হিমালয়ের রহস্যময় ধূপের গন্ধ ও হারিয়ে যাওয়া পর্বতারোহী
হিমালয়ের রহস্যময় ধূপের গন্ধ ও হারিয়ে যাওয়া পর্বতারোহী

মধ্য দুপুর। সূর্যের তীক্ষ্ণ আলো ছুরির ফলার মতো বরফের গায়ে পড়তেই পুরো পর্বত ঝলসে উঠল। বরফের সাদা চাদর ঝলমল করে চোখ ধাঁধিয়ে দিলো শৈলজিত দলের; তারপরেও তারা থেমে নেই। দুজন হাঁটছে তো হাঁটছেই, নিস্তব্ধতার ভেতর পা ফেলে এগিয়ে চলেছে।

হঠাৎ মাথার উপর দিয়ে একঝাঁক ‘দাগি রাজহাঁস’ দক্ষিণ থেকে উত্তরে সাইবেরিয়ার পথে উড়ে গেল। নিস্তব্ধতার মাঝে হাঁসগুলোর ডানা ঝাপটানোর ‘পতপত’ শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল, আর সেই শব্দ পর্বতের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হিমালয়ের শৃঙ্গের ওপরের নীরবতা ভেঙে যে পাখিরা আকাশকে মুখরিত করে তোলে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো দাগি রাজহাঁস। অন্য কোনো পাখি এত উঁচুতে উড়তে পারে না, অথচ এরা অনায়াসে প্রায় ২০ থেকে ২৯ হাজার ফুট উচ্চতায় ডানা মেলে আকাশে ভেসে বেড়ায়।

পর্বতারোহীরা মাঝে মাঝে এই রাজহাঁসদের দেখা পায়—বিশেষ করে এপ্রিল মাসে। কারণ এ সময় তারা দক্ষিণ এশিয়ার জলাভূমি থেকে উড়ে যায় দূর সাইবেরিয়ার প্রজননস্থলের উদ্দেশে। অন্যদিকে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে তারা আবার সাইবেরিয়া থেকে ফিরে আসে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একই আকাশপথ ধরে নেমে আসে দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণ জলাভূমিতে—খাদ্য ও আশ্রয়ের খোঁজে। তখন নদী, হাওর আর জলাভূমি ভরে ওঠে এই পাখিদের কোলাহলে। যদিও বাংলাদেশে এদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম, তবু মাঝে মাঝে দেখা মেলে; আর তখন যেন বাংলার প্রকৃতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজহাঁসের দল দিগন্ত পেরিয়ে মিলিয়ে যেতেই শৈলজিতরা সংবিৎ ফিরে পেল। আবার তারা হাঁটতে শুরু করল তিলকের খোঁজে। হাঁটতে হাঁটতে শৈলজিত আর লাকপা হাঁপিয়ে উঠল। তাদের পা আর চলছে না। অবশেষে দুজন দাঁড়িয়ে পড়ল, কিছুক্ষণ বুক ভরে নিশ্বাস নিলো। এখানে বসা সম্ভব নয়—কারণ বরফের উপর বসলে শরীরের তাপ দ্রুত কমে যাবে। তাই দাঁড়িয়েই তারা বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্রামের ফাঁকে দুজনের কথায় বারবার উঠে আসছিল তিলকের নাম। তার হারিয়ে যাওয়া নিয়ে শৈলজিত আর লাকপা গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়ল। এক পর্যায়ে শৈলজিত দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘তিলককে আমরা হারিয়ে যেতে দেব না। এবার সামনের দিকটা খুঁজব। ওদিকে এখনো খুঁজে দেখা হয়নি। চলো, এগিয়ে যাই।’ লাকপা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। দুজন আবার সামনে পা বাড়াল। কিন্তু যতই তারা এগোতে লাগল, পথ ততই ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকল। চারপাশে বরফে ঢাকা সরু পথ, সামান্য অসতর্ক হলে পা পিছলে গভীর খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তার ওপর বাতাসের ঝাপটা বরফকে আরও পিচ্ছিল করে তুলল। তারপরেও তারা থামেনি, অটল সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলছে।

