অপমানের স্মৃতি থেকে জেদ, আজ ভক্তকে গিটার উপহার দিলেন তাসরিফ খান
২০১৬ সাল। ক্যারিয়ারের শুরুতে একের পর এক বাধার মুখোমুখি হচ্ছিলেন তরুণ গায়ক তাসরিফ খান। রবীন্দ্র সরোবরের একটি গানের আয়োজনে গিটার ঘিরে হু হু করে কান্না করতে হয়েছিল তাঁকে। আজ, ঠিক ১০ বছর পর, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন এই শিল্পী। তবে আজ আর কান্না নয়; বরং পছন্দের গিটারটি একজন ভক্তকে উপহার দিয়েছেন তিনি। এর পেছনে রয়েছে তাসরিফের জীবনের এক কষ্টকর স্মৃতি, যা তিনি ক্যারিয়ারজুড়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন।
কী ঘটেছিল ১০ বছর আগে?
তাসরিফ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ বছর আগে রবীন্দ্র সরোবরে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানে শীতার্ত মানুষদের সহায়তার জন্য গান হচ্ছিল। আমি ভয়ে ভয়ে গিয়ে বসি গায়কদের পাশে। তাঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান গাইতে থাকি। বিরতির সময় অনুমতি নিয়ে ‘সাত রাজার ধন...’ গানটি গাই। চোখ বন্ধ করে গান শেষ করে দেখি, অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছেন।’
পরের গান গাইতে যাওয়ার সময় তাঁর গিটারের তার ছিঁড়ে যায়। পাশের একজন গায়কের কাছে গিয়ে গিটার নেওয়ার অনুরোধ করলে, তিনি হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘এটা অনেক দামি গিটার। ধরার মতো যোগ্যতা এখনো তোমার হয়নি।’ এই অপমানজনক কথা শুনে তাসরিফের মন ভেঙে যায়। সেদিন আর গান গাননি তিনি; বরং ধানমন্ডি লেকে বসে অঝোরে কান্না করেছিলেন।
জেদ থেকে সাফল্যের পথ
এই ঘটনা তাসরিফের মধ্যে এক বিরাট জেদ তৈরি করে। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, একদিন না একদিন রবীন্দ্র সরোবরে পারফর্ম করবেনই। নিজের চেষ্টায় তিনি গড়ে তোলেন ‘কুঁড়েঘর’ নামে একটি গানের দল। তাঁর প্রথম গান ‘মধ্যবিত্ত...’ রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়, আড়াই লাখবার শেয়ার হয়। পরবর্তীতে ‘তুমি মানে আমি...’, ‘ময়না রে...’, ‘তাই তো আইলাম সাগরে...’, ‘ব্যাচেলর...’ গানগুলো তাঁকে আলোচনায় আনে।
ক্যারিয়ার এগিয়ে গেলেও মন থেকে সেই অপমানের কথা মুছে যায়নি। তাসরিফ বলেন, ‘ভালো করার জেদ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যদি রবীন্দ্র সরোবরে পারফর্ম করতেই পারি, তবে প্রথম দিনই আমার বাজানো গিটার সবার সামনে একজনকে উপহার দেব।’
প্রতিজ্ঞা রক্ষা ও গিটার উপহার
গত ১০ বছর পর, বৈশাখ উপলক্ষে এবার সেই সুযোগ হাতে আসে। তাসরিফ খান বলেন, ‘দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় গান করলেও এই ভেন্যু আমার জন্য খুবই বিশেষ। পারফর্ম করার সময় প্রথম গানে হাজার হাজার দর্শক গলা মেলাচ্ছিলেন, তখন আমার সেই স্মৃতি মনে পড়ে যায়। গান গাইতে গাইতে আমি থেমে যাই এবং নিজের ওয়াদা রক্ষা করি। এক ভক্তকে আমার গিটারটি উপহার দিয়েছি।’
তিনি মনে করেন, দেশের তরুণেরা নানা বাধার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল কাজে আসেন। এখানে কাউকে একটু সহযোগিতা করলে তাঁর যাত্রাটা সহজ হয়। কিন্তু অনেকেই একটু ওপরে উঠলেই অতীত ভুলে যান। তাসরিফ বলেন, ‘আমি স্টেজে দাঁড়িয়ে আমার গল্পটা বলেছি, যাতে আমার মতো হোঁচট খাওয়া মানুষরা বুঝতে পারেন, থেমে যাওয়া যাবে না; বরং পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে শক্ত করে তৈরি করতে হবে।’
এই ঘটনা শুধু একজন গায়কের ব্যক্তিগত গল্প নয়; বরং এটি প্রত্যেক সংগ্রামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করে। তাসরিফ খানের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, অপমান থেকে জেদ জন্মাতে পারে, আর সেই জেদই সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।



