সাহিত্যের পাঠকদের কাছে সালমান রুশদিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর সাহিত্য, তাঁর জীবন, তাঁকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, তাঁর অর্জন, তাঁর ওপর জারি হওয়া ফতোয়া—এসব নিয়ে পৃথিবীর নানা ভাষায় অগণিত লেখা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে জীবিত লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত—নন্দিত এবং নিন্দিত—লেখক তিনি। তাই তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস আমি করব না। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমার ব্যক্তিগত পাঠ ও উপলব্ধির জায়গাটা তুলে ধরার চেষ্টা করব এই গদ্যে।
আমি কোনো উপন্যাস হাতে নিলে সমালোচকের চোখ নিয়ে বসি না। পড়ার সময় খুঁজতে থাকি না সেটি জাদুবাস্তবতা কিনা, উত্তরাধুনিকতা কিনা, কিংবা কোন সাহিত্যিক ঘরানার অন্তর্ভুক্ত। আমি পাঠক হিসেবে বসি। আমার ভেতরে তখন শিশুতোষ আগ্রহ কাজ করে—আমি বিস্মিত হতে চাই। আমি এমন কিছু দেখতে চাই যা আগে দেখিনি। এমন কোনো জীবন স্পর্শ করতে চাই যা আমার নিজের জীবনের বাইরে। এমন কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চাই যা আমার কল্পনার সীমাকে প্রসারিত করে।
এই প্রত্যাশা নিয়েই আমি মিডনাইটস চিলড্রেন খুলেছিলাম। উপন্যাসের শুরুতেই রুশদি আমাকে বিস্মিত করেছিলেন। আদম আজিজ যখন নসীমকে দেখতে শুরু করেন, তখন তিনি তাকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেন না। একটি চাদরের মাঝখানে ছোট্ট একটি ছিদ্র। সেই ছিদ্র দিয়ে কখনো একটি হাত, কখনো একটি কবজি, কখনো একটি মুখের অংশ, কখনো শরীরের অন্য কোনো অংশ দেখা যায়। একজন মানুষকে খণ্ড খণ্ড ভাবে দেখেই ধীরে ধীরে তার প্রেমে পড়ে যান তিনি। পড়তে পড়তে আমার সেই উপকথার কথা মনে হয়েছিল যেখানে কয়েকজন অন্ধ মানুষ হাতি ছুঁয়ে তার বর্ণনা দিতে যায়। কেউ বলে হাতি দেয়ালের মতো, কেউ বলে দড়ির মতো, কেউ বলে গাছের কাণ্ডের মতো। কারণ প্রত্যেকে সম্পূর্ণ প্রাণীটিকে নয়, তার কেবল একটি অংশ স্পর্শ করেছে। কিন্তু রুশদির উপন্যাসে বিস্ময়টি অন্য জায়গায়। এখানে অসম্পূর্ণ দেখাও প্রেমকে থামাতে পারে না। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কেবল টুকরো টুকরো উপস্থিতি দেখেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। পাঠক হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে নতুন ছিল।
তবে মিডনাইটস চিলড্রেন আমাকে যে বিস্মিত করেছে, তার কারণ শুধু রুশদির কল্পনাশক্তি নয়। অনেক পাশ্চাত্য পাঠকের মতো আমি এই উপন্যাসের ভূগোল আমার জন্য অচেনা ছিল না। উপন্যাসের ভেতরে যে ইতিহাস, যে সমাজ, যে রাজনৈতিক টানাপড়েন, যে সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বারবার ফিরে আসে, তার অনেক কিছুই আমার পরিচিত, কিছুটা যাপিতও। আমি এই উপমহাদেশেই জন্মেছি, এখানেই বড় হয়েছি। দেশভাগের ক্ষত, জাতীয় পরিচয়ের সংকট, রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের গল্প আমার কাছে অচেনা নয়। ঘটনাগুলো আমি চিনতাম, কিন্তু যেদৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা হচ্ছে সেটি অচেনা। ইতিহাসের ঘটনা এবং তার পরিণতি আমার অজানা ছিল না। কিন্তু রুশদি সেগুলোকে কীভাবে দেখছেন, কীভাবে সাহিত্যিক রূপ দিচ্ছেন, সেটিই ছিল আমার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমার কাছে কোনো ইতিহাস বইয়ের অধ্যায় নয়। এটি এমন এক বাস্তবতা যার প্রতিধ্বনি আমি আমার নিজের জীবন ও সমাজের ভেতরেও অনুভব করেছি। তাই বিশেষ আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম, উপমহাদেশের অন্য প্রান্তে বেড়ে ওঠা একজন ঔপন্যাসিক সেই একই ইতিহাসকে কীভাবে পুনর্নির্মাণ করেন।