এদিকে দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই, বিকেলের আলোও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। পর্বতের গায়ে লম্বা ছায়া পড়েছে, ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। তাদের ক্লান্ত শরীর আরও দুর্বল হয়ে উঠল। শৈলজিত আর লাকপা হাঁটতে হাঁটতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে। কতক্ষণ ধরে তারা তিলককে খুঁজছে, তা আর টেরই পায়নি। অবশেষে হুশ ফিরে আসতেই তারা সিদ্ধান্ত নিলো—আজ আর নয়, তাঁবুতে ফিরতে হবে এখনই।

যখন পিছনে ফিরবে, তখনই শৈলজিতের নাকে ধূপের গন্ধ ভেসে এলো। তিনি চারপাশে তাকিয়ে বললেন, ‘লাকপা, তুমি কি কোনো গন্ধ-টন্ধ পাচ্ছো? ধূপ-ধূনোর মতো... মনে হচ্ছে খুব কাছ থেকে আসছে।’ লাকপা প্রথমে অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল। তারপর নাক টেনে শুঁকে শুঁকে বুঝল বাতাসে সত্যিই ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। বরফের গায়ের সঙ্গে মিশে সেই ধূপের গন্ধ মুহূর্তেই তাদের মনে এক অজানা শিহরন জাগাল।

দুজনের বুক দ্রুত ধড়ফড় করতে লাগল। তারা বুঝল, এই গন্ধ সাধারণ কোন গন্ধ নয়। শৈলজিতের চোখে কৌতূহল আর আতঙ্ক ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘লোকজন নেই অথচ ধূপের গন্ধ আসছে; বিষয়টা ভালো ঠেকছে না আমার কাছে।’ শৈলজিতের কথা শুনে উত্তেজনা আর ভয়ে লাকপার শরীরের ক্লান্তিটাও মিলিয়ে গেল। কথা না বাড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধূপের গন্ধের উৎসের দিকে এগোতে লাগল লাকপা। শৈলজিত বাধা দিলেও সে শুনেনি। ফলে বাধ্য হয়ে শৈলজিত তার পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল।

কিছুদূর এগিয়ে শৈলজিত বললেন, ‘তিলক লিম্বুও একদিন বলেছিল, সে এই ধরনের গন্ধ পেয়েছিল। তখন এ-ও বলেছিল এটা দেবতার সতর্কবার্তা। আমরা সবাই বিদ্রুপ করেছিলাম, ভেবেছিলাম বেসক্যাম্প থেকে ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। এখন মনে হচ্ছে তিলক ভুল বলেনি।’ লাকপা হঠাৎ থেমে গেল। সতর্কতা তার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। কান খাড়া করে চারপাশে উঁকিঝুঁকি মেরে কিছু একটা খুঁজতে লাগল।

তাকে এদিক-ওদিক তাকাতে দেখে শৈলজিত কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লাকপা, কী খুঁজছ? বলবে আমাকে?’ লাকপা প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তার চোখে-মুখে অদৃশ্য কোনো ছায়ার প্রতিফলন ভেসে উঠছে। শৈলজিত দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করতেই লাকপা জবাব দিলো, ‘কিছু খুঁজে না পেলেও স্পষ্ট শুনতে পারছি।’ শৈলজিত ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন। ‘কী শুনতে পাচ্ছ বলো?’ লাকপা এবারও নীরব। ইতস্ত করছে জবাব দিতে। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস করে বলল, ‘বাতাসে ভেসে আসা গন্ধের সঙ্গে একটা অচেনা সুর শুনতে পাচ্ছি... অনেকটা মন্ত্রোচ্চারণের মতো। শব্দগুলো স্পষ্ট নয়, তবে ক্রমশ কাছে আসছে বলে মনে হচ্ছে। তুমি কি টের পাচ্ছ দাই?’

শৈলজিত থমকে দাঁড়ালেন। তার শরীর শিউরে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন এখানে তারা একা নয়। অন্য কারো উপস্থিতি আছে, অথচ চোখে ধরা পড়ছে না। তারা শব্দের উৎসের দিকে এগোতে লাগল। যতই সামনে অগ্রসর হচ্ছে, ততই শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কখনো প্রার্থনার সুর ভেসে আসছে, আবার কখনো অচেনা ভাষার মতো কিছু শব্দ কানে পৌঁছাচ্ছে। সেই গন্ধ আর রহস্যময় শব্দ অদৃশ্য শক্তির মতো তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলেও তারা পারছে না, পা যেন নিজে থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে।

