বলিউড তারকার দেহরক্ষীদের আয়: কোটি টাকার বেতন নাকি মিথ? ইয়াসিন খানের মুখে সত্য
শাহরুখ খান থেকে সালমান খান—প্রায় প্রতিটি বড় বলিউড তারকার পাশেই দেখা যায় বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ভাইরাল হয় যে, এই দেহরক্ষীরা বছরে দুই থেকে তিন কোটি রুপি আয় করেন, বিশেষ করে শেরা কিংবা রবি সিং-এর নাম উল্লেখ করে। এই গল্পগুলো এমনভাবে ছড়ায় যেন দেহরক্ষী পেশা মানেই বিলাসবহুল জীবনযাপন। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এমন? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন ইয়াসিন খান, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শাহরুখ খানের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।
ইয়াসিন খানের বক্তব্য: সোশ্যাল মিডিয়ার মিথ্যা বার্তা
ইয়াসিন খান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'সোশ্যাল মিডিয়া অনেক সময় ভুল বার্তা দেয়। বাস্তবে কোনো দেহরক্ষী বছরে দুই থেকে আড়াই কোটি রুপি আয় করে না।' তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দেহরক্ষীদের আয়ের কাঠামো বেশ সরল। এটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত:
- একটি নির্দিষ্ট মাসিক বেতন, যা নিয়মিত প্রদান করা হয়।
- সিনেমা শুটিং বা বিজ্ঞাপন চুক্তির জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক, যা চুক্তিভিত্তিক হয়ে থাকে।
- বিশেষ ইভেন্ট বা অনুষ্ঠানে অস্থায়ী আয়, যা মৌসুমি প্রকৃতির।
মোট আয় বাড়তে পারে, কিন্তু এটি নিয়মিত কোটি টাকার পর্যায়ে পৌঁছায় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অতীতের কঠিন অবস্থা ও পরিবর্তনের গল্প
ইয়াসিন খান জানান, আজকের তুলনায় অতীতে দেহরক্ষীদের অবস্থা ছিল আরও কঠিন। একসময় চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করলেও তাঁদের জন্য আলাদা কোনো পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা ছিল না। 'প্রযোজকেরা শুধু ড্রাইভার, মেকআপ আর্টিস্ট বা স্পটবয়দের টাকা দিতেন। আমরা কাজ করতাম, কিন্তু আলাদা করে কিছু পেতাম না,' বলেন তিনি। এই অবস্থার পরিবর্তন আসে তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে।
ইয়াসিন খান প্রযোজকদের কাছে দাবি তোলেন যে, যেহেতু দেহরক্ষীরাও শুটিং প্রক্রিয়ার একটি অংশ, তাই তাঁদেরও পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত। এই দাবি জানানোর আগে তিনি গৌরী খানের অনুমতি নেন, এবং পরিবারের সমর্থন পাওয়ার পর বিষয়টি সামনে আনেন। ধীরে ধীরে প্রযোজকেরা সম্মত হন, এবং আজ বলিউডে দেহরক্ষীদের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক একটি প্রতিষ্ঠিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
দেহরক্ষীদের বর্তমান আয় কাঠামো
নিরাপত্তা পরামর্শক ইউসুফ ইব্রাহিমের মতে, দেহরক্ষীদের মাসিক আয় সাধারণত ২৫ হাজার রুপি থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ রুপি পর্যন্ত হতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি হতে পারে। তিনি স্পষ্ট বলেন, 'প্রতিদিন লাখ টাকা আয়—এটা সম্ভব নয়। এত প্রতিযোগিতার মধ্যে কেউ এত টাকা দেবে না।' তবে সব ক্ষেত্র এক রকম নয়। উদাহরণস্বরূপ, শেরা শুধু একজন দেহরক্ষী নন; তিনি নিজেই একটি নিরাপত্তা সংস্থা পরিচালনা করেন। ফলে তাঁর আয় আসে বিভিন্ন উৎস থেকে, যেমন:
- ব্যক্তিগত ব্যবসা ও বিনিয়োগ থেকে আয়।
- ভিআইপি সিকিউরিটি সার্ভিস প্রদান করে অর্থ উপার্জন।
- ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও পরিকল্পনা থেকে লাভ।
এই কারণে শেরার মতো ব্যক্তিদের আয় তুলনামূলক বেশি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এটি সাধারণ দেহরক্ষীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
দেহরক্ষীদের দায়িত্ব ও জীবনযাপন
দেহরক্ষীর কাজ শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; এটি একটি গভীর দায়িত্ববহুল পেশা। তাঁদের প্রধান কর্তব্য অন্তর্ভুক্ত করে:
- ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা।
- ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকা ও তারকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- তারকার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং গোপন তথ্য লুকিয়ে রাখা।
এই পেশায় ব্যক্তিগত জীবন প্রায় থাকে না বললেই চলে। উৎসব, ছুটি—সবকিছুই নির্ভর করে তারকার সময়সূচির ওপর, যা দেহরক্ষীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বলিউড দেহরক্ষীদের আয় নিয়ে ভাইরাল গল্পগুলি প্রায়ই অতিরঞ্জিত। ইয়াসিন খানের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, এই পেশায় আয় সীমিত এবং কঠোর পরিশ্রমের ভিত্তিতে গঠিত। তাই, দেহরক্ষী হওয়া মানেই কোটি টাকার বিলাসবহুল জীবন—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।



