হজের ইতিহাস: ইব্রাহিমের ত্যাগ থেকে লাব্বাইক ধ্বনির মহাকাব্য
হজের ইতিহাস: ইব্রাহিমের ত্যাগ থেকে লাব্বাইক ধ্বনি

ইতিহাসের ধূসর, জীর্ণ ও বিস্মৃতপ্রায় পাতাগুলো যদি আমরা একে একে উল্টে নিবিড় কৌতূহলে সাড়ে চার হাজার বছর পেছনে ফিরে তাকাই, তবে এক অপার্থিব, অলৌকিক ও চিরন্তন উপাখ্যানের রূপোলি আলোয় চোখ জুড়িয়ে যায়। চারদিকে দিগন্তবিস্তৃত তপ্ত বালুচর, মাথার ওপর অগ্নিবর্ষণকারী ভাস্কর আর আদি-অন্তহীন এক জনমানবহীন প্রান্তর। বাতাস সেখানে থমকে দাঁড়ায় উত্তাপের তীব্রতায়, পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে থাকে রুক্ষ মৌনতায়। এই রূপহীন, রসহীন, বাতাহীন এবং উদ্ভিদহীন উপত্যকাটিই আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে স্পন্দিত ও পবিত্র নগরী— মক্কা মুকাররমা।

আজ যেখানে কোটি কোটি কণ্ঠের লাব্বাইক ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়, সেকালে সেখানে ছিল কেবল নিথর নীরবতা। এই জনহীন প্রান্তরেই এক সময় রোপিত হয়েছিল ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হজের আদি ও অকৃত্রিম বীজ। হজ কেবল একটি বার্ষিক ধর্মীয় সমাবেশ, নিছক আচার কিংবা আনুষ্ঠানিকতার সমষ্টি নয়; এটি মূলত এক পরম প্রেম, চরম ত্যাগ এবং ঐশী আদেশের সমুখে এক নিষ্ঠাবান ও সমর্পিত পরিবারের নিঃশর্ত আত্মত্যাগের এক জীবন্ত, অবিনশ্বর মহাকাব্য।

মরুভূমির বুকে এক অলৌকিক উৎস: ইব্রাহিমী ত্যাগ ও মহীয়সী হাজেরা

হজের ইতিহাসের আদি উৎসটি অন্বেষণ করতে গেলে আমাদের থমকে দাঁড়াতে হয় আল্লাহর পরম বন্ধু হযরত ইব্রাহিম (আ.), তার মহীয়সী স্ত্রী হযরত হাজেরা (আ.) এবং তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশু হযরত ইসমাইল (আ.) এর এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি। তখন ইব্রাহিম (আ.) এর বার্ধক্যের শেষ সীমায় এসে পাওয়া একমাত্র নয়নের মণি ইসমাইল। অথচ, এক গভীর ঐশী নির্দেশ ও পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি তার এই প্রিয়তমা স্ত্রী ও বুকচেরা ধনকে মক্কার নির্জন সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে রেখে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেখানে কোনও ছায়া নেই, কোনও ফলবতী বৃক্ষ নেই, এক ফোঁটা পানী ও জলের উৎস নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রিয় পরিবারকে সেই মরুর বুকে রেখে যখন ইব্রাহিম (আ.) ব্যথিত হৃদয়ে পা বাড়ালেন, তখন পিছু ছুটে এলেন ব্যাকুল হৃদয়ে বিবি হাজেরা। স্বামীর জামার খুঁট ধরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে ইব্রাহিম! আপনি কি আমাদের এই জনহীন, নির্জন প্রান্তরে এভাবে ফেলে রেখে যাচ্ছেন?’ ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন নির্বাক, চোখের জল আড়াল করে তিনি সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন– কারণ আল্লাহর নির্দেশ তখন তার হৃদয়ে অটল। কিন্তু যখন বিচক্ষণ ও ঈমানদার হাজেরা (আ.) পুনরায় শুধালেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এই কঠিন আদেশ দিয়েছেন?’ ইব্রাহিম (আ.) তখন কেবল মৃদু মস্তক নেড়ে সায় দিলেন। তখনই ফুটে উঠেছিল এক মহীয়সী নারীর ইতিহাসের সবচেয়ে অটল ও ইস্পাতকঠিন বিশ্বাসের বাণী, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের কখনোই ধ্বংস করবেন না।’

