আজ হলিউড অভিনেতা হেনরি ক্যাভিলের জন্মদিন। ছোটবেলার অনিশ্চয়তা, ক্যারিয়ারের শুরুতে একের পর এক প্রত্যাখ্যান, শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ—সবকিছু পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আধুনিক সুপারহিরো যুগের এক উজ্জ্বল মুখ। জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা করা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের নানা দিক।
স্বপ্নের শুরুটা ছিল নিঃশব্দ
১৯৮৩ সালের ৫ মে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের জার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন হেনরি ক্যাভিল। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। শৈশবেই তাঁকে বোর্ডিং স্কুলে পড়তে হয়, যেখানে তিনি প্রায়ই নিগ্রহ ও ঠাট্টার শিকার হতেন। সহপাঠীরা তাঁকে 'মোটা' বলে বিদ্রূপ করত। এই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করলেও ভেতরে ভেতরে তৈরি করেছিল এক অদম্য জেদ। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায় স্কুলের নাটকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তখন কেউ ভাবেনি, এই ছেলেটিই একদিন হলিউডের সবচেয়ে আইকনিক চরিত্রগুলোর একটির মুখ হয়ে উঠবেন।
প্রত্যাখ্যানের দীর্ঘ তালিকা
ক্যাভিলের অভিনয়জীবন শুরু হয় ছোট ছোট চরিত্র দিয়ে। ২০০১ সালে 'লাগুনা' চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম উপস্থিতি। এরপর 'দ্য ক্রাউন্ট অব মন্টে ক্রিস্টো'-তে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তাঁকে কিছুটা পরিচিতি দেয়। তবে এই সময়টায় তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত হন 'অল্পের জন্য হাতছাড়া' হওয়া অভিনেতা হিসেবে। তিনি অডিশন দিয়েছিলেন 'হ্যারি পটার'-এ সেড্রিক ডিগরির চরিত্রের জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূমিকা পান রবার্ট প্যাটিনসন। একইভাবে 'ক্যাসিনো রয়্যাল'-এ জেমস বন্ডের চরিত্রের জন্যও বিবেচনায় ছিলেন, কিন্তু সুযোগ যায় ড্যানিয়েল ক্রেগের কাছে। এই ব্যর্থতাগুলোর কারণেই তাঁকে একসময় 'হলিউডের সবচেয়ে দুর্ভাগা মানুষ' বলে আখ্যা দেয় মিডিয়া। কিন্তু ক্যাভিল থামেননি।
২০০০ সালে 'প্রুফ অব লাইফ' ছবিতে এক্সট্রা হিসেবে কাজ করার সময় ক্যাভিল কথা বলেছিলেন রাসেল ক্রোর সঙ্গে। অভিনয় নিয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন তিনি। কয়েক দিন পর ক্রোর কাছ থেকে আসে একটি উপহারের বাক্স। এর ভেতরে ছিল 'গ্ল্যাডিয়েটর' ছবির একটি স্বাক্ষরিত ছবি, যেখানে লেখা ছিল, 'এক হাজার মাইলের যাত্রা শুরু হয় এক পা ফেলার মাধ্যমে।' এই অনুপ্রেরণাই যেন ক্যাভিলের পথচলার ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে দুজন একসঙ্গে কাজও করেন 'ম্যান অব স্টিল'-এ; যেখানে ক্রো অভিনয় করেন তাঁর বাবার চরিত্রে।
সুপারম্যান হয়ে ওঠার গল্প
