ষাটগম্বুজ মসজিদ ও সুন্দরবন ভ্রমণ নিয়ে দিনভর তর্ক চলছিল। নারী-পুরুষ একসঙ্গে ভ্রমণ, রাত হলেই বিপদের শঙ্কা—এক দিনে কীভাবে সম্ভব? ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে এটি প্রায় অসম্ভব মনে হলেও নোট অব ডিসেন্ট রেখে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কক্সবাজার থেকে আসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘কক্সবাজার জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতি’র বার্ষিক ট্যুর হবে মর্মে ঘোষণা এল। ট্যুর ম্যানেজমেন্টে পটু আমাদের বন্ধু ওয়াসিফুর রহমান খাতা-কলম নিয়ে বসে গেলেন। অল্প টাকায় সুন্দরবন ঘুরে আসার পরিকল্পনা সবার সামনে উপস্থাপন করেন। দুই রাত এক দিন ব্যয়ে ঝামেলা ছাড়াই ক্যাম্পাসে ফেরার রোডম্যাপ দিলেন। আমরা ৩৫ জনের মতো ধুমধাম রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম।
সুন্দরবন: পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এটি গঙ্গা নদীর মোহনায় অবস্থিত। বাংলাদেশের প্রায় ১০ লাখ হেক্টর এলাকাজুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। ১৯৯৭ সালে ইউনেসকো এই স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। এর প্রাকৃতিক পরিবেশ সব সময় প্রকৃতিপ্রেমী, বিজ্ঞানী, গবেষক ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুরা প্রতিবছর এখানে বেড়াতে যান। আমরাও ঘুরে আসার পরিকল্পনা সেরে ফেললাম।
যাত্রা শুরু
১৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টার বাসযোগে ক্যাম্পাস থেকে কুষ্টিয়ার পোড়াদহ রেলস্টেশনে রওনা দিলাম। রাত সাড়ে ১২টার ট্রেন সীমান্ত এক্সপ্রেস। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে রাত ৩টায় ট্রেন এল। ট্রেনের দেরি হওয়াটাও নতুন অভিজ্ঞতা। ট্রেনটি খুলনায় পৌঁছাল সাড়ে ৭টায়। ট্রেন থেকে নেমে ভাড়া করা বাসযোগে রওনা দিলাম লঞ্চঘাটে (মোংলা ফেরিঘাট)। বেলা ১১টা হয়ে গেছে। এর মাঝে হুটহাট সকালের নাশতা সেরে নিলাম।
সুন্দরবনের করমজল
মোংলা ফেরিঘাট থেকে সুন্দরবনের উদ্দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকা (ভাড়াকৃত) নিলাম। চলতে চলতে পৌঁছালাম গন্তব্যে। মাঝখানে নদী, নদীর ওপারেই দেখা যাচ্ছে ঘন সবুজ গাছে আচ্ছাদিত আমাদের গর্ব, বাঘের আনাগোনা, অহংকার মায়াবী সুন্দরবন। দর্শনার্থীরা সাধারণত করমজল, হিরণ পয়েন্ট, কটকা বিচ, শরণখোলা, টাইগার পয়েন্ট, দুবলার চর ইত্যাদি স্থানে ভ্রমণ করেন। তবে আমরা করমজল স্পটে ঘুরেছি। সময় কম, আমাদের পরিচালক নির্দেশনা দিয়েছেন, বেলা ৩টার মধ্যে ফিরতে হবে। সেলফি তুললাম, দেখলাম, হাঁটলাম।
খান জাহান আলী মাজার ও ষাটগম্বুজ মসজিদ
হাতে সময় কম। দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। ক্ষুধার্ত, তবুও চলছে চলন্ত বাসে সম্মিলিত গানের সুর। এবার গন্তব্য—বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী ষাটগম্বুজ মসজিদ। টিকিট কেটে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। পাশে জাদুঘর। ১৫ শতকের মাটির পাত্র ও পাথর প্রদর্শনী রাখা হয়েছে। লেখা আছে ‘এখানে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা নিষেধ’। কিন্তু চুপিসারে ক্যামেরাবন্দী করে রাখলাম। বিকেল পার হয়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়োও বেড়ে গেছে। ছুটে গেলাম পার্শ্ববর্তী খান জাহান আলী মাজারে। ফটোসেশন করতে ভুলে যাইনি। সন্ধ্যার বাতি নিবু নিবু। এক ফাঁকে দেখতে গেলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রথমে প্রধান ফটকে বাধা দেয়, ইবিয়ান পরিচয়ে সুযোগ করে দিলেন দারোয়ান মামা। একপলক দেখে নিলাম।
ফেরার পালা
রাত ৯টা, যত রাত হচ্ছে ততই ভয় বাড়ছে। এক দিনের সফর বটে। খুলনা বাস কাউন্টারে এসে ছোটাছুটি করতে লাগলাম। তেলের সংকটে সহজে বাস পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে একটা বাস পেয়ে গেলাম। ‘বরিশাল হোটেল’ থেকে রাতে খাবার খেয়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা দিলাম। বাসে গান আর বিনোদনমূলক ড্যান্স তো আছেই। ঘুম নেই, হাত তালি আর গানের সুর। রাত দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালাম। অল্প টাকায় সফর সমাপ্তি। বিনোদনের কমতি ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবেও সফর করা সম্ভব? হ্যাঁ, দলগত সফরে ক্লান্তি নেই। স্মৃতি হয়ে বাস করুক দৃশ্যপটগুলো।
*লেখক: রবিউল আলম, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া)



