বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্বৈরথে আজ রাতে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেন ও পর্তুগাল। ৭ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে অবস্থিত বিশ্বকাপ ডালাস স্টেডিয়াম নামে পরিচিত এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে ম্যাচটি গড়াবে। প্রায় ৮০ হাজারের বেশি দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামে ফুটবল উৎসবের আবহে স্মরণীয় এক ম্যাচের সাক্ষী হতে প্রস্তুত বিশ্ব।
দ্বৈরথের ঐতিহ্য ও পরিসংখ্যান
স্পেন ও পর্তুগালের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো। ১৯২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দুই দল ৪১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে। সেখানে স্পেনের জয় ১৮টি, পর্তুগালের ৭টি, আর ১৬টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। গোলসংখ্যাতেও স্পেন এগিয়ে ৭৭ গোলের বিপরীতে পর্তুগালের ৪৫। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে পর্তুগাল এগিয়ে রয়েছে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিকে দুই দলের ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে ২-২ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে জিতে শিরোপা ঘরে তোলে পর্তুগাল। তাই প্রতিশোধ ও আধিপত্য দুই প্রেরণাই থাকবে এই ম্যাচে।
চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের ছন্দ
চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে স্পেন। গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করলেও এরপর সৌদি আরবকে ৪-০ এবং উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ এইচের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে। শেষ বত্রিশে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ ষোলোয় উঠে আসে লা রোহা। চার ম্যাচে সাত গোল করেছে তারা, এখন পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষনে দারুণ ভারসাম্য দেখিয়েছে স্প্যানিশরা। স্পেনের আক্রমণের নেতৃত্বে রয়েছেন তরুণ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল। তার সঙ্গে নিকো উইলিয়ামসের গতি, পেদ্রির সৃজনশীলতা এবং রদ্রির নিয়ন্ত্রণ স্পেনকে করে তুলেছে আরও ভয়ংকর। রক্ষণে আয়মেরিক লাপোর্তে ও রবিন লে নরমঁ দৃঢ় দেয়াল গড়েছেন, আর গোলবারের নিচে উনাই সিমন এখনো অপরাজিত।
পর্তুগালের পথ ও শক্তি
পর্তুগালের পথটা ছিল একটু ভিন্ন। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র। দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় তারা। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে অপরাজিত থেকেই নকআউটে ওঠে। রাউন্ড অব ৩২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলে জয় তুলে নেয়। ৬৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো, আর ৯০ মিনিটে গনসালো রামোস জয়সূচক গোল করে পর্তুগালকে শেষ ষোলোয় তুলে আনেন। পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা এখনো ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে নায়ক হওয়ার ক্ষমতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা ও জোয়াও নেভেস আক্রমণ গড়ছেন, গনসালো রামোস নিজেকে প্রমাণ করছেন নির্ভরযোগ্য গোলদাতা হিসেবে।
কোচদের বক্তব্য ও কৌশল
স্পেন কোচ বলেছেন, "পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ মানেই আলাদা চাপ। ছোট ছোট মুহূর্তই ফল নির্ধারণ করবে।" পর্তুগাল কোচের ভাষায়, "স্পেন অসাধারণ দল। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা এবং বড় ম্যাচ খেলার মানসিকতা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।" কৌশলগতভাবে স্পেন বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। অন্যদিকে পর্তুগাল অপেক্ষা করবে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগের। ব্রুনো ও বের্নার্দোর নিখুঁত পাস কিংবা রোনালদোর এক ঝলকই বদলে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
প্রত্যাশা ও গুরুত্ব
একদিকে রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের আবেগ, অন্যদিকে ইয়ামালের নতুন যুগের সূচনা। ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় রয়েছেন দুই প্রজন্মের দুই প্রতীকের মুখোমুখি লড়াই দেখার জন্য। ইবেরিয়ান উপদ্বীপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর এই লড়াইয়ে একটি দল এগিয়ে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে, অন্য দলের স্বপ্ন থেমে যাবে শেষ ষোলোতেই। শেষ পর্যন্ত হাসবে কি গোল না হজম করা দুর্দান্ত ছন্দের স্পেন, নাকি রোনালদোর নেতৃত্বে আবারও বড় মঞ্চে জয় ছিনিয়ে নেবে পর্তুগাল তার উত্তর মিলবে ডালাস স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে।



