ইসলামি পরিভাষায় ন্যায়বিচার বা ইনসাফ বোঝাতে ‘আদল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ইসলামি জীবনদর্শনে ‘আদল’ শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি একটি সুদৃঢ় ধর্মীয় কর্তব্য। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও প্রকৃতির বিন্যাসেও ইসলাম ইনসাফ কায়েমের নির্দেশ দেয়।
ইসলামে ন্যায়বিচারের বিভিন্ন ক্ষেত্র
বিচারিক ও প্রশাসনিক ইনসাফ
ইসলামি শাসনব্যবস্থায় বিচারক বা শাসককে পূর্ণ নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে হয়। এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা আত্মীয়তার কোনো স্থান নেই। কোরআন নির্দেশ দেয়, “যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ইনসাফ করবে, যদিও সে তোমার আত্মীয় হয়।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫২) কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ইনসাফ না করার দিকে প্ররোচিত না করে; তোমরা ইনসাফ করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক কেয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবেন। তবে ইসলামে যেখানে ব্যক্তিগত পাওনা-দেনার বিষয় থাকে, সেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে ‘ফজল’ বা ক্ষমা ও মহানুভবতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩৭) কিন্তু বিচারকের আসনে বসে কারো প্রতি দয়া দেখিয়ে অন্যের হক নষ্ট করার সুযোগ নেই।
বিচারকের চারিত্রিক দৃঢ়তা
একজন বিচারককে মানসিকভাবে শান্ত থেকে বিচারকার্য পরিচালনা করতে হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় বিচার না করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৫৮) ইতিহাস থেকে জানা যায়, খলিফা মাহদির আমলে একজন বিচারক পদত্যাগ করেছিলেন শুধু এই কারণে যে এক ব্যক্তি তাকে উপহার দেওয়ার পর একটি মামলা নিয়ে এসেছিল। তিনি মনে করেছিলেন, উপহার দেওয়ার দুঃসাহস দেখানোর অর্থ হলো বিচারকের ব্যক্তিত্ব ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া।
শত্রুর প্রতিও ন্যায়সঙ্গত আচরণ
সাধারণত মানুষ শত্রুর প্রতি অন্যায় করতে প্রলুব্ধ হয়। কিন্তু ইসলাম একে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বলা হয়েছে, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ইনসাফ না করার দিকে প্ররোচিত না করে; তোমরা ইনসাফ করো, এটাই তাকওয়ার নিকটতর।” (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮) অর্থাৎ বন্ধুর সঙ্গে যেমন আচরণ, শত্রুর সঙ্গেও হকের বিচারে তেমন আচরণই করতে হবে।
পরিবারে ইনসাফ
স্ত্রীদের মধ্যে সমতা: একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে আবাসন, ভরণপোষণ ও সময় প্রদানের ক্ষেত্রে সমানাধিকার নিশ্চিত করা ওয়াজিব। (সুরা নিসা, আয়াত: ৩) তবে হৃদয়ের টান বা মহব্বত যেহেতু মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, তাই এক্ষেত্রে আল্লাহ–তাআলা সামান্য বিচ্যুতি ক্ষমা করেছেন (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৯), তবে এক স্ত্রীকে ‘ঝুলন্ত’ অবস্থায় রাখা যাবে না।
সন্তানদের মধ্যে সমতা: উপহার প্রদানের ক্ষেত্রে সকল সন্তানের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের মাঝে উপহারের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করো।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩৬৮৭) তবে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের (যেমন বড় সন্তানের পড়াশোনার খরচ) ক্ষেত্রে ভিন্নতা ইনসাফের পরিপন্থী নয়।
উত্তরাধিকার: মিরাস বা উত্তরাধিকার বণ্টন আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি কোনো ওয়ারিশকে তার হক থেকে বঞ্চিত করবে, তার জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪)
লেনদেনে ইনসাফ
ওজনে কম দেওয়া বা মানুষকে ঠকানো ইসলামের দৃষ্টিতে বড় অপরাধ। হজরত শোআইব (আ.) তাঁর জাতিকে এই ইনসাফ কায়েমের আহ্বান জানিয়েছিলেন। যারা ওজনে কম দেয়, তাদের জন্য ‘ওয়াইল’ বা ধ্বংসের দুঃসংবাদ দেওয়া হয়েছে। (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১-৩) এছাড়া মানুষের শারীরিক ও আত্মিক চাহিদার মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখা ইনসাফের অংশ।
প্রতিশোধে ইনসাফ
যদি কেউ অন্যায় করে, তবে সমপরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি করা যাবে না। আল্লাহ বলেন, “আর যদি তোমরা প্রতিশোধ নাও, তবে ঠিক ততটুকুই নাও যতটুকু তোমাদের প্রতি করা হয়েছে; আর যদি তোমরা ধৈর্য ধরো, তবে ধৈর্যশীলদের জন্য সেটাই উত্তম।” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৬) এখানে ব্যক্তিগত আক্রোশ না মিটিয়ে ক্ষমা ও সংশোধনের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
ভাষা ও শৈল্পিক বিন্যাসে ইনসাফ
ইসলামের সৌন্দর্যের একটি অনন্য দিক হলো আরবি ভাষার ব্যাকরণ ও কোরআন পাঠের তাজবিদেও ‘আদল’ বা ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে। ব্যাকরণ: যেমন—পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক শব্দের রূপান্তরে এবং হরকতের (যবর, যের, পেশ) ব্যবহারে এক অদ্ভুত গাণিতিক ও ধ্বনিগত ভারসাম্য বিদ্যমান। তাজবিদ: পাঠের সময় দুর্বল হরফকে (যেমন হরফে ইল্লাত) শক্তিশালী হরফের (যেমন হামজা) সঙ্গে মেলাতে গিয়ে ‘মাদ্দ’ বা দীর্ঘ করার বিধান রাখা হয়েছে, যাতে দুর্বল ও সবলের মধ্যে এক ধরনের ধ্বনিগত ভারসাম্য তৈরি হয়। হরফ বিন্যাস: আরবি বর্ণমালার ২৮টি অক্ষরের মধ্যে ১৪টি ‘শামসি’ (সৌর) এবং ১৪টি ‘ক্বমারি’ (চন্দ্র) হিসেবে ভাগ করা হয়েছে—যা ইনসাফপূর্ণ বণ্টনের এক অনন্য উদাহরণ।
সারকথা
মহাবিশ্বের স্রষ্টা পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীর প্রতিটি ধূলিকণায় ইনসাফ ও ভারসাম্য রেখে দিয়েছেন। খনিজ সম্পদ, পানি ও নেয়ামতের যে বণ্টন পৃথিবীতে রয়েছে, তা সকল প্রাণীর প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট। মানুষের কাজ হলো এই ভারসাম্য বজায় রাখা। একজন মুমিন যখন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইনসাফ কায়েম করে, তখন সে শুধু আল্লাহর নির্দেশই পালন করে না, বরং একটি শান্তিময় ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখে।



