ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অরুণাচল প্রদেশের গহিন পাহাড়ি উপত্যকায় বয়ে চলা একটি নদী প্রথম দেখাতেই যে কাউকে চমকে দেবে। এই নদীর পানি হিমবাহের হ্রদের মতো গাঢ় নীল বা বর্ষার কর্দমাক্ত ঘোলাটে বাদামি নয়; বরং ঋতুভেদে এর রঙ ধারণ করে ইটের মতো লাল কিংবা লালচে-কমলা। ভারতের ভূগোলে সবচেয়ে নাটকীয় নামের এই নদীটির নাম ‘লোহিত’, যা ‘রক্তের নদী’ নামে পরিচিত।
নামকরণের কারণ
নদীটির এই নামকরণের পেছনে বৈজ্ঞানিক ও পৌরাণিক উভয় কারণই রয়েছে। ভূতাত্ত্বিক কারণ অনুযায়ী, লোহিত উপত্যকা এবং মিশমি পাহাড়ের মাটি লোহা সমৃদ্ধ। ফলে বৃষ্টির পর যখন নদীর পানির প্রবাহ বাড়ে, তখন এই লোহার কারণে পানি মরচে ধরা লাল বা রক্তের মতো লালচে রঙ ধারণ করে। অন্যদিকে, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম তার পিতা জমদগ্নির আদেশে নিজের মা রেণুকাকে শিরশ্ছেদ করেছিলেন। এই মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে তিনি লোহিত নদীর তীরে ‘পরশুরাম কুণ্ড’ নামের একটি পবিত্র স্থানে স্নান করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তার মায়ের রক্তের কারণেই এই নদীর পানি লাল হয়ে গিয়েছিল।
জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি
অপূর্ব জীববৈচিত্র্যে ভরা এই লোহিত উপত্যকা উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। আলপাইন উদ্ভিদ থেকে শুরু করে ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট সবই রয়েছে এখানে। এই নদীটি পূর্ব তিব্বতের জায়াল ছু পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে অরুণাচল প্রদেশের আনজাও জেলা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। এরপর প্রায় ২০০ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আসামের সমভূমিতে এসে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পাহাড়ে মিশমি উপজাতি এবং সমতলে খামতি ও সিংফো নামের বার্মিজ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বাস। ফলে এই একটি নদীর তীরেই তিব্বতি প্রকৃতিপূজা, থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্ম এবং সনাতন হিন্দু সংস্কৃতির এক অপূর্ব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন দেখা যায়।
পর্যটন আকর্ষণ
পর্যটকদের জন্য এই উপত্যকার সবচেয়ে পবিত্র স্থান হলো ‘পরশুরাম কুণ্ড’। প্রতিবছর মধ্য-জানুয়ারিতে মকর সংক্রান্তির সময় হাজার হাজার পুণ্যার্থী এখানে পাপমুক্তির আশায় পবিত্র স্নান করতে আসেন। এ ছাড়া আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো ইন্দো-চীন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত প্রত্যন্ত গ্রাম ‘ওয়ালং’। তেজপুর থেকে ওয়ালং যাওয়ার রাস্তাটি লোহিত নদীর তীর ঘেঁষে ঘন জঙ্গল আর ঝুলন্ত ব্রিজের মধ্য দিয়ে গেছে, যা রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ আকর্ষণীয়।
ভ্রমণের সেরা সময়
লোহিত উপত্যকায় ভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। বর্ষাকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) ভারী বৃষ্টি ও ধসের কারণে এখানে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে অরুণাচল প্রদেশে ভ্রমণের জন্য ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ইনার লাইন পারমিট এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রটেক্টড এরিয়া পারমিট নেওয়া বাধ্যতামূলক, যা অনলাইন বা বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে সংগ্রহ করা যায়। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বেশ দুর্বল এবং নিরামিষভোজীদের জন্য খাবারের বিকল্প সীমিত। তবে যারা ভারতের একদম শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়ে লৌকিক মিথ, ইতিহাস আর প্রকৃতির এক বন্য ও শান্ত রূপ একসঙ্গে উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ‘লোহিত’ হতে পারে এক আদর্শ গন্তব্য।



