বাংলাদেশে নারীর অধিকার: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
জাতিসংঘ নারী সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক নাইরেতজাই গুম্বোনজভান্ডা সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। এই সফর শেষে তিনি নারীর অধিকার, লিঙ্গসমতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও যৌন হয়রানি বিরোধী আইন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। তাঁর সাক্ষাৎকৃতির মূল বক্তব্য তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশের নারী অধিকার পরিস্থিতি
গুম্বোনজভান্ডা বলেন, বাংলাদেশ নারীর অধিকার অগ্রগতির জন্য বহু আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও চুক্তি অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন (সিডও) রয়েছে। তবে এখনো কিছু কাজ বাকি আছে, যেমন এই কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬ থেকে আপত্তি প্রত্যাহার করা। দেশটির নীতিগত কাঠামো শক্তিশালী, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা
সরকারের সঙ্গে আলোচনায় মূল জোর ছিল বিদ্যমান নীতির বাস্তবায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ—যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড—এসবকে আরও বিস্তৃত করা। এ ছাড়া এটি স্বীকৃত যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সন্তোষজনক নয়—নির্বাচনে যে সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছেন, সেই পরিসংখ্যানও পর্যাপ্ত নয়। নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সরাসরি নির্বাচিত নারী আছেন মাত্র সাতজন, আর সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে আছেন ৫০ জন।
নারীদের সঙ্গে মতবিনিময়
গুম্বোনজভান্ডা এই দেশের নারীদের সঙ্গে, নারী অধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে, বিস্তৃত নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সঙ্গে, তরুণ নারীদের সঙ্গে, প্রতিবন্ধী নারীদের সঙ্গে এবং জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন। সেখানে আমরা যে বিষয়গুলো শুনেছি, সেগুলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। সেবার সুযোগ-সুবিধায় প্রবেশাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তন
সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনও জরুরি, যাতে লিঙ্গবৈষম্য কমানো যায়, নারীদের ক্ষমতায়ন করা যায় এবং তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে দেশের বৈচিত্র্য বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন আদিবাসী নারী বা গ্রামীণ নারীদের সঙ্গে দেখা করেছি, তখন দেখেছি তাঁদের অনেক সমস্যাই অন্যদের মতো হলেও কিছু অতিরিক্ত সমস্যা রয়েছে—যেমন ভূমি অধিকার–সংক্রান্ত বিষয়। তাই দারিদ্র্যের মাত্রা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং নারীর প্রতি সহিংসতা—এসব বিষয়ে আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
লিঙ্গসমতায় অগ্রাধিকার ক্ষেত্র
গুম্বোনজভান্ডা বলেন, লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, সরকারের সদিচ্ছা বা অঙ্গীকার। এই সরকার মাত্র তিন মাস হলো দায়িত্বে এসেছে। তাই নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতাকে সরকারের কেন্দ্রীয়ভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হলে কমিউনিটি পর্যায়ে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য বেসরকারি খাত ও বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে। নারীরা জমির মালিকানা চান, উৎপাদনের পথে থাকা বাধা মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে চান।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব শক্তিশালীকরণ
বাংলাদেশের নারীদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক শর্ত ও সংস্কার সম্পর্কে গুম্বোনজভান্ডা বলেন, প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবেশটি নির্বাচন–সংক্রান্ত আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই এই নির্বাচন আইনগুলো এমন হতে হবে, যাতে নারীদের অংশগ্রহণকে সহজতর করা যায়। এটি একটি সাংবিধানিক অধিকার। