ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ বা ভোটগণনা হবে। কিন্তু এর আগেই বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ কলকাতার একটি স্ট্রং রুমের (যেখানে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম রাখা হয়েছে) সামনে বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে এ খবর জানিয়েছে।
২৯ এপ্রিল রাজ্যের শেষ দফার ভোট গ্রহণের পর নির্বাচন কমিশন যেখানে ইভিএমগুলো জমা রেখেছে, কলকাতার সেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলের সামনে অন্তত তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেখানে দাঁড়িয়েই তৃণমূল কর্মীদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দেন, যেন বাংলার প্রতিটি স্ট্রং রুমের বাইরে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেওয়া হয়। মমতার অভিযোগ, ইভিএম সংরক্ষণ এবং স্থানান্তরের সময় বিজেপি কারচুপির চেষ্টা করতে পারে। একটি সিসিটিভি ভিডিওর সূত্র ধরে তিনি অভিযোগ করেন, কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামের মতো জায়গায় বিজেপি কর্মীরা ইভিএমের সঙ্গে জালিয়াতি করছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া
যদিও পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা (সিইও) মনোজ কুমার আগরওয়াল ইভিএম নিয়ে এই ধরনের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, সার্বক্ষণিক নজরদারি ও কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকা স্ট্রং রুমের ভেতরে কি আসলেই এই ধরনের জালিয়াতি করা সম্ভব?
কেন মমতা উদ্বিগ্ন?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনার মাত্র কয়েক দিন আগে এই উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবারের নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ ভোট পড়েছে, যা রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বুথফেরত জরিপে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের চেয়ে বিরোধী দল বিজেপি এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
২০১১ সালের নির্বাচনে সিপিআইএম-কে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় আসার পর এবারই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এ কারণেই তিনি বৃহস্পতিবার তার কর্মীদের ইভিএমের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দেন। মমতা দাবি করেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন ইভিএমগুলো স্ট্রং রুম থেকে গণনাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন তারা (বিজেপি) মেশিনগুলো বদলে দেওয়ার চক্রান্ত করেছে।’
কীভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা অভিযোগের বিপরীতে স্ট্রং রুম বা পরিবহনের সময় ইভিএম কারচুপি কিংবা বদল করা যতটা ভাবা হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) বছরের পর বছর ধরে ইভিএমের সুরক্ষা বজায় রাখতে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বহু স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, ভোট গ্রহণের দিন থেকে শুরু করে গণনার দিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কীভাবে ইভিএমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরেশি তার ‘অ্যান আনডকুমেন্টেড ওয়ান্ডার: দ্য মেকিং অব দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইলেকশন’ বইয়ে ইভিএমের নিরাপত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ভোট গ্রহণের পর ইভিএম কীভাবে কারচুপি ও পরিবহনকালীন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
- সিলগালা ও পরিবহন: ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই ইভিএমগুলো পেপার সিল দিয়ে বন্ধ করা হয় এবং প্লাস্টিকের বাক্সে ভরে সেগুলোকেও সিলগালা করা হয়। এরপর সরাসরি পোলিং স্টেশন থেকে নির্ধারিত স্ট্রং রুমে নিয়ে যাওয়া হয়।
- প্রার্থীদের উপস্থিতি: প্রার্থী, তাদের এজেন্ট ও নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতে স্ট্রং রুমের দরজা বন্ধ করে সিলগালা করা হয়।
- নিজেদের সিল ব্যবহারের সুযোগ: প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিরা চাইলে স্ট্রং রুমের তালায় নিজস্ব সিল লাগিয়ে দিতে পারেন। এমনকি গণনার দিন পর্যন্ত তারা সেখানে নজরদারিও চালাতে পারেন এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাও দেওয়া হয়।
- সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও নজরদারি: স্ট্রং রুমের বাইরে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়। এর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক ভিডিও রেকর্ডিং ও সিসিটিভি নজরদারি চালু থাকে।
- গণনার দিন খোলা: সিল করা স্ট্রং রুমটি কেবল ভোটগণনার দিন সকালে প্রার্থী, তাদের এজেন্ট এবং নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতেই খোলা হয়।
ইভিএম পরিবহনে প্রটোকল কী?
ইভিএম স্থানান্তরের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের সুনির্দিষ্ট প্রটোকল রয়েছে। ২০১৭ সালে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তাদের পাঠানো এক নথিতে উল্লেখ করা হয় যে, ইভিএম অবশ্যই কন্টেইনার ট্রাকে করে পরিবহন করতে হবে।
একই নথিতে বলা হয়, স্ট্রং রুম খোলা এবং পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিওগ্রাফি করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ বিষয়ে আগেই অবহিত করা হয় এবং প্রতিটি পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
২০১৪ সালে অন্ধ্র প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ ও ওড়িশার নির্বাচনের আগে জারি করা নির্দেশিকাতেও একই ধরনের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছিল। ভোট হওয়া ইভিএমগুলো কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) সুরক্ষায় জমা দেওয়ার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রার্থীরা চাইলে সেই গাড়ি অনুসরণ করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, ইভিএমের সিলগালা করা থেকে শুরু করে স্ট্রং রুমে নেওয়া, এবং সেখান থেকে গণনাকক্ষে নিয়ে আসার প্রতিটি ধাপে রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ফলে, এজেন্টদের চোখ এড়িয়ে কোনও ধরনের গরমিল বা কারচুপি করা কার্যত অসম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



