হিজরতের পথে নবীজি (সা.)
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-কে হিজরতের নির্দেশ দিলেন। মক্কার কাফেররা তাঁর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা সিদ্ধান্ত নিল একযোগে আক্রমণ করে নবীজিকে হত্যা করবে। সেই উদ্দেশ্যে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে তাঁর ঘর ঘিরে সতর্ক অবস্থান নিল।
কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনাই সর্বোত্তম। নবীজি (সা.) আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন এবং এক মুঠো বালু নিক্ষেপ করলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় শত্রুরা তাকে দেখতে পেল না। তিনি নিরাপদে পৌঁছে গেলেন প্রিয় সঙ্গী আবু বকরের (রা.) বাড়িতে।
আবু বকর (রা.) দীর্ঘদিন ধরেই এই মহাযাত্রার অপেক্ষায় ছিলেন। সফরের জন্য তিনি দুটি উট প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.) আল্লাহর নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। সরাসরি মদিনার পথে না গিয়ে তারা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সাওর গুহার দিকে রওনা হলেন, যাতে শত্রুরা তাদের খুঁজে না পায়।
তারা সেখানে তিন দিন আত্মগোপন করে থাকলেন। এ সময় মক্কার কাফেররা চারদিকে ব্যাপক অনুসন্ধান চালাতে লাগল। একপর্যায়ে তারা সাওর গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তাদের পদচারণার শব্দ শুনে আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, 'লা তাহযান, ইন্নাল্লাহা মাআনা'—চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।
আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে শত্রুরা তাদের সন্ধান পেল না। তিন দিন পর তারা পুনরায় যাত্রা শুরু করলেন। বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শকের সহায়তায় মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে তারা মদিনার দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। পথিমধ্যে বিখ্যাত অশ্বারোহী সুরাকা বিন মালিক পুরস্কারের লোভে তাদের অনুসরণ করেন। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে তার ঘোড়ার পা বারবার বালুর মধ্যে ধসে যায়। তিনি বুঝতে পারলেন, এ যাত্রা আল্লাহর সুরক্ষায় রয়েছে। পরে তিনি নিরাপত্তার অঙ্গীকার করে ফিরে যান।
অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত সেই দিন উপস্থিত হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার নিকটবর্তী কুবায় পৌঁছালেন এবং সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করলেন। এরপর তিনি মদিনা নগরীতে প্রবেশ করলেন। আনসাররা উল্লাস ও ভালোবাসায় তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। সবাই চাইলেন, নবীজি (সা.) যেন তাদের ঘরেই অবস্থান করেন। কিন্তু তিনি বললেন, তাঁর উটকে ছেড়ে দাও, আল্লাহর নির্দেশে উট যেখানে থামবে, সেখানেই তিনি অবস্থান করবেন।
অবশেষে উটটি গিয়ে থামল মহান সাহাবি আবু আইয়ুব আল-আনসারি (রা.)-এর বাড়ির সামনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে আতিথ্য গ্রহণ করলেন এবং কিছুদিন অবস্থান করলেন। এভাবেই শুরু হলো ইসলামের নতুন যুগ, রাসুল (সা.)-এর মাদানি জীবন। এখানে প্রতিষ্ঠিত হলো ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়, সাম্য ও শান্তি ও মানবিক মর্যাদার এক অনন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা।
হিজরত শুধু স্থান পরিবর্তন নয়। এটি ছিল ত্যাগ, ধৈর্য, ইমান ও আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাসের এক মহান শিক্ষা। আজও হিজরতের ঘটনা মুসলমানদের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর ওপর ভরসা করার অনুপ্রেরণা জোগায়।



