২০২৬ সালে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও শিখা পত্রিকার প্রকাশের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। মুসলিম সমাজে কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং স্বাধীন ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারে এই আন্দোলনের ভূমিকা অপরিসীম। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুস্তক ও গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ও পরবর্তী পথচলা
বুদ্ধির মুক্তি ও শিখা পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অধিকাংশই পরবর্তীকালে লেখালেখিতে তেমন সক্রিয় থাকেননি। আবুল হুসেন রক্ষণশীল সমাজের চাপে চাকরি ছেড়ে ওকালতি শুরু করেন। কাজী মোতাহার হোসেন ও মোতাহার হোসেন চৌধুরীও তেমন লেখালেখি চালিয়ে যাননি। একমাত্র কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতায় থেকে নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। বুদ্ধির মুক্তির দুই তরুণ সদস্য আবুল ফজল ও আবদুল কাদির তখন ছাত্র ছিলেন।
আবুল ফজলের জীবন ও চেতনা
আবুল ফজল ছিলেন একজন সেলফ-মেড পারসন। বাল্যকালে গণ্ডগ্রাম থেকে পিতার সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে এসে কষ্টকরভাবে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে তিনি তাঁর সংগ্রামী জীবন শুরু করেন। জ্ঞানপিপাসা ও জানার আগ্রহে তিনি সব প্রতিকূলতা জয় করেন। শুধু জ্ঞানচর্চায় সন্তুষ্ট না থেকে সাহিত্যশিল্পের সৃজনজগতেও তিনি হাত বাড়িয়েছেন। বুদ্ধির মুক্তির আদর্শ তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, যা তিনি আশি বছরের লেখালেখি ও ব্যক্তিজীবনে ধারণ করেছিলেন।
পাকিস্তান-পর্বেও আবুল ফজল ও আবদুল কাদির লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে আবদুল কাদির ক্রমশ সম্পাদনা ও গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। আবুল ফজল পাকিস্তান নামক ধর্মীয় বিভাজনবাদী রাষ্ট্রে থেকেও উদার, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের পক্ষে লেখালেখি চালিয়ে গেছেন, যা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে বারবার কথা বলেছেন। আইয়ুবীয় সামরিক শাসনের রক্ষণশীল সমাজে এ কথা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল।
প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ও সাহসিকতা
ষাট ও সত্তরের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে অধ্যাপক আবুল ফজল ছিলেন অন্যতম প্রতিবাদী কণ্ঠ। আইয়ুব খানের আমলে তাঁর লেখা প্রকাশের কারণে একাধিক পত্রিকার সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়। তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন, এমন শঙ্কাও দেখা দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ করেছিলেন, যা সে সময় অকল্পনীয় ছিল।
ব্যক্তিগত জীবন ও আদর্শ
আবুল ফজল ছিলেন 'প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিঙ্কিং'-এর মূর্ত প্রতীক। তিনি সারাজীবন সাদা লং ক্লথের পাঞ্জাবি ও পাজামা পরতেন, চলাচল করতেন মূলত পদব্রজে। দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন শতভাগ নিষ্ঠাবান—শিক্ষকতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব বা সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রণালয়ের কাজ—সব ক্ষেত্রেই। তিনি সামান্য উপকরণে জীবনধারণের মন্ত্র পরিবারে সঞ্চারিত করেছিলেন। প্রত্যুষে প্রাতর্ভ্রমণে বের হতেন, সাড়ে ছয়টায় ফেরার পাদুকাধ্বনি শুনে সন্তানেরা বিছানা ছাড়ত। দিনের বাকি সময় তিনি বিশ্রাম নিতেন না, বিছানায় আধশোয়া বা চেয়ারে বসে লিখতেন বা পড়তেন।
সব সন্তানকে সর্বোচ্চ শিক্ষা দেওয়াকে তিনি প্রধান কর্তব্য মনে করতেন। একমাত্র কন্যাকে আত্মীয়পরিজনহীন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে তিনি সংকল্পবদ্ধ ছিলেন, যদিও সে সময় কন্যাশিক্ষার প্রচলন ছিল না। তিনি ধর্মের অন্তঃসারকে মানবকল্যাণের পথ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধ ও বাহাই ধর্ম নিয়ে তিনি পুস্তক ও নিবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি ধর্মের আচার-সর্বস্বতার বদলে গূঢ়ার্থের প্রতি আস্থাবান ছিলেন।
সততা ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত
জীবনে শতভাগ সততা রক্ষা তাঁর কাছে সর্বোচ্চ শপথ ছিল। স্কুলে ভর্তির সময় তিনি সন্তানদের আসল বয়স দিতেন। একবার কনিষ্ঠ পুত্রের বয়স দুই বছর কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করে স্কুলে গিয়ে সঠিক বয়স দিয়ে আসেন। তিনি বলেছিলেন, জ্ঞানার্জনের সূচনা মিথ্যা দিয়ে হতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি প্রত্যেক সন্তানের জন্য মাসে একশ টাকা পাঠাতেন। কিন্তু তাঁর পুত্র যখন চিত্রকলায় ভর্তি হয়ে জানান যে দেড়শ টাকা প্রয়োজন, তখন তিনি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে লেখেন, 'আমি একশ টাকাই পাঠাতে পারব, বাকি পঞ্চাশ টাকা তুমি টিউশনি বা পার্ট-টাইম কাজ করে জোগাড় করে নিয়ো।' প্রথম দুই বছর পুত্র সেভাবেই পড়াশোনা করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ ও শেষ জীবন
বঙ্গবন্ধুর আমলে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকের শাসন নিয়ে হতাশ হলেও, বঙ্গবন্ধু হত্যার নৃশংসতায় তিনি গভীরভাবে শোকার্ত হন। সরকারের উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় তিনি 'মৃতের আত্মহত্যা' নামে গল্প লিখে প্রতিবাদ জানান, যা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদগুলোর একটি। উপাচার্য নিযুক্ত হয়েও তিনি প্রাসাদোপম বাসভবনে না থেকে নিজের বাসায় থেকেছেন, সরল জীবন যাপন করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নির্যাস তিনি জীবনে ধারণ করে বিচ্যুত না হওয়ার সাধনা করেছেন।



