যখন মানুষের সব অবলম্বন ফুরিয়ে যায়, তখন একমাত্র আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই পারে তাকে কূল দেখাতে। এই অটল বিশ্বাসের নামই ‘তাওয়াক্কুল’। মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা কেবল মানসিক শান্তিই দেয় না, বরং অসম্ভবকে সম্ভব করার শক্তি জোগায়। তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা গড়ার ১০টি কোরআনি সূত্র তুলে ধরা হলো:
১. আল্লাহই যখন যথেষ্ট
মানুষের জীবনে যখন প্রতিকূলতা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসাই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। উচ্চারণ: ওয়া মান ইয়াতাওয়াক্কাল আলাল্লাহি ফাহুওয়া হাসবুহু। অর্থ: আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পন্ন করবেন। (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)
২. মুমিনের প্রকৃত পরিচয়
ইমানের পূর্ণতা আসে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার মাধ্যমে। মুমিনরা দৃশ্যমান উপায়ের চেয়ে অদেখা আল্লাহর শক্তির ওপর বেশি আস্থা রাখে। উচ্চারণ: ইন্নামাল মুমিনুনাল্লাযিনা... ওয়া আলা রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালুন। অর্থ: মুমিন তো তারাই, যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়... এবং যারা তাদের রবের ওপর ভরসা করে। (সুরা আনফাল, আয়াত: ২)
৩. ইমানের অপরিহার্য শর্ত
তাওয়াক্কুল কেবল একটি ভালো গুণ নয়, বরং এটি ইমানের সত্যতার মাপকাঠি। উচ্চারণ: ওয়া আলাল্লাহি ফাতাওয়াক্কালু ইন কুনতুম মুমিনীন। অর্থ: আর তোমরা আল্লাহর ওপরই ভরসা করো, যদি তোমরা মুমিন হও। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২৩)
৪. সিদ্ধান্তের পর অটল থাকা
পরিকল্পনা ও চেষ্টার পর যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন ফলাফলের চিন্তা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই হলো তাওয়াক্কুল। উচ্চারণ: ফা ইযা আযামতা ফাতাওয়াক্কাল আলাল্লাহ। অর্থ: অতঃপর যখন তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
৫. ঐশী সাহায্যের নিশ্চয়তা
দুনিয়ার সব শক্তি একদিকে থাকলেও আল্লাহর সাহায্য যার সঙ্গে থাকে, তাকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। উচ্চারণ: ইন ইয়ানসুরকুমুল্লাহু ফালা গালিবা লাকুম। অর্থ: যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে কেউ তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না। আর মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬০)
৬. অদৃশ্যের অধিপতির ওপর নির্ভরতা
ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে অজানা থাকলেও আল্লাহর কাছে তা স্পষ্ট। তাই সকল বিষয়ের চূড়ান্ত ভার তাঁর ওপর অর্পণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উচ্চারণ: ফা’বুদহু ওয়া তাওয়াক্কাল আলাইহ। অর্থ: সুতরাং তুমি তাঁরই ইবাদত করো এবং তাঁর ওপর ভরসা করো। (সুরা হুদ, আয়াত: ১২৩)
৭. দয়াময় সত্তার আশ্রয়
বিপদে-আপদে আল্লাহর করুণার ওপর ভরসা রাখলে অন্তর প্রশান্ত থাকে। এটি মুমিনের জীবনের এক বড় দোয়া। উচ্চারণ: কুল হুওয়ার রাহমানু আমান্না বিহি ওয়া আলাইহি তাওয়াক্কালনা। অর্থ: বলো, তিনিই পরম দয়ালু, আমরা তাঁর ওপর ইমান এনেছি এবং তাঁর ওপরই ভরসা করেছি। (সুরা মুলক, আয়াত: ২৯)
৮. ভাগ্যের লিখন ও অভিভাবকত্ব
আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কিছু ঘটার সুযোগ নেই। এই বিশ্বাসই তাওয়াক্কুলের ভিত্তি। উচ্চারণ: কুল লাই ইউসিবানা ইল্লা মা কাতাবাল্লাহু লানা। অর্থ: বলো, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া আমাদের কিছুই ঘটবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। (সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ৫১)
৯. ষড়যন্ত্র থেকে সুরক্ষা
মানুষের গোপন চক্রান্ত বা শয়তানের কুমন্ত্রণা কোনোটিই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ক্ষতি করতে পারে না, যদি ভরসা থাকে আল্লাহর ওপর। উচ্চারণ: ওয়া লাইসা বিদাররিহিম শাইআন ইল্লা বিইযনিল্লাহ। অর্থ: অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া শয়তান মুমিনদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। (সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১০)
১০. ঐশী প্রেমের চাবিকাঠি
আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম সহজ উপায় হলো সব কাজে তাঁর ওপর নির্ভর করা। উচ্চারণ: ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল মুতাওয়াক্কিলিন। অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের (ভরসাকারীদের) ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
পরিশেষে, তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফল অর্পণ করা মহান আল্লাহর ওপর। এই মনোভাব মানুষকে সাফল্যের চূড়ায় যেমন বিনয়ী রাখে, তেমনি ব্যর্থতার আঁধারেও জোগায় বেঁচে থাকার শক্তি।
বি: দ্র: সাধারণ পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে বাংলা উচ্চারণ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশুদ্ধ উচ্চারণের জন্য মূল আরবি আয়াতের সাহায্য নেওয়া বাঞ্ছনীয়।



