মানবসভ্যতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী, জ্ঞান ও চিন্তার এক অমলিন ভান্ডার হলো বই। ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ তার অভিজ্ঞতা, আবিষ্কার, স্বপ্ন ও অনুভূতিকে ধারণ করেছে বইয়ের পাতায়। ফলে বই কেবল তথ্যের বাহক নয়, এটি যেন সময় ও ইতিহাসের সাক্ষী। একটি বই পাঠককে নিয়ে যায় অজানা জগতের পথে, খুলে দেয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দরজা। কখনো এটি আনন্দ দেয়, কখনো ভাবায়, আবার কখনো পরিবর্তন করে দেয় জীবনের পথচলা। বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও বই যেন গুরুত্ব হারায়নি, বরং ব্যক্তি ও সমাজ গঠনে এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্ব বই দিবসের আলোচনা সভা
২৩ এপ্রিল ছিল বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস। দিবসকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা আয়োজন করেছে বিশেষ আলোচনা সভা ‘বই ও প্রজন্মের ভাবনা’। এতে বইপ্রেমী বন্ধুরা এসেছিলেন তাঁদের জীবনে পড়া প্রথম বই পড়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে। এ ছাড়া প্রিয় বই, প্রিয় লেখক, বর্তমানে তথ্য ও প্রযুক্তির কল্যাণে বই পড়া কতটা গুরুত্ব পেয়েছে সেই সম্পর্কে আলোচনা হয়।
বক্তাদের অভিজ্ঞতা
সহসভাপতি নুরুজ্জামান খান বলেন, ‘আমার জীবনে প্রথম বই ছিল ছড়ার বই। বই খুব একটা পড়া না হলেও যেদিন থেকে চট্টগ্রাম বন্ধুসভায় যুক্ত হই, পাঠচক্রে নিয়মিত আসা হতো। বই নিয়ে আলোচনা শুনতে ভালো লাগত। এভাবে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। দূরে কোথাও ভ্রমণে গেলে বই পড়ার চেষ্টা করি। বই পড়া আসলেই খুব দরকার। অনেক কিছু শেখা যায়।’
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলায় পত্রিকা পড়ার পাশাপাশি পত্রিকার সঙ্গে দেওয়া ম্যাগাজিন পড়া হতো। এলাকায় একজন বড় ভাই ছিলেন, নাম রাশেদ। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। মাঝেমধ্যে গোয়েন্দা সিরিজ, কিছু উপন্যাস নিয়ে আসতেন। সেগুলো পড়তেন আর আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। অবশ্য আমাদেরও পড়ার সুযোগ হতো। তখন অবসরে বই পড়া ছিল আনন্দের মতো। বর্তমানে অবসরে সুযোগ পেলেই বই পড়ি। আমার বাসায় অনেক বই আছে। দেখে মনে হবে যেন একটি লাইব্রেরি।’
বন্ধু সাজিয়া আফরিন বলেন, ‘আমার বাবা-মা দুজনেই বইপোকা। সেই সুবাদে ছোটবেলা থেকেই অবসর সময়ে আমার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। বাবা আমার জন্য তখন কিছু কমিকস বই আনতেন। সেগুলো পড়া হতো। সম্ভবত ২০১৩ সালে একদিন প্রথম আলো পত্রিকায় কিশোর আলোর একটি বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। সেই থেকে হকার আংকেল পত্রিকার সঙ্গে কিশোর আলো দিয়ে যেতেন। কিশোর আলো আমার খুব পছন্দ। তারপর একদিন কিআ বুক ক্লাবে যুক্ত হওয়া, তখন থেকেই বই পড়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়া।’
বন্ধু রুবাইয়াদ আলম বলেন, ‘আমার বাসায় প্রচুর বই রয়েছে; তবে আইনের বই বেশি। যেহেতু বাবা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। আমার আপু বইপ্রেমী একজন মানুষ। সে প্রচুর বই সংগ্রহ করত। কোভিডের সময় থেকেই আমার বই পড়া শুরু হয়। আমার প্রিয় বই হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস “অপেক্ষা”।’
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদকের বক্তব্য
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরান চৌধুরী বলেন, ‘শৈশব থেকে আমার বই পড়া শুরু হয়। অবসর সময়ে বই পড়া হতো। তিন গোয়েন্দা, চাচা চৌধুরীর কমিকস, কিশোর উপন্যাস সমগ্র, কিশোর আলো পড়া হতো। তবে হুমায়ূন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার, জহির রায়হান, রকিব হাসানদের বই পড়তে প্রচুর ভালো লাগে। বর্তমানে তরুণ লেখকদের মধ্যে বই পড়ার ঘাটতি একটু বেশি রয়েছে। আমি মনে করি লেখক হওয়ার পূর্বে প্রচুর বই পড়া উচিত, সেই সঙ্গে চর্চা ও গবেষণা করা উচিত।’
সাধারণ সম্পাদকের মতামত
বর্তমানে বই পড়ার গুরুত্ব নিয়ে সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বই পড়ার গুরুত্ব কিছুটা কম হলেও অনলাইনে পিডিএফের মাধ্যমে বই পড়ার অভ্যাস কমবেশি রয়েছে। তবে আমি মনে করি একটি ভালো বই সুন্দর জীবন গড়তে সহায়তা করে। তরুণদের উচিত সুযোগ পেলে বই পড়া। এই অভ্যাসটি খুবই প্রয়োজন। প্রথম আলো বন্ধুসভার পাঠচক্র—তরুণদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রচার সম্পাদক সাকিব জিশান, দপ্তর সম্পাদক জয় চক্রবর্তী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক তিথি তালুকদার, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক শান্ত বড়ুয়া, অদ্রিক রায় অর্ক, খাদিজা আক্তার, অর্ণব মহাজন, আয়োজনের সহসমন্বয়কারী সাইনুর আক্তার ও তাফসিরুল ইসলাম।