সবসময় যে আমি তার সঙ্গে একমত হয়েছি, তা নয়। পাঠক হিসেবে, এমনকি ঔপন্যাসিক হিসেবেও, আমি প্রায়ই বৃহৎ রাজনৈতিক ঘটনাবলির চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিই। রাষ্ট্রের চেয়ে মানুষ, স্লোগানের চেয়ে অনুভূতি, ইতিহাসের চেয়ে মানবিক অভিজ্ঞতা আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু এখানেই রুশদির শক্তি। তিনি ইতিহাসকে কেবল ইতিহাস হিসেবে রাখেননি। তিনি জীবনের অংশ করে তুলেছেন। পরিবার, স্মৃতি, প্রেম, ভয়, ক্ষতি এবং ব্যক্তির নিয়তির মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর এই শক্তিটিই আমাকে উপন্যাসটির আরও গভীরে টেনে নিয়ে গিয়েছে।
পড়তে পড়তে আমার কাছে স্পষ্ট হতে থাকে, মিডনাইটস চিলড্রেন শুধু সেলিম সিনাইয়ের গল্প নয়। শুধু একটি পরিবারের গল্পও নয়। রুশদি আসলে আরও কঠিন একটি কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন—একজন মানুষের জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি একটি জাতির জন্মকথা বলছেন।
উপন্যাসের শুরু থেকেই সেলিমের জীবন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগোতে থাকে। অনেক সময় মনে হয় দুটি আলাদা স্রোত নয়, বরং একই নদীর দুই ধারা। জাতীয় ইতিহাস ঢুকে পড়ে পারিবারিক ইতিহাসের ভেতরে। পারিবারিক ইতিহাস আবার জাতীয় ঘটনাগুলোকেও নতুন আলোয় দেখতে শেখায়।
সাহিত্যে এই প্রচেষ্টা একেবারে নতুন নয়। বহু ঔপন্যাসিক ব্যক্তিগত ভাগ্য এবং সমষ্টিগত ভাগ্যের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করেছেন। কিন্তু রুশদির উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিধি সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি শুধু একটি শৈশব, একটি পরিবার বা একটি প্রজন্মের কাহিনি বলতে চাননি। তিনি যুদ্ধ, দেশভাগ, রাজনৈতিক আন্দোলন, ধর্মীয় সংঘাত, সামাজিক পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তর—সবকিছুকে একসঙ্গে ধারণ করতে চেয়েছেন।
পাঠক হিসেবে স্বীকার করতেই হয়, এই বিস্তার অনেক সময় আমাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কিছু কিছু জায়গায় উপন্যাস প্রায় ইতিহাসের বৃত্তান্তের কাছাকাছি চলে গেছে। কখনও কখনও রুশদিকে একজন ইতিহাসবিদের মতোও মনে হয়েছে। রাজনৈতিক ঘটনা, জাতীয় সংঘাত এবং সামাজিক পরিবর্তনের বিবরণ তিনি এমন বিশদে তুলে ধরেছেন, যা খুব কম ঔপন্যাসিকই সাহস করে করেন।
সত্যি বলতে কী, পাঠক হিসেবে কিংবা ঔপন্যাসিক হিসেবে, এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় পথ নয়। আমি সাধারণত মানুষকে অনুসরণ করে ইতিহাসে পৌঁছাতে পছন্দ করি। বড় ঘটনার ব্যাখ্যার চেয়ে মানুষের জীবন আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু এখানেই রুশদির দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ইতিহাসের দিকে যতই এগিয়ে যান না কেন, শেষ পর্যন্ত তিনি আবার ফিরে আসেন উপন্যাসে। ফিরে আসেন সেলিমের কাছে, তার পরিবারের কাছে, তার স্মৃতির কাছে, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কাছে। সম্ভবত এখানেই মিডনাইটস চিলড্রেন-এর অন্যতম বড় শক্তি—ইতিহাস ও কল্পকাহিনির মধ্যে অবিরাম যাতায়াত করেও কোনোটিই পুরোপুরি হারিয়ে না ফেলা।
এ পর্যায়ে একটি বিষয় স্মরণ করতে হচ্ছে, মিডনাইটস চিলড্রেন নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই যেটি বলা হয়, এর উপর লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের প্রভাব আছে। রুশদি কখনোই লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের প্রভাব অস্বীকার করেননি। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কথাও বলেছেন বহুবার। এই উপন্যাসের ওপর মার্কেসের প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রভাব এবং অনুকরণ এক বিষয় নয়। আমরা যখন বড় লেখকদের পড়ি, তখন তাদের কিছু অংশ আমাদের ভেতরে থেকে যায়। কখনও একটি দৃশ্য, কখনও দৃষ্টিভঙ্গি, কখনও একটি বাক্যের ছন্দ, কখনও পৃথিবীকে দেখার ভিন্ন একটি উপায়। অনেক সময় আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না সেই প্রভাব কখন আমাদের কল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে। মিডনাইটস চিলড্রেন পড়তে পড়তে এমন কিছু মুহূর্ত আছে যা আমাকে মার্কেসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই স্মরণ অনুকরণ থেকে আসেনি, এসেছে রুশদির নতুন কিছু সৃষ্টি করার প্রেরণা হিসেবে।
আদম আজিজ এবং নসীমের প্রেমের কথাই ধরা যাক। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে সম্পূর্ণ না দেখে, খণ্ড খণ্ড উপস্থিতির মধ্য দিয়ে তার প্রেমে পড়ছে। এই দৃশ্য পড়তে পড়তে আমার গার্সিয়া মার্কেসের কিছু প্রেমকাহিনির কথা মনে পড়েছিল, যেখানে কল্পনা চোখের দেখা অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করে দেয়। আমি বলছি না রুশদি সচেতনভাবে কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্য ধার নিয়েছেন। সাহিত্যিক প্রভাব এত সরলভাবে কাজ করে না—বহু বছর ধরে লেখকের ভেতরে বাস করে এবং পরে নতুন রূপে ফিরে আসে। মূল পার্থক্যটা এখানেই। গার্সিয়া মার্কেস রুলফোকে পড়েছিলেন, কিন্তু নিজের জন্য লিখেছিলেন একশো বছরের নিঃসঙ্গতা। রুশদি গার্সিয়া মার্কেসকে পড়েছিলেন, কিন্তু লিখেছেন মিডনাইটস চিলড্রেন। মহৎ প্রভাব এভাবেই নতুন কিছু সৃষ্টি করে।
সম্ভবত সেই কারণেই আমি উত্তরাধিকার শব্দটির চেয়ে সংলাপ শব্দটিকে বেশি পছন্দ করি। নির্ভরতার চেয়ে কথোপকথনকে বেশি অর্থবহ মনে হয়। বড় লেখকেরা তাঁদের প্রিয় লেখকদের পুনরাবৃত্তি করেন না; তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ এক সাহিত্যিক আলাপ চালিয়ে যান। আলোচনার সূত্র ধরে আরো একটি প্রসঙ্গে যেতে চাই, মিডনাইটস চিলড্রেন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায় সকলে উচ্চারণ করেন জাদুবাস্তবতার কথা।
অসংখ্য খ্যাতিমান সমালোচক ও পাঠক রুশদির এই উপন্যাসকে জাদুবাস্তব সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনা করেছেন। এর কারণটা অনুমেয়। উপন্যাসটিতে রয়েছে অসাধারণ সব ঘটনা, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু, এবং এমন সব পরিস্থিতি যা আমাদের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। জাদুবাস্তবতার সবচেয়ে প্রচলিত সংজ্ঞা যদি গ্রহণ করি, তাহলে এই শ্রেণিবিন্যাসকে অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না। কারণ সাধারণভাবে জাদুবাস্তবতা বলতে বোঝানো হয় এমন এক বর্ণনাভঙ্গি, যেখানে অসাধারণ ও দৈনন্দিন বাস্তবতা একই সঙ্গে সহাবস্থান করে, এবং আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনাগুলোকেও চরিত্ররা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে। কিন্তু আমার পাঠটা এখানেই শেষ হয় না, বরং এই জায়গা থেকে শুরু হয়।
গত কয়েক বছর ধরে আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে শুধু অসাধারণ ঘটনার উপস্থিতি কোনো রচনাকে জাদুবাস্তবতা বলার জন্য যথেষ্ট নয়। আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—এই অসাধারণ উপাদানটির উৎস কোথায়? এটি কি কোনো সমষ্টিগত বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছে? এটি কি কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীরভাবে প্রথিত বিশ্বদৃষ্টি, লোকবিশ্বাস বা সাংস্কৃতিক চেতনার অংশ? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিশ্বাস কি ওই কাহিনির মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে আছে?
এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সব অসম্ভব ঘটনা সাহিত্যে একই কাজ করে না। যখন আমি মিডনাইটস চিলড্রেন-এর ক্ষেত্রে এই মানদণ্ডগুলো প্রয়োগ করি, তখন একটি ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। সেলিম সিনাই এবং মধ্যরাতে জন্ম নেওয়া অন্য শিশুদের অলৌকিক ক্ষমতা কোনো জীবন্ত লোক-ঐতিহ্য বা উপমহাদেশের কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বহুল প্রচলিত বিশ্বাস থেকে সরাসরি উৎসারিত বলে মনে হয় না। ফলে এগুলো চরিত্রদের সমষ্টিগত দৈনন্দিন বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশ বলে প্রতীয়মান হয় না। এগুলোর উৎস প্রধানত ভারতের স্বাধীনতা, একটি নতুন জাতির জন্ম এবং রুশদির অসাধারণ কল্পনাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই কারণে উপন্যাসটিতে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার প্রভাব আমি স্বীকার করি, কিন্তু বিনা দ্বিধায় একে সেই ধারারসাহিত্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই না। এর অর্থ এই নয় যে আমি উপন্যাসটির গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছি বা কয়েক দশকের সাহিত্যসমালোচনাকে সংশোধন করতে চাইছি। সালমান রুশদির কৃতিত্বকে খাটো করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং ঠিক উলটো কারণে। মিডনাইটস চিলড্রেন আমার কাছে এমন এক উপন্যাস, যার ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও মানবিক ব্যাপ্তি এত বিশাল যে তাকে শুধু একটি সাহিত্যিক লেভেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তার প্রকৃত শক্তির পুরোটা ধরা পড়ে না।
শেষ পর্যায়ে এসে আমার মনে হয়, মিডনাইটস চিলড্রেন কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্যিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত কি না, সেটিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। শেষ পর্যন্ত যা থেকে যায়, তা কোনো সমালোচনামূলক লেভেল নয়; থেকে যায় বিস্ময়। থেকে যায় একটি পরিবারের গল্প, একটি জাতির ইতিহাস। থেকে যায় সেলিম সিনাইয়ের কণ্ঠস্বর। থেকে যায় সালমান রুশদির উচ্ছ্বসিত ও সীমাহীন কল্পনাশক্তি।
প্রভাব অবশ্যই আছে। রুশদি কখনো তা অস্বীকার করেননি। তাঁর আগে বহু মহৎ লেখকও নিজেদের ওপর অন্য লেখকের প্রভাবের কথা গোপন করেননি। কিন্তু মহৎ উপন্যাস শেষ পর্যন্ত সব সময় তাদের পুষ্টি জোগানো প্রভাবগুলোর চেয়েও বড় হয়ে ওঠে, আর তাদের ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যবহৃত সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগগুলোর চেয়েও বিস্তৃত হতে চায়। সে কারণেই মিডনাইটস চিলড্রেন পড়ার পর এটাকে লিটারারি জনরা দিয়ে লেভেলিং করার প্রবণতাকে দ্বিতীয় সারিতে নামিয়ে রাখতে চাই। এই ব্যাপ্তির, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার এবং এই শক্তির একটি উপন্যাসকে শুধু মাত্র একটি লেন্স দিয়ে দেখা যায় না। এটা আরো বেশি কিছু দাবি করে।
রুশদি প্রসঙ্গে আমার শেষ কথা হলো—কোনো চাকু, যত ধারালোই হোক না কেন, কখনো সেই কল্পনাশক্তির হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারবে না, যেখান থেকে মিডনাইটস চিলড্রেন-এর মতো একটি মহৎ উপন্যাসের জন্ম হয়েছে।



