মেয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে বলেন, ‘মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধুর মতোও নয়, আবার কেবল অভিভাবকসুলভও নয়; বরং মাঝামাঝি ধরনের।’ তিনি বলেন, ‘১৪ বছর বয়সী মেয়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিষয় লুকিয়ে রাখার প্রবণতা আছে। সব কথা জানতে চাইলেও মেয়ে সবসময় শেয়ার করতে চায় না।’ তবে এটা অনেক সময় বয়োসন্ধিকালে হয়ে থাকে বলেও উল্লেখ করে তিনি।
জ্যোতি বলেন, ‘এই সময়ের মায়েরা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, যাতে সন্তানরা স্কুল, বন্ধু, চলাফেরা বা ব্যক্তিগত যেকোনো বিষয় বাবা-মায়ের সঙ্গে শেয়ার করে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, সন্তানরা অনেক সময় মনে করে বাবা-মা অতিরিক্ত প্রশ্ন করছেন। আমার মেয়েও কখনো কখনো এমন মনে করে বিরক্ত হয়।’
আগের প্রজন্মের মা-সন্তানের সম্পর্কের সঙ্গে জেন-জি’দের পার্থক্য কী
আগের প্রজন্মের মা-সন্তানের সম্পর্কের থেকে জেন-জি প্রজন্মের মা-সন্তানের সম্পর্কে বড় পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন অভিভাবকরা। তারা জানান, আগের সময়ে মায়েরা সন্তানদের সঙ্গে এতটা খোলামেলা ছিলেন না। একধরনের সংকোচ ছিল, ভয়ের ব্যাপার ছিল। শারীরিক ও মানসিক বিষয়ে সরাসরি কথা বলতেও অস্বস্তি বোধ করতো। এখন সেটা অনেকটাই বদলেছে। এখনকার জেন-জি প্রজন্ম মায়েদের সঙ্গে অনেক কিছুই শেয়ার করছে। একইসঙ্গে জেন-জি জেনারেশনে ছেলে-মেয়েরা অনেকক্ষেত্রে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’, ‘বেপরোয়া’ এবং ‘অন্যের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়’—এমনটাও মনে করেন কেউ কেউ। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা।
দুই প্রজন্ম নিয়ে তুলনা করতে গিয়ে জেন-জি সন্তানের মা কাকলী তানভীর বলেন, ‘বলা যায়, দুই মেরুর দুই রকম প্যারেন্টিং ও চাইল্ডহুড। আমাদের সময়ে বেশিরভাগ মা বাসায় থাকতেন, খুব কম মা চাকরি করতেন। বাবারা বাইরে কাজ করতেন। তখনকার সামাজিক বাস্তবতা, মিডিয়ার প্রভাব—সবই ছিল ভিন্ন। আমাদের অনেক মা ছিলেন খুব কড়া। আমরা জানতাম, মা ধরলে সেদিন আর রক্ষা নেই। একটা ভয়ের জায়গা কাজ করত। স্কুলে মা-বাবারা তেমন যেতেন না, বাচ্চার মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টাও করতেন না। কেউ বুলি হচ্ছে কি না, মন খারাপ করছে কি না—এসব নিয়ে ভাবতেন না। আমাদের শিখন ছিল—পড়াশোনা ঠিকমতো করতে হবে, ভালো রেজাল্ট করতে হবে, বাইরে থেকে অভিযোগ এলে সমস্যা হবে। মা-বাবাকে ভয় পাওয়ার একটা সংস্কৃতি ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনকার প্রজন্মে এসে মা-বাবারা উল্টো এক্সট্রিমে চলে গেছেন। আমরা সন্তানদের প্রতি অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিতে গিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে গেছি, যেখানে তারা “না” শুনতে পারে না। তারা ভাবে পৃথিবীটাও মা-বাবার মতোই তাদের সবকিছু মেনে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা তো তা নয়। ফলে রিজেকশন, চ্যালেঞ্জ বা ব্যর্থতা এলে তারা প্যানিক করে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আমি মনে করি, এর জন্য এই প্রজন্মের মা-বাবারা ভীষণভাবে দায়ী। সন্তান যদি অমানবিক হয়, সমাজে খাপ খাওয়াতে না পারে, তার ভোগান্তি আগে মা-বাবাকেই পোহাতে হয়। আমরা সন্তানদের এমন স্বাধীনতা দিয়েছি, যেখানে তারা কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল—সেটা বোঝার আগেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাচ্ছে।’
জেন-জি প্রজন্মের দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে কাকলী বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই জেনারেশন খুব বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন, বেপরোয়া এবং অন্যের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। তারা নিজেদের নিয়েই এত ব্যস্ত যে অন্যের ভালো থাকা নিয়ে খুব একটা ভাবে না। ওদের অনেকের মানসিকতা এমন—সবাই আমার জন্য কাজ করবে, কিন্তু আমি কাউকে সার্ভিস দেব না। ওদের শর্টকাটে বড় হতে চাওয়া, দায়িত্ব এড়িয়ে চলা—এসব খুব ভয়ের বিষয়।’
আগের প্রজন্মে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ‘ভালোবাসা ও ভয়ের’ একথা জানালেন আফসারি খানমও। তবে তিনি মনে করেন, এখনকার সম্পর্কেও সম্পূর্ণ ভয়ের অনুপস্থিতিও ভালো নয়। ভালোবাসা থাকবে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু ভয়ের জায়গাটাও থাকতে হবে। যাতে সন্তান বুঝতে পারে, অন্যায় করলে বাবা-মা শাসন করবেন। আর সন্তানকেও ছোটবেলা থেকেই শিখিয়ে দিতে হবে ন্যায়-অন্যায় বা ভালো-মন্দ কোনটা।
জ্যোতি বলেন, জীবনযাপন, পোশাক বা খাবারের বিষয়ে মতপার্থক্য হলে তিনি বেশিরভাগ সময় সন্তানের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে কোনো কিছু ক্ষতিকর মনে হলে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
খাবারের পছন্দ নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানিয়েছেন জেন-জি প্রজন্মের শিশুর মা সঞ্চিতা নিজাম। পেশায় সংবাদকর্মী এই মা বলেন, আমার তিনটি সন্তান। তাদের তিনজনের পছন্দের খাবার তিনরকম। আমরা যেমন খাবার টেবিলে একইরকম খাবার খেয়ে বড় হয়েছি, এখনকার শিশুরা তা মানতে চায় না। তাদের জন্য আলাদা পছন্দের খাবারই দিতে হয়। তা নাহলে তারা অভিযোগ করে যে তারা মায়ের ‘ভালোবাসাটা’ পাচ্ছে না। আমার মনে হয়, এই প্রজন্মটা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। তবে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বিষয়টা ব্যক্তি ও পরিবারভেদে ভিন্নতা অবশ্যই আছে।
বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ববোধ প্রসঙ্গে শামীমা সুলতানা নামের এক অভিভাবক বলেন, এখন বেশিরভাগ পরিবারে এক বা দুই সন্তান হওয়ায় অনেক সময় সন্তানদের মধ্যে দায়িত্ববোধ দেরিতে তৈরি হয়। আগে সময় অনেক ভাইবোনের পরিবারে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ব ভাগাভাগি করার অভ্যাস তৈরি হতো, যা এখন কম দেখা যায়। এই দায়িত্ববোধ থাকাটা খুবই জরুরি। অন্যথায় এটা ভবিষ্যতে সুন্দর পারিবারিক পরিবেশের জন্য বাধা হয়ে উঠতে পারে।
অভিভাবকরা বলেন, এখনকার ছেলে-মেয়ে অর্থাৎ জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে মানিয়ে চলতে প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। কারণ এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হঠাৎ করেই রেগে যায়। খুব রিয়্যাক্টিভ ওরা। নিজেরা যেটা বুঝে সেটাই ভাবে সঠিক। তাই এদের বোঝাতে ধৈর্যের প্রয়োজন পরে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এগুলো খুব আপেক্ষিক এবং অনেকটাই অনুমাননির্ভর কথা। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি—শিক্ষার মান নাকি কমছে। যদি সত্যিই সবকিছু শুধু কমতেই থাকত, তাহলে তো সমাজ অনেক আগেই ভেঙে পড়ত। এখন যদি বলা হয় ছেলেমেয়েদের দায়িত্ববোধ নেই, তাহলে তারা চলবে কীভাবে? অবশ্যই দায়িত্ববোধ আছে। তবে কারও বেশি, কারও কম। আর এটা অনেকটাই নির্ভর করে অভিভাবকের ওপর—তিনি তার সন্তানকে কতটা দায়িত্বশীলভাবে গড়ে তুলতে পারছেন।’
প্রযুক্তি দূরত্ব বাড়াচ্ছে, আবার কাছেও আনছে
জেন-জি প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সাথে তাদের বাবা-মায়ের বা অন্যান্য স্বজনদের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি করেছে প্রযুক্তি। তারা সামনা-সামনি আলোচনা বা আড্ডার থেকে ভার্চুয়ালি আড্ডায় বেশি যুক্ত থাকেন এবং তারা বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়েই বেশি সময় কাটান বলেও জানান অনেক অভিভাবক। একইসঙ্গে অভিভাবকরা এটাও স্বীকার করেন যে এই প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে সন্তানদের কাছেও তারা পৌঁছাতে পারেন, শিখতে পারেন নতুন কিছু।
