১৯৬০-৬১ সালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় একদিন সকালে অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিন ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আনোয়ারুল হক ক্লাসে এলেন। সঙ্গে ছিলেন সুবেশী, প্রায় তরুণ দেখতে একজন। আবেদিন স্যার পরিচয় করে দিলেন—‘ইনি মুস্তাফা মনোয়ার। কলকাতা সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাস কইরা আসছেন। আইজ থাইকা তোমাগো ক্লাস নিবেন।’
শিক্ষক হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারের আগমন
দ্বিতীয় বর্ষে ক্লাসটিচার নিয়ে তখন সংকট চলছিল শিল্পী রশীদ চৌধুরীর স্পেনে উচ্চশিক্ষার্থে যাওয়ার কারণে। নির্ধারিত কোনো শিক্ষক না থাকায় কখনো অধ্যক্ষ নিজে ক্লাস নিতেন, কখনো শিল্পী কামরুল হাসান ও সফিউদ্দীন আহমেদ। এতে আমাদের লাভই হচ্ছিল—বিভিন্ন স্যারের ভিন্ন পদ্ধতিতে শেখানোর অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছিল। এই নিয়মে আমরা খুশিই থাকতাম।
হঠাৎ নতুন শিক্ষক দেওয়ায় আমরা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম—কেমন হবেন তিনি, কীভাবে ক্লাস নেবেন? কিন্তু অচিরেই তা দূর হয়েছিল তাঁর কথায়। তিনি বলেছিলেন, ‘ছবি আঁকার অনেক নিয়মকানুন, ব্যাকরণ রয়েছে। ইচ্ছে করলে সে সবকে রেখেও কখনো নিজের মেধাকে কাজে লাগাতে পারো। জড়তাকে কাটিয়ে ফ্রি হ্যান্ডে নিজের মতো করে আঁকতে পারো।’
তাঁর কথা কিছুটা বুঝেছিলাম, কিছুটা বোধে ঢোকেনি যতক্ষণ না তাঁকে সেভাবে আঁকতে দেখেছিলাম। বিশেষ করে জলরঙের ব্যাপারটি যখন দ্রুততার সঙ্গে আঁকার পদ্ধতি তিনি দেখিয়েছিলেন। প্রথম প্রথম তালগোল পাকিয়ে ফেললেও পরে অনেকটাই রপ্ত হয়েছিল। ড্রইংয়ের আঁকাআঁকিতেও দ্রুততার অনুশীলন করিয়েছিলেন।
শিল্প শিক্ষায় নতুনত্ব
থার্ড ইয়ারে ওঠার পর পেইন্টিংয়ে কয়েকটি ক্লাস পেয়েছিলাম। সেদিকেও ভিন্নতা ছিল। অন্ধকার দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে মিডল টোন ধরে আলোতে আসার একাডেমিক নিয়ম পাল্টে দেওয়ার বুদ্ধি শিখিয়েছিলেন। প্রথমে মিডল টোনে রং চাপিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ডার্কে ও আলোতে যাওয়ার নিয়ম বাতলে দিতেই আমাদের আঁকার ধরন পাল্টে গিয়েছিল।
আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পর কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে শুরু হয়। কলেজের কড়াকড়ি ভাব শিথিল হয়ে উঠছিল, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক দিকে। তিনি সংগীতে পারদর্শী ছিলেন—প্রায়ই কলেজে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। কলকাতায় হিজ মাস্টার্স ভয়েস থেকে ৭৮ আরপিএম-এ তাঁর রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, তা বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন।
কলেজের অনুষ্ঠানে আবেদিন স্যারের অনুরোধে পল্লিগীতি গাইতেন—‘না জানি কী করল রে’, ‘সোনায় বান্দাইল নাও’, ‘আগা নাওয়ে ডুবো ডুবো’, ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ ইত্যাদি। শোনাতেন কে এল সায়গল, পঙ্কজ মল্লিক ও সি এইচ আত্মার গান। সায়গলের ‘একটুকু ছোঁওয়া লাগে’ ও আত্মার ‘প্রিতম আন মিলো’ তাঁর অতি প্রিয় ছিল।
যা কিছু করতেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে বসতেন। তাতে কলেজের আবহে পরিবর্তন আসে। ছাত্রছাত্রী-শিক্ষকদের দূরত্ব কমে যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কারণে বাইরের সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ততা বাড়ে।
রবীন্দ্রচর্চা ও নাটক
তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। নিয়মিত রবীন্দ্র কবিতা, সাহিত্য পড়তেন, রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন ও গাইতেন। অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রচর্চা বাতিলের চেষ্টা চলাকালীন তিনি ‘তাসের দেশ’, ‘শ্যামা’ ইত্যাদি মঞ্চস্থ করেছিলেন। তাতে অভিনয় করেছিলেন তরুণেরা, যাঁরা পরে দেশের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী হয়েছেন। আর্ট কলেজেও ‘ডাকঘর’ পরিচালনা করেছিলেন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। সেসব গুণে মুগ্ধ হয়েছিল দেশের সাংস্কৃতিক জগত। পত্রপত্রিকায় নাটকটির মঞ্চায়নের প্রশংসা হয়েছিল।
টেলিভিশনে যাত্রা
১৯৬৪ সালে কলেজ ছেড়ে ঢাকায় শুরু হওয়া প্রথম পাইলট টিভি—‘পিটিভি’তে চাকরি নিয়ে চলে যান। তাঁর নিজ উন্মেষের উপযোগী মাধ্যমটিই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বলে মনে হয়। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুনাম দেখে তাঁকে পিটিভির উপদেষ্টা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কলিম শরাফী, পটুয়া কামরুল হাসান প্রমুখ চাকরিটির জন্য মনোনীত ও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। টিভির মতো সৃজনশীল মাধ্যম তাঁকে ভিন্নতর জগতে প্রতিষ্ঠা দেয়। তিনি টিভি ও দেশকে বিনোদনের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা এনেছিলেন।