২০১৩ সালে 'ম্যান অব স্টিল' মুক্তির মাধ্যমে হেনরি ক্যাভিলের জীবনে আসে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। 'সুপারম্যান' চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে বিশ্বব্যাপী তারকাখ্যাতি এনে দেয়। পরবর্তী সময়ে 'ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান: ডন অব জাস্টিস'-এ এই চরিত্রে ফিরে আসেন তিনি। তাঁর সুপারম্যান ছিল আগের সংস্করণের চেয়ে বেশি মানবিক, দ্বন্দ্বপূর্ণ—যা দর্শকের সঙ্গে নতুন সংযোগ তৈরি করে। এই সময়েই তিনি নিজেকে কেবল একজন অভিনেতা নয়, বরং একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ক্যাভিল একবার নিজের ভাগনে থমাসকে নিয়ে একটি ঘটনা শেয়ার করেন। স্কুলে সে বলেছিল তাঁর মামা সুপারম্যান। শিক্ষক ও সহপাঠীরা বিশ্বাস করেনি, বরং তাকে নিয়ে মজা করে। পরে তার মা স্কুলে গিয়ে সত্যতা নিশ্চিত করেন। এরপর ক্যাভিল নিজেই ভাগনেকে স্কুলে নিয়ে যান। সবাই যে চমকে যায়, বলাই বাহুল্য।
পরিচালক জ্যাক স্নাইডার যখন তাঁকে সুপারম্যান চরিত্রে নির্বাচিত হওয়ার খবর দিতে ফোন করেন, তখন ক্যাভিল ব্যস্ত ছিলেন ওয়ার্ল্ড অব ওয়ারক্রাফট খেলতে। ফোন ধরতে দেরি হয়ে যায়। পরে তিনি নিজেই কল ব্যাক করেন। এভাবেই বদলে যায় তাঁর ক্যারিয়ার।
সুপারহিরোর বাইরে
যদিও সুপারম্যান তাঁকে জনপ্রিয় করে, ক্যাভিল নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ২০১৮ সালে 'মিশন: ইমপসিবল-ফলআউট'-এ তাঁর ভিলেন চরিত্র ব্যাপক প্রশংসা পায়। তাঁর বিখ্যাত 'মুঠো ফোলানোর' দৃশ্যটি আজও ইন্টারনেটে ভাইরাল। এরপর 'দ্য উইচার'–এ অভিনয় করে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। গেম ও বইভিত্তিক এই চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার জন্য তিনি কঠোর শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
'ম্যান অব স্টিল'-এ অভিনয়ের জন্য ক্যাভিল কঠোর অনুশীলন করেন। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার ক্যালরি খাবার খেতেন। ছয় মাস কঠোর পরিশ্রম করতেন। শুধু তা–ই নয়, তিনি কোনো পুরোনো সুপারম্যান সিনেমা দেখেননি; বরং কমিকস থেকেই নিজের চরিত্র তৈরি করেন। অনেক চরিত্র করলেও নিজের স্বপ্নের চরিত্র এখনো করতে পারেননি। ক্যাভিলের স্বপ্নের চরিত্র সম্রাট আলেকজান্ডার। অভিনয় না করলে তিনি হয়তো সেনাবাহিনীতে যোগ দিতেন—দেশপ্রেম থেকেই।
বিতর্ক: আলো-ছায়ার গল্প
হেনরি ক্যাভিলের ক্যারিয়ার যেমন উজ্জ্বল, তেমনি বিতর্কও তাঁকে ছাড়েনি। ব্যক্তিজীবন নিয়ে নানা সময় আলোচনায় এসেছেন তিনি। সম্পর্ক, মন্তব্য—বিশেষ করে 'মি টু' আন্দোলন নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য সমালোচিত হয়েছিল। এ ছাড়া 'দ্য উইচার' থেকে তাঁর হঠাৎ বিদায়ও ভক্তদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে। অনেকেই মনে করেন, সৃজনশীল মতবিরোধের কারণেই তিনি সিরিজটি ছেড়ে দেন। আরও বড় ধাক্কা আসে যখন তিনি ঘোষণা দেন যে তিনি আর সুপারম্যান হিসেবে ফিরছেন না—যদিও কিছুদিন আগেই তাঁর প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনা হলিউডের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
সম্পদের পরিমাণ
হেনরি ক্যাভিলের সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০০-৫০০ কোটি টাকা)। ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট, প্রযোজনা এবং অন্যান্য বিনিয়োগ থেকেও তাঁর আয় রয়েছে। হলিউডে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার পাশাপাশি তিনি আর্থিকভাবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।



