শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষা এখনো অধরা, সামন্ত দৃষ্টিভঙ্গিই বড় বাধা
শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষা এখনো অধরা, সামন্ত দৃষ্টিভঙ্গি বাধা

শ্রমিকের অধিকার ও সুরক্ষা এখনো আমাদের সমাজে অধরা রয়ে গেছে। কবি রফিক আজাদ রচিত 'ভাত দে হারামজাদা' কবিতাটি কালের দেয়ালে লেখা আছে গভীর কালো অক্ষরে। এমন দ্রোহের কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি এটি লিখেছিলেন ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যসংকটের পটভূমিতে। আবার আশির দশকে নিজেই চরম অর্থসংকটে পড়ে লিখেছিলেন আরেক কবিতা:

'জানি, আপনার জুতা জোড়া, অতটা চকচকে হবে না আমার হাতে/ আপনার কাপড়গুলো অতটা পরিষ্কার হবে না আমি কাচলে/ তবুও / আমরাও তো চাই একটা কাজ, আমারও তো রয়েছে দায় পেটের পিঠের!/ হুজুর মা-বাপ, এই শুয়োরের বাচ্চার জন্য কি একটা কাজ জোগাড় হবে না?'

বেকারত্ব ও নিম্ন মজুরি এবং এ থেকে সৃষ্ট হাহাকার প্রতিধ্বনিত এ কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে। পঙ্‌ক্তিগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প কতটা শূন্যগর্ভ, কতটা ক্ষণভঙ্গুর, যা টেকসই উন্নয়ন থেকে যোজন যোজন দূরে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পোশাকশিল্পের বৈষম্য

আশির দশক থেকেই বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি পোশাকশিল্প। পোশাকশিল্প বাদ দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতি চিন্তাই করা যায় না, অথচ বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের বেতন পোশাক রপ্তানিকারী অন্যান্য দেশের তুলনায় সবার নিচে। পাকিস্তানেও পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এমনকি মিয়ানমারও তার শ্রমিকদের আমাদের চেয়ে বেশি বেতন দেয়। অথচ বাংলাদেশের জিডিপিতে পোশাকশ্রমিকদের অবদান অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি

জীবনের শেষ দিকে, রবীন্দ্রনাথ একসময় উপলব্ধি করলেন, যাঁদের শ্রমে এই জগৎ-সংসার চলছে, তাঁদের জন্য কিছুই লেখা হয়নি, তাঁর সাহিত্যে সেই শ্রমজীবী মানুষেরই কোনো স্থান হয়নি। এ জন্য তিনি গভীর বেদনা অনুভব করলেন। ১৯৪১ সালে 'জন্মদিনে' কবিতায় তিনি লিখলেন: 'চাষি ক্ষেতে চালাইছে হাল,/ তাঁতি বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল।' একই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন এবং এমন একজন কবির আবির্ভাব কামনা করেন, যিনি তাঁর কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনগাথা রচনা করবেন। তিনি লিখেছেন: 'আমার কবিতা, জানি আমি,/ গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সর্বত্রগামী/.../ যে আছে মাটির কাছাকাছি/ সে কবির-বাণী-লাগি কান পেতে আছি।'

যদিও রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সাল থেকেই কৃষিবিজ্ঞান ও কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকদের ভাগ্য ফেরানোর জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। বাংলা ১৩০০ সালে লেখা 'এবার ফিরাও মোরে' কবিতায়ও তিনি 'দরিদ্রের ভগবানের' মুক্তি আবাহন করেন।

নজরুলের সাম্যবাদ

অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের জীবনদর্শনই ছিল সাম্যে স্থিত। পরিভাষার অর্থেই তিনি সাম্যবাদী ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্‌ফর আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। প্রথম জীবনেই তিনি লিখেছেন, 'কুলি বলে বাবু সা'ব তাঁরে ঠেলে দিল নিচে ফেলে!/...এমন ক'রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?' বাঙালি সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি উচ্চবর্গের মানুষের অবজ্ঞা দূর হয়নি।

শ্রমের মর্যাদা ও সামন্ত দৃষ্টিভঙ্গি

শ্রমিকের ভাগ্য ফিরেছে কি ফেরেনি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না। শ্রমের মর্যাদা একটা মনোজাগতিক বিষয় এবং সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গিই শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত তাঁদের বাড়িতে গৃহকর্মী রাখেন, যাদের তাঁরা নাম দিয়েছেন কাজের মেয়ে বা কাজের ছেলে। 'কাজের ছেলে-মেয়ে' নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাঙালি সমাজের সহস্র বছরের অবজ্ঞার নিদর্শন। অধিকাংশ গৃহস্থই তাঁদের খেতে দেন উচ্ছিষ্ট খাবার অথবা আলাদাভাবে রান্না করা মোটা চালের ভাত, শুতে দেন ঘরের মেঝেতে। শুধু রাতে ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া সে সারা দিন কাজ করে। অতএব তার বেতন হওয়ার কথা প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টার সমান। অথচ সে মাসে বেতন পায় ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এমন শ্রম-শোষণ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না, আমার জানা নেই। 'কাজের ছেলে-মেয়েদের' টেলিভিশন দেখার সুযোগ হলেও সোফায় বসার অনুমতি তাদের নেই। গাড়ির চালককেও খেতে হয় ড্রয়িংরুমের মাটিতে বসে।

বাঙালি সমাজে নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি উচ্চবর্গের মানুষের এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, এ হলো সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি সেকেলে ও অনাধুনিক। সামন্তীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে ঠিকই, সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি মোটেই। সনাতন ধর্মে যাঁদের পৌরোহিত্যের অধিকার আছে, তাঁদেরই সাধারণত ব্রাহ্মণ বলা হয়ে থাকে, কিন্তু আসলে সব 'উঁচু শ্রেণির' মানুষই নিজেদের ব্রাহ্মণ ভাবেন। তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান যে বাঙালিকে যে এতটা দাবিয়ে রেখেছিল, তার কারণও ছিল ওই ক্ষমতাসীন 'ব্রাহ্মণদের' অহংকার। বাঙালিকে তারা মনে করত 'খর্বকায়, শীর্ণ, কালো, গরিব ও মিসকিন'।

বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি

স্বামী বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণ্যবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি কলিযুগকে বলেছিলেন শূদ্র জাগরণের যুগ। শূদ্র জাগরণের যুগ বলতে তিনি আসলে শ্রমিকশ্রেণির শাসনকেই বুঝিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণ্যবাদকে বলেছিলেন ঘোরতর অন্যায় ও অন্যায্য। তিনি বলেছিলেন, ব্রাহ্মণ্যবাদ চলতে থাকলে এই সমাজ টিকবে না।

বিশ্বকবির এই সতর্কবার্তা কোনো বিপ্লব ঘটাতে পারেনি তাঁর নিজ দেশে। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি উচ্চ শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিপ্লব ঘটেছিল ইউরোপে, আমেরিকায়। দৈনিক ১২ ঘণ্টা করে সপ্তাহে সাত দিন কাজ করার বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন মার্কিন মুলুকের শ্রমিকজীবী মানুষ। প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছিলেন অসংখ্য শ্রমিক। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে, অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবের প্রাক্কালেই প্রতিবাদের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে ১৮৮৬-এর কুখ্যাত হে মার্কেটের দাঙ্গায় নিহত হন বেশ কিছু শ্রমিক। রক্তের বিনিময়ে অবশেষে একদিন প্রতিষ্ঠিত হলো দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ, সপ্তাহে পাঁচ দিন।

শ্রমিকের ভাগ্য ফিরেছে কি ফেরেনি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না। শ্রমের মর্যাদা একটা মনোজাগতিক বিষয় এবং সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গিই শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।