টিভির কর্মকাণ্ড ও পাপেট নিয়ে ব্যস্ততায় মূল ক্ষেত্র চিত্রকলাচর্চা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাঁর আক্ষেপ ছিল—প্রায়ই বলতেন, ‘পুরোদমে ছবি আঁকায় বসব। একটি প্রদর্শনী করার সময় এসে গেছে।’ আর্ট কলেজ ছেড়ে দিলেও কলেজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতেন। কারণ তিনি মূলত চিত্রকলার শিল্পী ছিলেন। নিজেই বলতেন যে তাঁর শিল্পকলা শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত বোধকে তিনি খুঁটি জ্ঞান করেন। ভারতের সুখ্যাত শিল্পী গণেশ পাইন ও সুনীল দাশ তাঁর সহপাঠী ছিলেন।
রাজনৈতিক সচেতনতা
রাজনীতি নিয়ে তেমন কথা বলতেন না, কিন্তু কর্মে রাজনীতি সম্পর্কিত সজ্ঞান উপস্থিতি থাকত। ষাটের দশকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানে রাজনীতি প্রধান হয়ে থাকত। তিনি সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েও সেসবে যুক্ত থাকতেন এবং শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদী চিত্রকলা অঙ্কনের আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। বিশাল ক্যানভাসে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সবার সঙ্গে মিশে ছবি আঁকতেন।
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ষাটের দশকের প্রথম ধাপে তিনি ‘মন্টু’ নামে কার্টুন আঁকতেন, যা ছাপা হতো পাক্ষিক ‘সচিত্র সন্ধানী’তে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ দেশের ভয়ানক পরিস্থিতিতে তাঁর নেতৃত্বে পিটিভি থেকে পাকিস্তানি জাতীয় সংগীত ও পতাকা ব্যবহার বন্ধ করা হয়। ফলে তাঁকে গা ঢাকা দিতে হয় এবং ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হলে তিনি দেশ ছাড়েন।
পাপেট শিল্পে অবদান
কলকাতায় অবস্থানকালে শরণার্থীশিবিরে শিশুদের বিমর্ষ অবস্থা দেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য পাপেট বানাবেন। সেসব পাপেটের গল্পে দেশাত্মবোধকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, সঙ্গে হাস্যরস মিশ্রিত করেছিলেন। এই পাপেট শো খুব জনপ্রিয় হয়। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি পাপেট নিয়ে কাটিয়েছেন। একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর পাপেট আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। পাপেটগুলো ছিল প্রতীকী—দেশ, মানুষ, জীবজন্তু, পাখি, প্রকৃতি ও সময়কে নিয়ে অর্থবহ। তাঁর বিখ্যাত চরিত্র ‘গিট্ঠু’।
বাল্যকাল থেকে পুতুলনাচের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কলকাতা আর্ট কলেজে ছাত্র থাকাকালে পাপেট তৈরির কাজে হাত দিয়েছিলেন। টিভিতে কাজ করতে গিয়ে মাধ্যমটিতে পাপেটকে আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন। টিভিতে শিশুদের জন্য ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের প্রবর্তক ছিলেন। শিশু একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। নানামুখী গুণের কারণে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও স্মৃতি
ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজের সুবাদে যেতেন, কখনো আমাদের সঙ্গে যেচে রওনা দিতেন। তাঁর সান্নিধ্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। কলকাতায় পড়ার সময়ের অভিজ্ঞতা, ঢাকায় ছেলেবেলা, নারায়ণগঞ্জের কথা বলতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় স্কুলছাত্র হয়েও জেলে গিয়েছিলেন—সেসব মজা করে বলতেন।
মনে আছে, কয়েক বছর আগে একবার একসঙ্গে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমার দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বিমানে উঠে একসময় বলেছিলেন, ‘বুঝলে, আজকে একটা কাকতালীয় ঘটনা ঘটে গেছে।’ কথায় গর্বিতভাব ছিল। তিনি থেমে বলেছিলেন, ‘এই ফ্লাইটে আজকে আমার ছেলে যাচ্ছে।’ জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘ককপিটে। আজকে প্লেনটি চালানোর ভার ওর ওপর। চিফ পাইলট হিসেবে এটি তার প্রথম ফ্লাইট।’
এই অতিসৃজনী শক্তির অধিকারী মহান মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চির অবসরে, গুণগ্রাহীদের শোকাচ্ছন্ন করে। তবে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টিশীল কাজে ও সবার স্মৃতিতে। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। পরিবারের সবার জন্য রইল সমবেদনা।
রফিকুন নবী, ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী



