সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা, সংসদে সরকারি সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতি প্রস্তাব এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নজরদারি করার লক্ষ্যে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ গঠন করেছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মাসেই এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। এই ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয়ে নজর রাখছে তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত প্রকাশ্যে এই ছায়া মন্ত্রিসভা ঘোষণা না করেই নিজস্ব গতিতে কাজ করবেন তারা।
জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য
জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বলছেন, ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে সরকারের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করা হবে। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয়গুলোতে নজরদারি করা হবে এবং কোন মন্ত্রণালয়ে কী অনিয়ম বা দুর্নীতি হচ্ছে তা তুলে ধরা হবে।
ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে যা বলছে জামায়াত
ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা ১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছি, সেটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করে কাজ করছে। এটা আসলে পাবলিকলি ঘোষণার জন্য নয়, বরং কাজের জন্য গঠন করা হয়েছে। আপাতত আমরা এটা পাবলিক করছি না তবে প্রয়োজন হলে করবো।’
ছায়া মন্ত্রিসভার মতো ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাবনার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেমন বাজেট দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, কোন কোন খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার; আমরা এসব বিষয়ে বাজেট ঘোষণার আগেই আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে একটা প্রস্তাবনা দেব। এছাড়া সরকার বাজেট পেশ করলে, সেটা নিয়েও কথা বলবো। আর সংসদের ভেতরে তো আমাদের দায়িত্বশীলরা সব বিষয়ে কথা বলবেন।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাহী কমিটিতে যারা আছেন তাদের সিদ্ধান্তে গত মাসে এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। এটা এখন প্রকাশ করা হবে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ে এটা প্রকাশ করা হবে।’
এই মন্ত্রিসভায় কে বা কারা আছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। সংগঠনের অনেক সিনিয়র নেতারা যারা এমপি নন তারাও এই ছায়া মন্ত্রিসভায় আছেন। মূলত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এই মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।’
ছায়া মন্ত্রিসভার কাজের বিষয়ে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাজেট নিয়ে কাজ করছে। কোন ক্ষেত্রে কেমন বরাদ্দ করলে দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে, সে বিষয়ে সরকার বাজেট ঘোষণার আগেই আমাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হবে।’
ছায়া মন্ত্রিসভা কী এবং কারা আছেন
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে, যেখানে এটি ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত। এ রীতিতে সংসদের বিরোধী দল একটি বিকল্প কাঠামো গঠন করে, যার কাজ সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। লক্ষ্য, সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। যুক্তরাজ্য ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে এ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
সরকারের মন্ত্রিসভায় যেমন বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকেন, তেমনি ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কয়েকজন মিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
জামায়াত সূত্রে জানা যায়, জামায়াতের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা এই ছায়া মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, পলিসি সামিট ও বিজনেস সামিটে সক্রিয় থাকা পলিসি বিশেষজ্ঞরা এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাবেক আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত রয়েছেন।
ছায়া মন্ত্রিসভা কি ‘উজিরে খামোখা’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য নিয়ে আলোচনার সময় বিরোধীদলের ছায়া মন্ত্রিসভাকে ‘উজিরে খামোখা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘আমি জেনে খুশি হয়েছি আপনারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। ছায়া মন্ত্রিসভা করলে দুইটা লাভ। একটা হলো যে দায়িত্ববোধ বাড়ে, আরেকটা হলো যে উজিরে খামোখা বা মন্ত্রী মন্ত্রী ভাবের একটা সুখ পাওয়া যায়। আমি অভিনন্দন জানাই তাদের।’
তবে জামায়াতের এই ছায়া মন্ত্রিসভাকে সরকারের পক্ষ থেকে সাধুবাদ জানানোর কথা জানিয়েছেন হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভা গণতন্ত্রের জন্য ভালো। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ছায়া মন্ত্রিসভা আছে। এর মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়। আমরা এটাকে সাধুবাদ জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে ওনারা সরকারকে নেতিবাচকভাবে না পেশ করে বলতে পারে যে এটা ভালো হবে, ওটা ভালো হবে না। এমনকি প্রশংসাও করতে পারেন, সরকার যেটা ভাল করেছে। আমি একজন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী। গণতন্ত্রের জন্য যেটা ভাল আমি সবসময় তার পক্ষে। আমি সরকারের পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাধুবাদ জানাই।’
জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভার সঙ্গে জোটের সম্পৃক্ততা নেই
ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে প্রথমে জোটগত একটি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন বিষয় চিন্তাভাবনা করে জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। দলটির একজন শীর্ষ নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন দলগত সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে জোটসঙ্গীদের সঙ্গে মৌখিকভাবে পৃথকভাবে কথা হলেও জোটগত আলোচনা হয়নি।
জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অবস্থান কী এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা জামায়াত বলেছিল। এর সঙ্গে দলগতভাবে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ছায়া মন্ত্রিসভার কী খবর বা কোন অবস্থানে আছে সেটা তারাই বলতে পারবে, আমরা আমাদের কাজ করছি।’
ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছায়া মন্ত্রিসভা নীতিগতভাবে এবি পার্টির আইডিয়া। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম এবি পার্টি জনগণকে ধারণা দিয়েছে। তবে জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে আমরা জানি না। এটা তারা দলগতভাবে করতে পারে। ইতিমধ্যে এনসিপিও এমন ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছে বলে শুনেছি।’



