প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা ও রাজনীতিক কবীর সুমন সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে তার রাজনৈতিক ও শৈল্পিক জীবনের নানা স্মৃতি এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বাংলা গানে আধুনিকতার ছোঁয়া ও 'জীবনমুখী' ধারার প্রবর্তক হিসেবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার জন্মগত নাম সুমন চট্টোপাধ্যায়; ২০০০ সালে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে তিনি কবীর সুমন নাম ধারণ করেন।
সংগীত ও রাজনীতির পথচলা
১৯৯২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার একক অ্যালবাম 'তোমাকে চাই' বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে মাইলফলক। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে 'বসে আঁকো', 'ইচ্ছে হলো' এবং 'গানওয়ালা'। রবীন্দ্রসংগীতেও নিজস্ব গায়কী ও ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি সুনাম অর্জন করেন। সংগীতের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন; পশ্চিমবঙ্গের সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সংসদ সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি সংগীত সাধনা ও সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে মতপ্রকাশের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন।
ভোটের স্মৃতি
কবীর সুমন বলেন, কটক থেকে কলকাতায় আসার পর ভোট নিয়ে নানা ঘটনা ঘটেছে তার জীবনে। তবে সেসব স্মৃতিতে এখন মরচে ধরেছে। ভোটের স্মৃতি বলতে সবচেয়ে আগে মনে পড়ে সেই সময়ের কিছু স্লোগান— 'ভোট দেবেন কিসে, কাস্তে ধানের শিষে'— এটি ছিল সিপিআইয়ের স্লোগান। তিনি বলেন, স্লোগানগুলো খুব আকর্ষণ করত। পাড়ার বড়রা এ স্লোগান বলতে বলতে যেতেন, আর আমরা ছোটরা তাদের পিছু নিতাম। তখন এক মেশোমশাই বলেছিলেন— একদম ওদের এই স্লোগান তোরা দিবি না, ওরা ভগবানে বিশ্বাস করে না।
প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা
প্রথম ভোট কবে দিয়েছিলেন, বিধানসভা নাকি লোকসভা নির্বাচন— সেসব আজ আর মনে নেই। তবে মনে আছে, তিনি তখন বৈষ্ণবঘাটা লেনের বাড়িতে থাকতেন। প্রথম ভোট দিতে গিয়ে অপ্রীতিকর এক পরিস্থিতি দেখেছিলেন। প্রবল চেঁচামেচি, হই-হুল্লোড়। তার আঙুলে ভোটের কালি দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ভোটিং বুথ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। এত ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল যে তিনি সেখান থেকে 'ধ্যাত্তেরিকা' বলে চলে এসেছিলেন।
পরিবারে রাজনৈতিক আলোচনা
রাজনীতি নিয়ে তার বাড়িতে প্রায়ই নানা আলোচনা হতো। বাবা-মায়ের মধ্যে প্রবল বাগ্বিতণ্ডা হতো। একবার মা-বাবা ও দাদা ভোট দিতে গিয়েছিলেন। তিনি দাদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন— 'কোথায় যাচ্ছিস রে?' দাদা বলেছিল, 'হাত রুখতে'— অর্থাৎ কংগ্রেসকে রুখতে। কংগ্রেসের প্রতীক হাত, তাই দাদা সেদিন মজা করে এ কথা বলেছিল। নিশ্চয়ই সে সিপিএম সমর্থক ছিল। তবে তার বাবা প্রবল কংগ্রেস সমর্থক ছিলেন; জওহরলাল নেহরুকে পছন্দ করতেন। মা কট্টর সিপিআইএম সমর্থক ছিলেন, বাবা প্রবল বিরোধিতা করতেন। এই নিয়েই চলত বাগ্যুদ্ধ। মা-বাবা দুজনেই কর্মরত ছিলেন। বাবার বিরোধিতা করতে গিয়ে মা বলতেন— 'তুমি একটা কংগ্রেসি আমলা'। তবে কে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে কোনো ঝগড়া ছিল না। রাজনৈতিক মতবিরোধ, ঝগড়াঝাটি হতো ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে পারিবারিক ছোঁয়া ছিল।
ভোটে বিশ্বাসের পরিবর্তন
কবীর সুমন বলেন, তিনি কোনো পক্ষ নিতেন না ওদের বাগ্বিতণ্ডায়, শুধু হাসতেন। আসলে ভোট বিষয়টায় তার কোনো বিশ্বাসই ছিল না। মনে হতো, ভোট দিয়ে কোনো দিন কোনো ফয়সালা হবে না। তার মধ্যে একটা নকশাল ভাব ছিল— ভোট দিয়ে কিচ্ছু হবে না, বিপ্লব দরকার, অভ্যুত্থান দরকার, গণ-অভ্যুত্থানের ওপর ভরসা তৈরি হয়েছিল। পরে সেই ভাবনা বদলেছে। তিনি অস্বীকার করেন না— নিজে প্রথমে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার পরেই ভোট দেওয়াকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন। বলা ভালো— তখনই তার প্রথম ভোট দেওয়া। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছিলেন। তার আগে মনে হতো— ভোট বয়কট করা উচিত। ছাত্রজীবনে নকশালপন্থি মনোভাব ছিল, সেদিকে কিছুটা এগোনোর কথাও মাথায় আসে, তবে শেষ পর্যন্ত কোনো দলে যোগ দেননি, কোনো প্রচারেও অংশ নেননি।
বাবার ভোট দেওয়ার স্মৃতি
তবে আজ ভোটের স্মৃতি বলতে তেমন কিছুই মনে পড়ে না। একটা ঘটনা না বললেই নয়— তার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। তারা দুই কামরার এক ছোট বাসায় থাকতেন। একবার তিনি 'পোলিং অফিসার' হওয়ার সুযোগ পান। গাড়িতে করে অনেকগুলো ব্যালট বাক্স পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সেই ব্যালট বাক্স থেকে অদ্ভুত এক গদের আঠার গন্ধ বেরোচ্ছিল, সেই গন্ধ আজও নাকে ভাসে। তবে তা নিয়ে আলাদা কোনো উচ্ছ্বাস তাদের মধ্যে ছিল না। বাবা খুবই চুপচাপ থাকতেন, মুখে হাসি লেগে থাকত। একবার বাবা ভোট দিতে গেছেন। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বাবা দু-তিনটা ব্যালট পেপার নিয়ে তার ওপর নিমেষে স্ট্যাম্প মেরে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন রে রে করে উঠে বলেছিলেন— আরে দাদা, এ কী করলেন! আপনার ভোটটা তো নষ্ট হয়ে গেল। বাবা তখন হাসতে হাসতে বলেছিলেন— 'আমি ইচ্ছে করেই ভোটটা নষ্ট করলাম।' ঠিক কী কারণে তার বাবা এমন করেছিলেন তা আজও জানা নেই বলে জানান কবীর সুমন।