স্বামীর অবর্তমানে সেই জনমানবহীন মরুভূমিতে প্রখর মধ্যাহ্নে তৃষ্ণায় যখন শিশু ইসমাইল (আ.) ছটফট করছিলেন, তখন মাতৃত্বের এক চরম, অবর্ণনীয় ব্যাকুলতায় বিবি হাজেরা পানির খোঁজে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে তিনি দিগন্তে পানির কোনও রেখা বা কাফেলার ধুলো ওড়ে কিনা, তা দেখছিলেন আর নিচে নেমে সন্তানের বুকভাঙা কান্না শুনে তীব্র গতিতে দৌড়াচ্ছিলেন।

মায়ের সেই আকুলতা, ব্যাকুলতা ও অপত্য স্নেহের দৃশ্য আরশের মালিক আল্লাহ তাআলাকে এতটাই আন্দোলিত ও আলোড়িত করেছিল যে, কিয়ামত পর্যন্ত আগত পৃথিবীর প্রতিটি হজযাত্রীর জন্য সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার সাঈ বা দ্রুতবেগে দৌড়াদৌড়ি করাকে তিনি হজের অন্যতম প্রধান ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় বিধান করে দিলেন। ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাইকে আজ সেই মায়ের স্মৃতির মিছিলে শামিল হতে হয়।

আর ঠিক তখনই, যখন মাতৃত্বের ব্যাকুলতা চরম সীমায় পৌঁছাল, শিশু ইসমাইলের পায়ের গোড়ালির আঘাতে তপ্ত বালুরাশি ফুঁড়ে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো এক চিরন্তন, অলৌকিক পানির ধারা– যার নাম ‘যমযম’। হাজেরা (আ.) কুদরত দেখে বিস্ময়ে পাথর হয়ে পানির চারদিকে বাঁধ দিতে দিতে বললেন, ‘যমযম’ (থেমে যাও, থেমে যাও)। এই যমযমকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে আরবের যাযাবর কাফেলাগুলো সেখানে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে, গড়ে ওঠে মক্কা নগরী। অবসান ঘটে ওই অঞ্চলের চিরন্তন নির্জনতার।

কাবার পুনর্নির্মাণ ও হজের মহাসমাবেশের ডাক

কালের পরিক্রমায় কয়েক বছর কেটে গেলো। শিশু ইসমাইল (আ.) তখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছেন। পিতা ও পুত্রের ভালোবাসার বন্ধন যখন আরও সুদৃঢ়, ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা তাদের দুজনকে আদেশ দিলেন মানবজাতির ইবাদতের জন্য পৃথিবীর বুকে এক আদি ও প্রধান মহাসৌধ পুনর্নির্মাণের। পিতা ও পুত্র মিলে তপ্ত রোদে পুড়ে, হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তৈরি করলেন আল্লাহর ঘর– পবিত্র কাবা শরীফ। পাথর বহন করতে করতে ইব্রাহিম (আ.) এর পা যেখানে বসে গিয়েছিল, আজ তা ‘মাকামে ইব্রাহিম’ নামে সংরক্ষিত।

কাবা ঘর নির্মাণ শেষে যখন তা দীপ্তিময় হয়ে উঠলো, তখন মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে নির্দেশ দিলেন, ‘আর মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সূরা হজ্জ: ২৭)।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) তখন কিছুটা বিস্মিত হয়ে আরজ করলেন, ‘হে প্রভু! এই জনমানবহীন প্রান্তরে আমার এই ক্ষীণ কণ্ঠস্বরকে শুনবে? কার কাছে পৌঁছাবে এই ডাক?’ আল্লাহ তাআলা অভয় দিয়ে বললেন, ‘তোমার দায়িত্ব কেবল ঘোষণা দেওয়া, আর তা মানুষের কান ও হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।’

ইসলামী ঐতিহ্য ও বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ইব্রাহিম (আ.) তখন জাবালে কুবাইস পাহাড়ে দাঁড়িয়ে মানবজাতিকে হজের এই মহাসমাবেশের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে সেই আওয়াজ তৎকালীন বিশ্বের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে, সময়ের প্রাচীর ভেঙে, অনাগত কালের কোটি কোটি মুমিনের রুহ বা আত্মার গহীনে পৌঁছে গিয়েছিল। সেদিন মাতৃগর্ভে কিংবা পিঠের মেরুদণ্ডে থাকা যেসব রুহ ‘লাব্বাইক’ (আমি উপস্থিত) বলে সাড়া দিয়েছিল, তারাই যুগে যুগে হজের যাত্রী হয়ে কাবার আঙিনায় ছুটে আসে। লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত হওয়া সেই অন্তহীন, শাশ্বত কাফেলার মহাসূচনা হয়েছিল সেদিনই।

