নারী ও শিশুর নিরাপত্তা: কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা: কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি

বাংলাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা আজ গভীর উদ্বেগের বিষয়। ঘর, রাস্তা, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—কোথাও যেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, যে জায়গাগুলো জ্ঞান, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানেও নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিজ ক্যাম্পাসে আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনা আবারও আমাদের সামনে নির্মম এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন পরিসরেও যদি নারী নিরাপদ না হন, তাহলে সমাজের আর কোথায় নিরাপত্তা খোঁজা যাবে? এই প্রশ্ন শুধু আবেগের নয়—এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের নৈতিক চেতনার প্রতি একটি কঠিন জিজ্ঞাসা।

সহিংসতা ক্রমেই স্বাভাবিক হচ্ছে

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাংলাদেশে নতুন কোনও ঘটনা নয়। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনা যেন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সংবাদপত্র খুললেই ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, শিশুর প্রতি শারীরিক ও যৌন সহিংসতা কিংবা হত্যার খবর চোখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী পরিচিতজন, আত্মীয়, শিক্ষক, প্রতিবেশী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি। অর্থাৎ বিপদ কেবল অন্ধকার গলিতে নয়, নিরাপত্তাহীনতা এখন পরিচিত পরিবেশের ভেতরেও বাসা বেঁধেছে।

কেন তৈরি হলো এই পরিস্থিতি?

বৈষম্যমূলক মানসিকতা

প্রথমত, আমাদের সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতা এখনও গভীরভাবে প্রোথিত। নারীকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণযোগ্য বা বিচারযোগ্য সত্তা হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজের নানা স্তরে বিদ্যমান। পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব, সামাজিক উপস্থিতি—সব কিছু নিয়ে নারীকেই জবাবদিহি করতে হয়। সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও প্রশ্ন ওঠে ভুক্তভোগীর আচরণ নিয়ে, অপরাধীর দায় নিয়ে নয়। এই ভিকটিম-ব্লেমিং সংস্কৃতি অপরাধীদের নীরব সাহস জোগায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিচারহীনতার সংস্কৃতি

দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি বড় কারণ। বহু ঘটনায় মামলা হয় না, হলেও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকে, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা দেখা যায়, কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, ভয় বা হয়রানির আশঙ্কায় অভিযোগই করে না। ফলে অপরাধীরা বার্তা পায়—অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। যখন শাস্তির ভয় কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবে সহিংসতা বাড়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্বল নিরাপত্তা

তৃতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের জায়গা নয়, এটি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশেরও প্রতিশ্রুতি। কিন্তু যদি ক্যাম্পাসেই নারী শিক্ষার্থী আক্রমণের শিকার হন, তাহলে তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা, কার্যকর অভিযোগ কাঠামো, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও জেন্ডার সংবেদনশীল নীতিমালা ছাড়া এ সংকট কাটানো কঠিন।

শিশু নিরাপত্তায় উদাসীনতা

চতুর্থত, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও আমরা যথেষ্ট আন্তরিক নই। অনেক পরিবার এখনও শিশুদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনে না। শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়, লজ্জা বা অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় কিছু বলতে পারে না। পরিবার, স্কুল ও সমাজে শিশু সুরক্ষা নিয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সচেতনতা অত্যন্ত সীমিত।

উত্তরণের পথ

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল ক্ষোভ প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

  • দ্রুত ও কার্যকর বিচার: নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে স্বাধীন অভিযোগ সেল, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জেন্ডার সংবেদনশীল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
  • সম্মান ও সমতার শিক্ষা: পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় সম্মান, সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদাবোধের শিক্ষা জোরদার করতে হবে। ছেলে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—নারীর প্রতি সম্মান মানবিক ও নাগরিক দায়িত্ব।

গণমাধ্যম ও নেতৃত্বের ভূমিকা

এখানে গণমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। সংবেদনশীলতা বজায় রেখে ভুক্তভোগীকে দায়ী না করে অপরাধ ও বিচারহীনতার কাঠামোগত কারণ সামনে আনা জরুরি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় নেতৃত্বকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোনও 'নারী ইস্যু' নয়, এটি রাষ্ট্রের মানবিকতা ও সভ্যতার মানদণ্ড।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে—যে সমাজে নারী ও শিশু নিরাপদ নয়, সে সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ বা উন্নত হতে পারে না। উন্নয়নের সুউচ্চ ভবন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন একজন নারী নিশ্চিন্তে পথে হাঁটতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারেন, এবং একটি শিশু ভয় ছাড়া বেড়ে উঠতে পারে।

আজ প্রশ্ন একটাই, আর কত ঘটনা ঘটলে আমরা সত্যিকার অর্থে জেগে উঠবো? নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং সমাজের নৈতিক বাধ্যবাধকতা। এখন নীরব থাকার সময় নয়, এখন সময় দৃঢ়ভাবে বলার—বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা কোনও আপসের বিষয় হতে পারে না।