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ আইন ও নীতিমালা। অনেক দেশেই, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নারীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন; কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সংগঠনগত সহায়তার পুরো কাঠামো থাকে। একজন ব্যক্তি প্রার্থী হিসেবে আপনি নির্বাচন করতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের জন্য থাকে পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো ও সহায়তা ব্যবস্থা। অনেক সময় বৈষম্য, বঞ্চনা ও বহিষ্কারের ঘটনা রাজনৈতিক দলের ভেতরেই ঘটে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সংস্কার এবং নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি একধরনের বৈপরীত্য যে নারীদের সামাজিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সব সময় সরাসরি রাজনৈতিক সংখ্যায় প্রতিফলিত হয় না। এখানেই হতাশার জায়গা তৈরি হয়। আমরা আরও মনে করি, নারীদের জন্য অর্থায়ন প্রয়োজন। নির্বাচনী প্রচারণা ব্যয়বহুল। নারীদের নির্বাচনী অংশগ্রহণে সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের তরুণ নারীদেরও প্রয়োজন। তরুণ নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে তাঁদের সামনে থাকা বাস্তব বাধাগুলো বুঝতে হবে—যেমন প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি, শরীরকে কেন্দ্র করে অপমান বা বডি শেমিং। তাই আমাদের বহুমাত্রিক হস্তক্ষেপ দরকার। শুধু আইন থাকলেই হবে না; সামাজিক মনোভাব বা সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তন এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
যৌন হয়রানি বিরোধী সুরক্ষা
নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও জনপরিসর নিশ্চিত করতে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ কীভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে গুম্বোনজভান্ডা বলেন, যৌন হয়রানিবিরোধী আইন অবশ্যই পাস করতে হবে। এটি বহু আগেই হওয়া উচিত ছিল। নারীরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। আপনি চান না যে বাসে বসে থাকাকালে আপনার পাশের ব্যক্তি আপনাকে স্পর্শ করুক। জাতিসংঘ নারী সংস্থা (ইউএন উইমেন) নিরাপদ শহর কর্মসূচিতে অন্যান্য সংস্থা যেমন ইউএন হ্যাবিট্যাটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তবে বাংলাদেশকে অবশ্যই এই আইন পাস করতে হবে, কারণ এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৯০ নম্বর সুপারিশের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বিষয়টি মোকাবিলা করে। বেসরকারি খাতে আচরণবিধি রয়েছে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নীতিমালাও আছে। ইউএন উইমেন হিসেবে আমরা চাই, বেসরকারি খাত এসব নীতিমালার সঙ্গে যুক্ত হোক এবং এগুলো গ্রহণ করুক।
জাতিসংঘ সনদে বলা হয়েছে, মানুষ জন্মগতভাবেই অন্তর্নিহিত মর্যাদা ও অধিকারের অধিকারী। মর্যাদা মানে হলো জনপরিসরে নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে বসবাস করা। মর্যাদা মানে হলো প্রতিটি পরিবেশে আপনি সম্মান পাবেন, এই নিশ্চয়তা থাকা। তাই আমাদের জন্য, অর্থাৎ ইউএন উইমেনের জন্য, এ বিষয়টি একটি সনদ-সম্পর্কিত বা চার্টার-সংক্রান্ত বিষয়। এটি জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে জনপরিসরে যৌন হয়রানির বিষয়টির সঙ্গে। কারণ, এটি নারীদের শুধু জনপরিসরে অংশগ্রহণই সীমিত করে না, বরং সরকারি দায়িত্ব বা পদে অংশগ্রহণ এবং সাধারণ সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করে। তাই এটি অত্যন্ত জরুরি দাবি যে বাংলাদেশ যৌন হয়রানি–বিরোধী ধারা বা ক্লজটি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন করে।
গৃহকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতে সুরক্ষা
যখন কর্মক্ষেত্র কারও নিজস্ব বাড়ি হয়, তখন বাস্তবে যৌন হয়রানি–বিরোধী নীতি প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে গুম্বোনজভান্ডা বলেন, আমরা এই বিষয়টি তিন দিন আগে এখানে নারীদের সঙ্গে একটি বৈঠকে আলোচনা করেছি, যেখানে একই সমস্যা তাঁরা তুলে ধরেছেন—এর মধ্যে অভিবাসী নারী, অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা নারী এবং গৃহের ভেতরে নির্যাতনের শিকার নারীরাও ছিলেন। অনেক সময় নারীরা নীরব থাকেন, কারণ তাঁরা চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিতে চান না। তাঁরা অভিযোগ করার চেয়ে চাকরি রক্ষাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এই কারণেই সচেতনতামূলক প্রচারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গোপনীয়তা ও নীরবতা সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
যদি এমন একটি প্রচারণা চালানো যায়, যা নারীদের কথা বলার সাহস ও আত্মবিশ্বাস দেয়, তাহলে তাঁরা বুঝতে পারবেন—তাঁরা যত বেশি কথা বলবেন, তত বেশি পরবর্তী সময়ে একই বাড়িতে বা কর্মস্থলে কাজ করতে আসা অন্য নারীকে তাঁরা সুরক্ষা দিতে পারবেন; সেই পরবর্তী নারী হয়তো আর নির্যাতনের শিকার হবেন না। এ ছাড়া আমাদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও মোকাবিলা করতে হবে এবং নারীদের আবার ভুক্তভোগী হওয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ, তাঁদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো প্রতিশোধের শিকার হওয়া এবং চাকরি হারানো।
গুম্বোনজভান্ডা বলেন, বাংলাদেশে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও অনেক কাজ বাকি আছে। তবে সরকার, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।



