কুরবানি: ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ? ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
কুরবানি: ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ?

কুরবানি বা উদহিয়াহ আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মহান ইবাদত। নির্ধারিত দিনগুলোতে উট, গরু, ছাগল বা ভেড়া জবাই করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাজ নয়, বরং বান্দার ভালোবাসা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক। কুরবানির সর্বোত্তম সময় হলো জিলহজ মাসের ১০ তারিখ।

কুরআনের নির্দেশনা

মহান আল্লাহ বলেন, 'অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি করো।' (সুরা কাউসার: আয়াত ২) এই আয়াতে নামাজ ও কুরবানি—দুটি ইবাদতকেই আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং তিনি নিয়মিত কুরবানি দিতেন।

নবীজির আমল

হাদিসে এসেছে, হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, 'নবী (সা.) মদিনায় অবস্থানকালে দশ বছর কুরবানি করেছেন।' (মুসনাদ আহমাদ; তিরমিজি) হজরত আনাস (রা.) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদা-কালো মিশ্র রঙের, শিংবিশিষ্ট দুটি দুম্বা কুরবানি করেছেন।' (বুখারি ৫৫৫৮; মুসলিম ১৯৬৬) নবী (সা.) কোনো বছর কুরবানি ত্যাগ করেননি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কুরবানির সময় ও গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে জবাই করে, সে নিজের জন্য জবাই করে। আর যে নামাজের পরে জবাই করে, তার কুরবানি সম্পন্ন হয় এবং সে মুসলমানদের সুন্নাহ অনুসরণ করে।' (বুখারি: ৫৫৪৫/৫২২৬) তিনি আরও বলেছেন, 'যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।' (মুসনাদ আহমাদ ২/৩২১; ইবনে মাজাহ ৩১২৩)

কুরবানি: ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ?

কুরবানি শরিয়তসম্মত ইবাদত—এ ব্যাপারে সবাই একমত। তবে এটি ওয়াজিব না সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ—এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-সহ কিছু আলেম এটিকে ওয়াজিব বলেছেন। অধিকাংশ সাহাবি, তাবেঈন ও ফকিহদের মতে এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তবে উত্তম পথ হলো সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি ত্যাগ না করা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সহযোগিতায় কুরবানি

অন্যের দান বা সহযোগিতায় কেউ কুরবানি করলে তা আদায় হয়ে যাবে এবং দাতা ও কর্তা উভয়েই সওয়াব পাবেন। তবে ঋণ করে কুরবানি দেওয়া জরুরি নয়। কেউ যদি অন্যের পক্ষ থেকে কুরবানি করে, তবে তার নিজের পক্ষের কুরবানি আদায় হবে না।

নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি

প্রত্যেক মুসলিমের নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করা উচিত। এতে আল্লাহর আদেশ পালন ও নবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে বিরাট সওয়াব অর্জিত হয়।

কুরবানি বাদ দিয়ে সদকা যথেষ্ট নয়

হজ না করে তার অর্থ সদকা করলে যেমন ফরজ আদায় হয় না, তেমনি কুরবানি না করে তার মূল্য সদকা করলেও কুরবানি আদায় হয় না। কারণ কুরবানি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যেখানে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ করা হয়। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ২৬/৩০৪)

কুরবানি বনাম সদকা

হজরত ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেন, 'কুরবানি করা তার মূল্য সদকা করার চেয়ে উত্তম, যদিও সেই মূল্য বেশি হয়।' কারণ এটি নামাজের মতো নির্ধারিত ইবাদত। আল্লাহ বলেন, 'বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।' (সুরা আনআম: আয়াত ১৬২)

জীবিত ও মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানি

কুরবানি মূলত জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে করাই উত্তম। তবে সে চাইলে তার সওয়াবে জীবিত বা মৃত আত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। নবীজি (সা.) নিজের, পরিবার-পরিজন ও উম্মতের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন। (মুসনাদ আহমাদ ৬/৩৯১-৩৯২; বায়হাকি ৯/২৬৮) একটি কুরবানিতে একাধিক মৃত ব্যক্তিকেও শরিক করা বৈধ, যদি তাদের ওপর আলাদা কুরবানি ওয়াজিব না থাকে।

মৃত ব্যক্তির অসিয়ত অনুযায়ী কুরবানি

যদি কেউ তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে কুরবানি করার অসিয়ত করে যান, তবে তা বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব। এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা বৈধ নয়। প্রয়োজনে কয়েক বছরের অর্থ একত্র করে কুরবানি দিতে হবে।

মুসাফিরের কুরবানি

মুসাফিরের জন্যও কুরবানি করা বৈধ ও প্রমাণিত। হাদিসে এসেছে, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) মিনায় অবস্থানকালে তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন।' (বুখারি ২৯৪, ৫৫৪৮; মুসলিম ১৯৭৫)

কুরবানির শিক্ষা

কুরবানি কেবল পশু জবাই নয়; এটি ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ইবরাহিম (আ.)-এর আদর্শ আমাদের শেখায়—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবকিছু উৎসর্গ করাই প্রকৃত সফলতা। তাই সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের নিয়ম মেনে, আন্তরিকতার সঙ্গে কুরবানি আদায় করা উচিত এবং এর মাধ্যমে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে নিবেদিত করার অঙ্গীকার করা।