মায়ের ভালোবাসা: নিঃশর্ত, সীমাহীন ও চিরন্তন
মায়ের ভালোবাসা: নিঃশর্ত ও চিরন্তন

‘মা’ শব্দটি এতটাই বিস্তৃত, এতটাই আবেগময় যে তাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। সন্তানের জন্য মায়ের চেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা পৃথিবীতে আর নেই। সন্তান যত অপরাধ করেই ঘরে ফিরুক, মা তাকে দূরে ঠেলে দেন না। এ এক অদৃশ্য মায়ার বন্ধন। পৃথিবীর সব আলো নিভে গেলেও মায়ের দোয়ার প্রদীপ সন্তানের মাথার ওপর চিরকাল জ্বলতে থাকে।

পৃথিবীতে ‘মা’-এর চেয়ে মধুর কোনো শব্দ বা পবিত্র কোনো সম্পর্ক আর হয় না। সন্তানের সঙ্গে মায়ের এই নাড়িছেঁড়া বন্ধন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাই মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন নেই। তবু যান্ত্রিক এই সময়ে বিশ্বের সব মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পালিত হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’। কিন্তু দিবস উদযাপনের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় আত্মোপলব্ধির প্রশ্ন, আমরা কি মায়ের নিঃশর্ত, সীমাহীন ভালোবাসার যথাযথ মূল্য দিতে পারছি?

সম্ভবত পারছি না। কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও চোখে পড়ল। গ্রামের মানুষ সালিশ বসিয়েছে। এক সন্তান তার বৃদ্ধ মাকে মারধর করেছে। মুরব্বিরা প্রথমে তাকে মায়ের পা ধরে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু সে তাতেও রাজি নয়। পরে সালিশে তাকে বেত্রাঘাতের সিদ্ধান্ত হয়। কয়েক ঘা পড়তেই সেই মা ছুটে এসে সন্তানের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার ছেলেকে মারবেন না’। এটাই মা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মা কেবল একটি সম্পর্ক নন; মা পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ আদালত, যেখানে সন্তানের সব অপরাধ বিনাশর্তে ক্ষমা হয়ে যায়। মায়ের ভালোবাসা সেই বিশাল বটবৃক্ষের মতো, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত, অথচ তার শীতল ছায়া তপ্ত রোদে সন্তানকে প্রশান্তি দেয়। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘যার মা আছে, সে কখনোই গরিব নয়।’ সত্যিই, মা কেবল একজন ব্যক্তি নন; মা এক চিরন্তন আশ্রয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯১৪ সালে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব মা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও মাতৃত্বের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আদিকাল থেকেই বহমান। কিন্তু মাকে ঘিরে এই গভীর আবেগের আড়ালেও রয়েছে নির্মম বাস্তবতা। আমাদের সমাজের এক বড় ট্র্যাজেডি হলো বৃদ্ধাশ্রম। যে মা নিজের শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে সন্তানকে তিল তিল করে বড় করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে তাকেই আশ্রয় নিতে হয় চার দেয়ালের এক নির্জন কক্ষে।

সেখানে কেমন থাকেন সেই মায়েরা? সন্তানের অবহেলা বা সময়ের অভাব যখন মাকে ঘরছাড়া করে, তখনও সেই মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য আশীর্বাদ হয়ে থাকে। বৃদ্ধাশ্রমের জানালার পাশে বসে থাকা মা প্রতিদিন পথ চেয়ে থাকেন, হয়তো আজ তার সন্তান আসবে। নিজের প্রতি অবিচার হলেও সন্তানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বা মঙ্গলকামনা বিন্দুমাত্র কমে না। এই ক্ষমাশীল মমত্বই প্রমাণ করে, মায়ের চেয়ে বড় আশ্রয় পৃথিবীতে আর নেই।

তবে সব মাতৃত্বের গল্প রঙিন নয়। আমাদের সমাজেই এমন কিছু মা আছেন, যাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিত দায় থেকে মুক্তি পেতে ফুটপাত কিংবা ডাস্টবিনে ফেলে যান নিজের নাড়িছেঁড়া ধন। সমাজের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও নিজের বিবেকের কাছে কি মুক্তি মেলে? আবার এমন মা–ও আছেন, যাঁরা দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে সন্তানের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে না পেরে বুকের ধনকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেন। এই মায়েদের নীরব আর্তনাদ ও চোখের জল কোনো সংজ্ঞায় ধরা যায় না। এটি যেমন মাতৃত্বের ট্র্যাজেডি, তেমনি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি।