জাহেলিয়াত, বিচ্যুতি ও ইসলামের পুনর্জাগরণ: অন্ধকারের অমানিশা

হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাইল (আ.) এর ইন্তেকালের পর শত শত বছর ধরে আরবে এই হজের ধারা কোনোমতে অব্যাহত ছিল। তবে সময়ের ক্রূর চক্রে এবং মক্কার কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের হাত ধরে এই পরম পবিত্র তাওহিদি ইবাদতে যুক্ত হয়েছিল পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও চরম জাহেলিয়াত বা অন্ধকার। তাওহিদের মূর্ত প্রতীক যে কাবা ঘর, তা কালক্রমে রূপ নিয়েছিল ৩৬০টি পাথরের মূর্তির কলঙ্কিত আখড়ায়। লাত, উয্যা, মানাত আর হোবলের আরাধনায় মগ্ন আরবরা হজের মূল চেতনাকেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

জাহেলী যুগে আরবরা হজ করত ঠিকই, কিন্তু তার রূপ ছিল বিকৃত ও কদর্য। অনেক গোত্রের মানুষ মনে করতো, পাপের পোশাকে আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করা যাবে না; তাই তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ বা নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফ করতো। তারা কাবার সামনে এসে শিস দিত, তালি বাজাত এবং হজের আধ্যাত্মিক আবহকে ম্লান করে একে রূপ দিয়েছিল মেলা, জুয়া, মদ্যপান ও গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের আমোদ-প্রমোদের আতিশয্যে। কুরবানির পশুর রক্ত তারা কাবার দেয়ালে লেপে দিত এবং মাংস ছুঁড়ে মারতো কাবার দিকে, এই ভেবে যে আল্লাহ হয়তো রক্ত-মাংসের কাঙাল!

অবশেষে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের শুরুতে আরবের সেই ঘোর অমানিশা দূর করতে আগমন ঘটল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর। দীর্ঘ ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, অষ্টম হিজরিতে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের পর তিনি কাবা ঘরকে চিরতরে মূর্তিমুক্ত করে এর আদি, ইব্রাহিমী ও অকৃত্রিম রূপ ফিরিয়ে দেন। নবম হিজরিতে হজ মুসলমানদের জন্য ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য হিসেবে ঘোষিত হয় এবং দশম হিজরিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং জীবনের শেষ ও একমাত্র হজ সম্পাদন করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে ‘বিদায় হজ’ নামে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

রাসূল (সা.) তার সেই ঐতিহাসিক বিদায় হজের মাধ্যমে ইব্রাহিমী ঐতিহ্যের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে হজের প্রতিটি নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি ও দর্শনকে জাহেলিয়াতের সব আবর্জনা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে পুনর্গঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেন। আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে তিনি মানবজাতির উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘তোমরা আমার কাছ থেকে হজের যাবতীয় নিয়ম-কানুন ও রীতিনীতি শিখে নাও।’ তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, কোরবানির পশুর রক্ত বা মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার অন্তরের তাকওয়া বা খোদাভীতি।

হজের আচার ও তার আধ্যাত্মিক প্রতীকী রূপ

হজের প্রতিটি রোকন বা আচারের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন এবং ঐতিহাসিক ঘটনার জীবন্ত পুনর্ণির্মাণ। হজযাত্রীরা যখন মিকাত বা নির্দিষ্ট সীমানায় এসে নিজেদের সিল্ক, স্যুট কিংবা মখমলের পোশাক ত্যাগ করে কেবল সাধারণ দুটুকরো সেলাইবিহীন সাদা কাপড় গায়ে জড়ান, যাকে ‘ইহরাম’ বলা হয়– তখনই মানুষের সব পার্থিব অহংকার, পদবি ও আভিজাত্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এই ইহরামের কাপড় মূলত কাফনের কাপড়ের এক জীবন্ত স্মারক, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে এই পৃথিবীর সব বৈভব ক্ষণস্থায়ী।