সাধারণভাবে দেখলে প্রযুক্তি অবশ্যই দূরত্ব তৈরি করছে, তবে নিজের সন্তানদের এমনটা হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ওদের বলেছি, তুমি এই পরিবারের সদস্য, তাই এই পরিবারের কিছু ভ্যালু তোমাকে মানতে হবে। আমার বড় মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছে, খুব ব্যস্ত থাকে, তবুও এখনো আমাদের সঙ্গে দাওয়াতে যায়, একসঙ্গে খায়, ঘুরতে যায়। আমরা ওদের বোঝাতে পেরেছি—ভার্চুয়াল জগৎ অনেকটাই ফেক, মানুষের সম্পর্কই আসল।’
সাইবার জগতে সন্তানদের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বাচ্চাকে শেখাতে হবে—সাইবার স্পেসে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয়, কী ধরনের বিপদ আছে, মানুষ কীভাবে ভিকটিম বানাতে পারে, কোন ধরনের কনটেন্ট অনৈতিক বা ক্ষতিকর। মা-বাবার নিজেদেরও এই বিষয়ে ন্যূনতম লিটারেসি থাকা দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অনেক বাচ্চাই এখন মা-বাবাকে বলে—‘তুমি কিছু জানো না।’ এটা ভাবার কারণেই এবং অভিভাবকদের অজ্ঞতার কারণেই অনেক বাচ্চা বিপদে পড়ছে। আমাদের মতো দেশে সামাজিক সচেতনতা বা ট্রেনিংয়ের সুযোগ কম, তাই প্যারেন্টাল গাইডেন্সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জ্যোতি বলেন, এখকার বাচ্চাদের আচরণ কেমন যেন! আমাদের সময় আমরা ভাই-বোনরা মানে কাজিনরা একসাথে হলে আমাদের গল্প শেষ হতো না। আমরা প্রচুর আড্ডা দিতাম। আর ওদের (জেন-জি প্রজন্ম) দেখি সবাই একসাথে হলেও সবাই যার যার ফোন নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এমনতো না যে ওদের রেগুলার দেখা হচ্ছে। এটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লাগে।
তবে প্রযুক্তির কারণে নিজের সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন না শামীমা সুলতানা। তিনি জানান, সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানোর চেষ্টা করেন। একসঙ্গে টিভি দেখা, বাইরে ঘুরতে যাওয়া বা খেতে যাওয়ার মতো কাজগুলো তাদের সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি রাখে।
তিনি জানান, সন্তানের কাছ থেকে তিনি প্রযুক্তির নানা বিষয় শিখেছেন—মোবাইল ফোনের ছোট ছোট সেটিংস, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি (এআই) ও অনলাইন মাধ্যম ব্যবহারের দক্ষতা ও নিরাপদে চালানোর পদ্ধতি শিখেছেন করেছেন মেয়ের সহায়তায়। এতে করে তার সাথে মেয়ের সখ্যতা আরও সুন্দর হয়েছে। তবে তিনি এও বলেন যে, ভার্চুয়াল জীবনের চেয়ে বাস্তব জীবন দেখার গুরুত্ব অনেক বেশি।
‘জেনারেশন গ্যাপ নতুন কিছু নয়’
জেন-জি প্রজন্মের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের অভিভাবকদের মতের অমিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এটা নতুন কোনো বিষয় না, এটা হচ্ছে জেনারেশন গ্যাপ। আমাদের বাপ-দাদারাও একই কথা বলে গেছেন—তাদের সঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের মিলতো না। এই জেনারেশন গ্যাপ সবসময়ই ছিল এবং থাকবে। এই গ্যাপ পুরোপুরি কমিয়ে আনা যাবে না। কারণ, প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম যেভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, আমরা কি সেভাবে পরিচিত ছিলাম?’
এখনকার যুগ ‘ডিজিটাল নেটিভদের’ যুগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যারা ডিজিটাল দুনিয়ার মধ্যে জন্মেছে, তারা ডিজিটাল নেটিভ। আর আমরা হচ্ছি ডিজিটাল মাইগ্র্যান্ট, অর্থাৎ পরে এসে এই জগতে যুক্ত হয়েছি। ফলে চিন্তা-চেতনা, অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য থাকবেই। এটা শুধু এই প্রজন্মের বিষয় না; সব সময়ই এমন হয়েছে। আজকের জেনারেশনও ভবিষ্যতে তাদের সন্তানের সঙ্গে একই ধরনের গ্যাপ অনুভব করবে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।’
জেন-জি প্রজন্মের জন্য মায়েদের বার্তা
একজন মায়ের জন্য সব দিনই ‘মা দিবস’ বলে মনে করেন মায়েরা। আর সন্তানের কাছ থেকে তাদের প্রত্যাশা শুধুই ভালোবাসা। সন্তানদের নিয়ে মায়েদের বার্তা এই যে, ভালো মানুষ হও, সৎপথে থাকো, প্রত্যেক মানুষকে মানুষ ভেবেই সম্মান করো। বিনয়ী হওয়া শিখো এবং সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা রাখো। আর মানবিক মানুষ হও।