লাকপা ভয়ে কেঁপে উঠল। বলল, ‘সম্ভবত তিলক দাইকে এভাবেই টেনে নিয়ে গেছে; যেভাবে আমাদের পা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি তিলক দাইকে বহু বছর ধরে চিনি। তিনি পালাতে পারেন না। নিশ্চয়ই বড় ধরনের কোনো বিপদে পড়েছেন।’ শৈলজিত চুপ করে রইলেন। তার চোখে-মুখে উদ্বেগের ছায়া ফুটে উঠল। ভেতরে ভেতরে সন্দেহ জাগতে শুরু করেছে, ‘তবে কি সত্যিই দেবতার ক্রোধের মুখে পড়েছে তিলক!’ শৈলজিত এবার দ্বিধায় পড়লেন। শরীর ভীষণ ক্লান্ত, হাঁটার শক্তি প্রায় শেষ। তথাপিও তাঁবুতে ফিরে যেতে মন চাচ্ছে না। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রচণ্ড ঘোর তৈরি হলো। তারা বুঝতে পারছিল না এখন কী করবে, কিংবা আদৌ কিছু করার আছে কি না।

সাধারণত ক্লান্ত হলে মানুষ বিশ্রাম নিতে চায়, সামনে এগোতে চায় না। অথচ আজ তাদের মনে এক অদৃশ্য টান জেগে উঠেছে তিলক লিম্বুর জন্য। কেবল তাকে খুঁজতেই ইচ্ছে করছে; কেন এমন হচ্ছে, তা নিজেরাও বুঝতে পারছে না। সিদ্ধান্তহীনতায় তারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে পর্বতের মাথায় ধীরে ধীরে আঁধার ঘনিয়ে এলো। সূর্যের শেষ আলো মিলিয়ে যেতে না যেতেই পর্বতের গায়ে ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠল। অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু অন্ধকারে ডুবে যাবে। তখন তারা যে বিপদের মুখোমুখি হবে, সেটা মাথায়ই আসছে না। যদিও ঘণ্টাতিনেক পর আকাশে চাঁদ উঠবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পর্বত নিমজ্জিত থাকবে আবছা আঁধারে। সেই আঁধার এতটাই ঘন হবে যে, বরফের ফাটল কিংবা খাদ চিহ্নিত করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

মাছাপুচ্ছ্রে এখন নীরব-নিস্তব্ধ। এরই মধ্যে লাকপা শেরপা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আমরা এখানে নিরাপদ নই। চলো দ্রুত ফিরে যাই।’ কথাটা শোনে শৈলজিত তাড়া দিলেন, ‘লাকপা, দ্রুত তাঁবুর দিকে রওয়ানা দাও। আমাদের সঙ্গে টর্চ নেই, অন্ধকারে পথ দেখা যাবে না। ঠান্ডা ঠেকানোর মতো যথেষ্ট জামা-কাপড়ও নেই। তাছাড়া অক্সিজেনও কমে আসছে। সুতরাং দেরি না করে এখনই ফিরতে হবে।’ সিদ্ধান্তটা নিয়ে তারা দ্রুত পা বাড়াল ফেরার পথে। কিন্তু যতই সামনে এগোতে চাইছে, ততই যেন একই জায়গায় ফিরে আসছে। পথটা গোলকধাঁধার মতো হয়ে উঠেছে। একবার বাঁ দিকে গেলে আবার ডান দিক থেকে সেই একই জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে।

এভাবে অনেকক্ষণ হেঁটেছে দুজন। পরিশেষে ক্লান্ত হয়ে লাকপা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি দাই? না কি একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি?’ শৈলজিত চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পথ একই রকম। তার মানে লাকপার ধারণাই সঠিক; একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এদিকে পর্বতে আবছা আঁধার নেমে এসেছে। তাই তারা বুঝতে পেরেছে এ সময় দিক ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবুও দুজনের মনে আত্মবিশ্বাস আছে যেভাবেই হোক তারা ঠিক পথ ধরেই এগিয়ে তাঁবুতে পৌঁছাতে পারবে।

দুজন পাশাপাশি হাঁটছে। হঠাৎ দূরে একটা আলোকরশ্মি দেখতে পেল তারা। আলোটা স্থির নয়, টর্চের মতো একবার জ্বলছে আবার নিভছে। দুজন থমকে দাঁড়িয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে রইল সেই আলোকরশ্মির দিকে। শৈলজিত নিচু কণ্ঠে বললেন, ‘আলোটা দেখতে পাচ্ছ? তবে কি দলের লোকজন আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছে।’ লাকপা শেরপা গভীরভাবে নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘মনে হয় না; সন্দেহ হচ্ছে। খেয়াল করছ আলোটা খুব অদ্ভুতভাবে জ্বলছে-নিভছে। আমার ধারণা কেউ ইচ্ছে করেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।’ দুজনের বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল। তারা বুঝতে পারছিল না—আলোটা সত্যিই তাদের সঙ্গীদের টর্চ, না কি অন্য কোনো রহস্যময় সংকেত। তবুও আশার আলো মনে বেঁধে তারা সেই দিকেই এগোনোর চেষ্টা করল।

হাঁটতে হাঁটতে লাকপা শেরপা বলল, ‘আলোটাকে আমার বিশ্বাস নেই। এটা অন্য কিছুও হতে পারে।’ শৈলজিত কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হতে পারে, একটু ধারণা দাও?’ লাকপা নিচু গলায় বলল, ‘হতে পারে দেবতার কারসাজি... এই আলো সাধারণ কিছু নয়।’ তার কথা শুনে শৈলজিত ক্ষণিকের জন্য চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘কারো কারসাজি নয়। আলো মানে আলোই। ওটাকে ফলো করো। যেদিকে দেখা যাচ্ছে, সেদিকেই এগিয়ে চলো। বাঁচতে হলে রিস্ক নিতে হবে।’

তারা সাবধানে পা বাড়াল। শৈলজিত আর লাকপা আলোর দিকে এগোতে লাগল। যতই তারা সামনে এগোচ্ছে, ততই ধূপের গন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠছে। মনে হলো গন্ধটা আরও কাছ থেকেই আসছে; ঠিক সামনে বসে ধূপ জ্বালালে যেমন নাকে গন্ধ আসে। লাকপা হাঁটা থামিয়ে বলল, ‘শৈল দাই, তুমি কিছু শুনছো?’ শৈলজিত কান পেতে দাঁড়িয়ে শুনে কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘হ্যাঁ শুনছি। দূর থেকে কারও কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। শব্দটা স্পষ্ট নয়; বরফের ভেতর থেকে উঠে আসছে।’ শৈলজিত কাঁপতে লাগল। তবু থামল না, এগিয়ে চলল। এই অবস্থায় হঠাৎ চারপাশে প্রবল বাতাস বইতে শুরু করল। মনে হলো অদৃশ্য কেউ তাদের জোর করে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। দুজন প্রাণপণে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করল আর পা শক্ত করে বরফে গেঁথে রাখল।

শৈলজিত বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘আমরা তাঁবুর দিকে ফিরছি না কেন লাকপা?’ লাকপা হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিলো, ‘চেষ্টা করছি তাঁবুর দিকে যেতে, পারছি না; ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না দাই।’ দুজন হতবাক হয়ে গেল। তারা নিশ্চিত হতে পারছে না, অজানা কোনো শক্তি তাদের পথ আটকে দিয়েছে কিনা। এদিকে বাতাসের ঝাপটা আর ধূপের গন্ধ মিলে চারপাশের পরিবেশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। শৈলজিত আর লাকপা এগোতে লাগল। বরফের ওপর তাদের পা পড়তেই অদ্ভুত প্রতিধ্বনি শোনা গেল। মনে হলো পর্বত নিজেই তাদের পদধ্বনির শব্দ ফিরিয়ে দিচ্ছে। যেমনটা হয়েছিল তিলক লিম্বুর ক্ষেত্রেও; যদিও সেই সময়ের পরিস্থিতি তাদের জানা নেই।

আরও কয়েক কদম এগোতেই আবছা আঁধারে চোখে পড়ল বরফের ওপর এক বিশাল ফাটল। সেই ফাটল থেকেই ভুরভুর করে ধোঁয়া উঠছে উপরের দিকে। আর ধোঁয়ার ভেতর থেকে এক ধরনের আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছে। তবে রশ্মিটা স্থির নয়, টর্চের আলোর মতো জ্বলছে-নিভছে। লাকপা বলল, ‘শৈল দাই, এখানে দাঁড়ানো ঠিক হবে না, চলো ফিরে যাই।’ শৈলজিত স্থির চোখে ফাটলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ফিরতে পারছি কই! পা দুটো যেন নিজ থেকেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে লাকপা।’ তারা বুঝতে পারছে কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে ফাটলের দিকে। ভয়ে তাদের বুক চেপে আসছে, তারপরেও তারা থামতে পারছে না। শৈলজিত ফাটলের কিনারায় এগিয়ে এলেন। কিনারটার পুরুত্ব খুবই কম। সামান্য চাপেই ভেঙে পড়তে পারে; তবু সে দাঁড়িয়ে রইল মন্ত্রমুগ্ধের মতো।

এমনি সময় শৈলজিত শুনতে পেলেন কান্নার মতো একটা শব্দ। সেই কান্না যে পর্বতের গভীর থেকে উঠে আসছে, তা বুঝতে তাদের তেমন কষ্ট হয়নি। দুজন আর স্থির থাকতে পারল না। শৈলজিত আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, ‘দ্রুত পেছনে দৌড়াও!’ চেষ্টা করেও তারা দৌড়াতে পারল না; তাদের দুজনের দুই জোড়া পা বরফে আটকে গেল। লাকপা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘তিলক দাই, হয়তো এভাবেই হারিয়ে গেছেন। দেবতার ক্রোধের শিকার হয়েছেন তিনি।’ শৈলজিত কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আলোটা তীব্র হয়ে উঠল। ফাটলের ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা ছায়া দেখা গেল। ছায়াটা মানুষের মতো, আবার পুরোপুরি মানুষও নয়। কখনো লম্বা হচ্ছে, কখনো ছোট হয়ে যাচ্ছে।

দুজন শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় তাকিয়ে রইল। ছায়াটা আস্তে আস্তে বরফের গভীর থেকে উঠে আসছে। উপরের দিকে আসতে আসতে ওটার আকৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চারপাশে তখন প্রবল ঠান্ডা বাতাস বইছে। ধূপের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। শৈলজিত বুঝতে পারছেন না, এটা কি সত্যিই কোনো মানুষ, নাকি অদৃশ্য দেবতা তাদের দিকে আসছে। লাকপা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না আর। পড়ে যাচ্ছি... আমাকে ধরো দাই।’ শৈলজিত মরিয়া হয়ে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু নড়তে পারছেন না। তার শরীর বরফের মতো শক্ত হয়ে গেছে। কয়েকবার চেষ্টা করে একচুলও নড়তে পারলেন না।

লাকপা কাঁপতে কাঁপতে শৈলজিতের দিকে ঝুঁকে পড়ল। আতঙ্কে তার চোখ বড় হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ফাটলের গভীর থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে দমকা হাওয়া বেরুতে লাগল। আর সেই হাওয়ার ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে বরফের ওপর ছিটকে পড়ল দুজন। আলোটাও নিভে গেল। চারপাশে অন্ধকার নেমে এলো। এই অন্ধকার এতই ঘন যে, তারা একে অপরকেও দেখতে পেল না। তার ওপর কণ্ঠস্বরও বসে গেছে, কথা বলারও শক্তি নেই। ফাঁদে পড়া বক পাখির মতো দুজন চটপট করতে লাগল।

ধোঁয়ার তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে গেল। চারদিক থেকে ধোঁয়া এসে তাদের ঘিরে ফেলল। শৈলজিতের চোখে ভেসে উঠল ছায়াটা। দেখতে মানুষের মতো, আবার পুরোপুরি মানুষও নয়। ধোঁয়ার ভেতর থেকে ছায়াটা হাত বাড়াচ্ছে, তবে সত্যিই বাড়াচ্ছে কি না তাও বোঝা গেল না। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল..। তারপর সবকিছু মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। বাতাসে শুধু ভেসে রইল ধূপের গন্ধ আর বরফের গভীর থেকে উঠে আসা কান্নার মতো শব্দ। মনে হলো, সেই কান্না পর্বতের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে, আর অজানা কোনো শোকের প্রতিধ্বনি হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

অতঃপর কেউই জানল না শৈলজিত আর লাকপার শেষ পরিণতি কী হলো। তারা কোথায় হারিয়ে গেল, কীভাবে মিলিয়ে গেল—সবই রহস্য হয়ে রইল। শুধু ধূপের গন্ধ ভেসে রইল বাতাসে, আর তাদের কান্নার প্রতিধ্বনি পর্বতের গহিনে চাপা পড়ে থেকে গেল অনন্তকালের নিস্তব্ধতায়।