তাওয়াফ: কাবার চারপাশে সাতবার ঘূর্ণন বা তাওয়াফ হলো সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহর প্রতি বান্দার তীব্র প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। গ্রহ যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, মুমিনও তেমনি তার অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থান: ৯ জিলহজ আরাফাতের ধু-ধু ময়দানে কোটি কোটি মানুষের সমবেত হওয়া হজের সবচেয়ে বড় রোকন। তপ্ত রোদের নিচে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে ক্রন্দন করা, ক্ষমা চাওয়া– এটি মূলত পরকালের হাশরের ময়দানের এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু মূর্ত মহড়া। যেখানে কোনও বিচারক নেই আল্লাহ ছাড়া, কোনও আশ্রয় নেই তার রহমত ছাড়া।

মুযদালিফায় রাতযাপন: খোলা আকাশের নিচে, তারকারাজির তলায় বালি আর পাথরের বিছানায় রাত কাটানো মানুষকে শেখায় পরম বিনয় ও প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা।

জামারাতে পাথর নিক্ষেপ: মিনায় গিয়ে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর ছুঁড়ে মারার মধ্য দিয়ে মুমিন ব্যক্তি মূলত হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সেই স্মৃতির জাবর কাটে, যখন তিনি সন্তান কোরবানির পথে শয়তানের প্ররোচনাকে পাথর মেরে তাড়িয়েছিলেন। এটি মানুষের নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক চিরন্তন সংগ্রামের দৃপ্ত শপথ।

হজের চিরন্তন আবেদন: সাম্য ও বিশ্ব-ঐক্যের মহোৎসব

আজকের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত, বর্ণবাদী ও বিভক্ত আধুনিক পৃথিবীতে হজ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বিশ্ব-মানবতার এক অভূতপূর্ব ও সর্ববৃহৎ সাম্যের মহাসম্মিলন। ইউরোপের ধনাঢ্য শ্বেতাঙ্গ, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ার হলদেটে চামড়াধারী কিংবা প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের কোনও ভৌগোলিক বা নৃতাত্ত্বিক ভেদাভেদ থাকে না মক্কা ও মিনার প্রান্তরে। সব রাজকীয় পোশাক, রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল আর সামাজিক আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে, রাজা আর প্রজা, আমির আর ফকির একই রকম পোশাকে আবৃত হয়ে একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

ম্যালকম এক্সের মতো বিশ্বখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নেতা কাবার এই হজের ময়দানে এসেই তার জীবনের বর্ণবাদী ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, এখানে শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গের মাঝে কোনও দেয়াল নেই; সবাই ভাই ভাই, সবার কণ্ঠে একই সুর ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। হজ আমাদের শেখায় কীভাবে সব পার্থিব দেওয়াল ভেঙে এক পরম বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের জন্ম দিতে হয়।

শেষ কথা: অন্তহীন এক মহাসফর

হজ যেভাবে পৃথিবীতে এসেছিল, সেই সুদীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে মিশে আছে দীর্ঘশ্বাস, অশ্রু, পরম ত্যাগ, নিঃশর্ত আনুগত্য আর অলৌকিকতার এক অপার্থিব সুষম মিশ্রণ। এটি কোনও সাধারণ পর্যটন নয়, এটি আত্মার শুদ্ধি অভিযান। সাড়ে চার হাজার বছর আগে মরুভূমির এক তপ্ত ও নির্জন প্রান্তরে এক বৃদ্ধ পিতার জীর্ণ কণ্ঠে যে ‘লাব্বাইক’ ধ্বনির প্রতিধ্বনি উঠেছিল, আজ তা শত-কোটি মুসলিমের হৃদয়ের স্পন্দন, জীবনের পরম আকাঙ্ক্ষা।

হজের এই শাশ্বত ও পুণ্যময় যাত্রা শুধু মক্কার ভৌগোলিক সীমানায় বা জিলহজ মাসের কয়েকটা দিনেই আবদ্ধ নয়; এটি মূলত মানুষের পশুবৃত্তিকে জবেহ করে, আত্মিক পরিশুদ্ধির আবিরে নিজেকে রাঙিয়ে, জীবনের শেষ প্রান্তে পরম সত্তা আল্লাহর দিকে ফেরার এক অনন্ত ও শাশ্বত মহাসফর। হজ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষ যেন এক নিষ্পাপ নবজাতক– যার হৃদয়ে আর কোনও কলুষতা থাকে না, থাকে কেবল কাবার সেই কালো গিলাফের পরম মমতাময় হাতছানি।

মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুফতিদারুল উলুম ঢাকা, মিরপুর-১৩