উকিল মুন্সির বিরহ: মানবিক মিলনের গভীর ভাষা
উকিল মুন্সির বিরহ: মানবিক মিলনের ভাষা

উকিল মুন্সির বিরহ: মানবিক মিলনের গভীর ভাষা

বাংলার লোকঐতিহ্যে বিরহ কেবল বিচ্ছেদের বেদনা নয়, বরং আত্মঅন্বেষণ ও মানবিক মিলনের এক গভীর ভাষা। সেই বিরহের ঐতিহ্যকে নতুন করে পাঠ করার প্রয়াসে শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর জিগাতলার কুন স্টুডিওতে আয়োজন করা হয় ‘বিরহের ঐতিহ্য এবং সমকালীন বিচ্ছিন্নতার পুনর্পাঠ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের।

চারুকলার বিশেষ আঙ্গিকে নির্মিত উকিল মুন্সির প্রতিকৃতি উন্মোচন, তাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় বাংলার এই প্রখ্যাত বাউল সাধককে।

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী, লেখক-গবেষক সাইমন জাকারিয়া, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী মুহম্মদ আকবর এবং লেখক-নির্মাতা অনার্য মুর্শিদ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলোচনায় উকিল মুন্সির জীবন, সাধনা, গান ও দর্শনের নানা দিক তুলে ধরে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, উকিল মুন্সিরা বাংলার মানুষের অন্তর্জগত, প্রেম, বিরহ ও ভাববাদী চর্চার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অথচ তথাকথিত মূলধারার সাহিত্যচর্চায় তাদের অবদানকে দীর্ঘদিন ‘লোকসাহিত্য’ বলে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। আর যারা ১০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের রচনা মূল সাহিত্যের প্রতিনিধি হয়ে আছেন।

শহীদুল্লাহ ফরায়জীর মতে, উকিল মুন্সির বিরহদর্শন শুধু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নয়; এটি আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপরিচয় সংকটেরও এক গভীর প্রকাশ। প্রযুক্তিগত সংযোগের যুগেও মানুষ ক্রমশ একাকী হয়ে পড়ছে, আর উকিল মুন্সির গান সেই সংকটকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাইমন জাকারিয়া বলেন, উকিল মুন্সি বাংলাদেশের লোকায়ত সংস্কৃতি ও সাধক-ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তার গানে দেহতত্ত্ব, আত্মঅন্বেষণ এবং স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের যে দর্শন নিহিত রয়েছে, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তিনি লোকসংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনাকে ধারণ করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

মুহম্মদ আকবর বলেন, উকিল মুন্সিকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা বাড়লেও কোথাও কোথাও তাকে অন্যদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা তার দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ উকিল মুন্সি অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, মিলনের কথাই বলেছেন।

অনার্য মুর্শিদের ভাষায়, আজকের বিশ্বে বিচ্ছিন্নতা মানুষকে ক্রমেই শুষ্ক ও হিংস্র করে তুলছে। এমন সময়ে উকিল মুন্সির বিরহের ঐতিহ্য মানবপ্রেম, আত্মিক আরোগ্য ও সহিষ্ণুতার এক বিকল্প পথ দেখায়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে উকিল মুন্সির পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে চারুকলার বিশেষ পদ্ধতিতে আঁকা তার প্রতিকৃতি উন্মোচন করেন উকিল মুন্সির পৌত্র কুলকুল শাহ। পরে প্রদর্শিত হয় অনার্য মুর্শিদ নির্মিত চলচ্চিত্র ‘একতার ইমাম’। এরপর শুরু হয় আলোচনা। আলোচনা শেষে মোহনগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহ থেকে আগত শিল্পীরা উকিল মুন্সির গান পরিবেশন করলে বিরহ, সাধনা ও লোকঐতিহ্যের সেই আবহ পুরো আয়োজনে ছড়িয়ে পড়ে।