আবার কর্মজীবী মায়ের কথাও ভাবুন। অফিসে যিনি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে দৃঢ়, তিনিই ঘরে ফিরে সন্তানের জন্য হয়ে ওঠেন সবচেয়ে কোমল মানুষ। দিন শেষে নিজের ক্লান্তি সরিয়ে রেখে সন্তানের পড়ার টেবিলে বসেন। তাঁর সেই ত্যাগ কোনো পদক বা বেতনে মাপা যায় না।

ভাবুন একজন সিঙ্গেল মাদারের কথা, যিনি বিচ্ছেদ কিংবা একাকিত্বের বিরুদ্ধে লড়ে একাই সন্তানকে মানুষ করছেন। সমাজের নানা বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েও তাঁরা প্রমাণ করেন—নারী দুর্বল হতে পারেন, কিন্তু মা কখনো হার মানেন না।

আবার ফুটপাতে জীর্ণ শরীরের অনেক মাকে দেখা যায়, নিজের জীবন সংকটময় হলেও সন্তানের মুখে বুকের দুধ তুলে দিচ্ছেন পরম মমতায়। হয়তো সন্তানের বাবার পরিচয়ও তাঁর জানা নেই। তবু তিনি সন্তানকে আগলে রেখেছেন। এটাই মাতৃত্ব। সমাজ হয়তো আঙুল তোলে, কিন্তু মা তার সন্তানের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন না।

মা দিবসের এই উৎসবের আড়ালে আরও একদল নারীর নীরব দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে যায়—যাঁরা হাজারো চেষ্টা ও প্রার্থনার পরও ‘মা’ ডাক শুনতে পারেননি। এই অপূর্ণতা কোনো সান্ত্বনাতেই পূর্ণ হয় না। তবু তাঁরা হাসিমুখে সংসার সামলান। তাঁদের প্রতিও শ্রদ্ধা। কারণ মাতৃত্ব কেবল জন্ম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মাতৃত্ব হলো মমতা, স্নেহ আর মানুষ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা। যাঁরা সন্তান কোলে পাননি, তাঁরাও চাইলে কোনো অনাথ শিশুকে ভালোবাসায় মানুষ করতে পারেন। তাতেই মাতৃত্বের পূর্ণতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

সবশেষে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। আজকের জেন-জি ও আলফা প্রজন্মকে নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তারা অধিকাংশ সময় ডুবে থাকে গ্যাজেটের জগতে। বাবা-মাকে ভালোবাসা কিংবা তাঁদের কাছ থেকে ভালোবাসা আদায়, কোনোটাই যেন স্বাভাবিকভাবে ঘটছে না। স্মার্টফোন আমাদের আবেগের জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে।

আজকের প্রজন্মের হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবী, অথচ পাশের সোফায় বসে থাকা মায়ের মনের খবর নেওয়ার সময় নেই। মায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়াই যেন ভালোবাসার প্রকাশ। অথচ মা-বাবার সান্নিধ্য হারানো সময় আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। কোনো ওয়াই-ফাই বা ইন্টারনেট নয়, মায়ের ভালোবাসায় কাজ করে হৃদয়ের সরাসরি সংযোগ। পৃথিবী দিন শেষে বড় কঠিন, আর মায়ের কোলই একমাত্র নিরাপদ স্বর্গ। বাবা-মা চলে যাওয়ার পরই মানুষ বুঝতে পারে, কী হারিয়েছে।

প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া শৈশব আবার ফিরে আসুক মায়ের স্নেহের আঁচলে। স্মার্টফোনের পর্দায় ‘মা’ লিখে খুঁজলে হাজারো তথ্য মিলবে, কিন্তু বাস্তবের সেই মমতাময় স্পর্শ কি সেখানে পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে না। তাই সময় থাকতে আমাদের সচেতন হতে হবে। সব ধর্মেই মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে। ধর্মের বাণীতেও বলা হয়েছে, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’

আমাদের আরও একটি মা আছেন, দেশমাতা। আমরা যেন গর্ভধারিণী মায়ের মতোই দেশমাতাকেও হৃদয়ে ধারণ করি। তিনিও আমাদের আগলে রেখেছেন অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যে। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব মা; যাদের ভালোবাসায়ই পৃথিবী এখনো মানবিক, এখনো বাসযোগ্য।

লেখক: প্রশিক্ষক ও নির্মাতা