ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন অভিনেতা খুব কমই আছেন, যাঁরা ভাষার সীমানা ভেঙে একাধিক শিল্পে সমান প্রভাব ফেলতে পেরেছেন। কমল হাসান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, হিন্দি—প্রায় সব বড় চলচ্চিত্রশিল্পেই নিজের অভিনয়দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তিনি। কিন্তু আশির দশকে যখন বলিউডে তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে, তখনই হঠাৎ মুম্বাই থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। এমন সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছিল গোটা ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গন। কেন এমন করেছিলেন কমল হাসান? বহু বছর পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্প নয়; বরং আশি ও নব্বইয়ের দশকের বলিউডের এক অন্ধকার অধ্যায়ের কথাও সামনে নিয়ে আসে। সেই অধ্যায়ের নাম—আন্ডারওয়ার্ল্ড, কালোটাকা এবং তারকাখ্যাতির পেছনের অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
দক্ষিণ থেকে মুম্বাই: এক বিস্ময়কর যাত্রা
কমল হাসানের অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল শিশুশিল্পী হিসেবে। কিন্তু সর্বভারতীয় পরিচিতি পাওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দি সিনেমার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালক কে বালচন্দরের হাত ধরেই তাঁর বলিউডে প্রবেশ। ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এক দুজে কে লিয়ে’ ছিল সেই সময়ের অন্যতম বড় ব্লকবাস্টার। দক্ষিণ ভারতের এক তরুণ ও উত্তর ভারতের এক তরুণীর প্রেমের ট্র্যাজেডি নিয়ে নির্মিত ছবিটি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ছবির সাফল্যের পর রাতারাতি বলিউড তারকায় পরিণত হন কমল।
এরপর একের পর এক সফল ছবি। ‘সনম তেরি কসম’, ‘ইয়ে তো কামাল হো গয়া’, ‘জারা সি জিন্দেগি’—সব কটিই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে সমালোচকদের দৃষ্টিতে তাঁর সেরা কাজগুলোর একটি ছিল ‘সাদমা’। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন শ্রীদেবী। বক্স অফিসে ছবিটি ততটা সফল না হলেও সময়ের সঙ্গে এটি কাল্ট মর্যাদা পায়। আজও ভারতীয় সিনেমার অন্যতম আবেগঘন সমাপ্তির উদাহরণ হিসেবে ‘সাদমা’র শেষ দৃশ্যের কথা বলা হয়।
যখন ঋষি কাপুরকেও ছাপিয়ে গেলেন
১৯৮৫ সালে মুক্তি পায় ‘সাগর’। ছবির মূল আকর্ষণ ছিলেন ঋষি কাপুর ও ডিম্পল কাপাডিয়া। কিন্তু ছবি মুক্তির পর আলোচনা শুরু হয় কমল হাসানকে ঘিরে। অনেক সমালোচকের মতে, ছবিতে তাঁর অভিনয় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তিনি কার্যত মূল নায়ক ঋষি কাপুরকেও ছাপিয়ে যান। বলিউডে তখন তাঁর অবস্থান দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছিল। সামনে আরও বড় ক্যারিয়ার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ঠিক তখনই অন্য পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
‘আমি ছিলাম গরিব আত্মীয়’
২০১৭ সালে এক অনুষ্ঠানে কমল হাসান বলেছিলেন, বলিউডের চাকচিক্যের সঙ্গে তিনি কখনো পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, তিনি ছিলেন ‘হিন্দি সিনেমার গরিব আত্মীয়’। মুম্বাইয়ের অনেক তারকা যেখানে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি সিনেমায় অভিনয় করতেন, সেখানে কমল বিশ্বাস করতেন একটি চরিত্রে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার দর্শনে। শিল্পকে তিনি দেখতেন কারখানার উৎপাদন হিসেবে নয়, সৃজনশীল কাজ হিসেবে। বলিউডের প্রচলিত কাজের ধরন তাঁর কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল। একসঙ্গে এতগুলো ছবিতে কাজ করলে অভিনয়ের গভীরতা নষ্ট হয় বলে তিনি মনে করতেন। এই শিল্পদর্শনের পার্থক্যই ছিল বলিউড থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রথম কারণ।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের ছায়া
তবে আরও বড় কারণ ছিল অন্যত্র। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ও তদন্ত হয়েছে। চলচ্চিত্রে অর্থায়ন, তারকাদের হুমকি, প্রযোজকদের ওপর চাপ—এসব বিষয়ে বহু গল্প প্রচলিত ছিল। কমল হাসান সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর মতে, সে সময় বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগ এতটাই ভয়ংকর ছিল যে তিনি এর অংশ হতে চাননি। আবার প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামতে চাননি। তিনি মাঝখানের পথ বেছে নেন—সরে যাওয়া। এক সাক্ষাৎকারে কমল বলেছিলেন, ‘খুব বেশি আন্ডারওয়ার্ল্ড সংযোগ ছিল। আমি সেখানে থাকতে চাইনি—না তাদের বিরুদ্ধে লড়তে, না তাদের কাছে মাথা নত করতে।’ এ বক্তব্য ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত মন্তব্য হয়ে আছে।
কালোটাকার বিরুদ্ধে অবস্থান
কমল হাসানের সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল কালোটাকা। তিনি দাবি করেছিলেন, জীবনের শুরু থেকেই তিনি এবং তাঁর ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে কালোটাকার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবেন না। আজকের মতো করপোরেট বিনিয়োগ, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের যুগ তখন ছিল না। অনেক ছবির অর্থায়ন হতো অস্বচ্ছ উৎস থেকে। কমল মনে করতেন, শিল্পী হিসেবে নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে আর্থিক স্বচ্ছতা জরুরি। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘কালোটাকা ছাড়া জীবনযাপন অসম্ভব নয়। আমি গাড়ি চালিয়েছি, কাজ করেছি, জীবন কাটিয়েছি। এটা সম্ভব।’
ফিরে এলেন, কিন্তু পুরোপুরি নয়
বলিউড থেকে দূরে সরে গেলেও হিন্দি ভাষার দর্শকদের ভুলে যাননি কমল। ১৯৯৭ সালে তিনি ফিরে আসেন ‘চাচি ৪২০’ সিনেমা দিয়ে। তামিল ছবির রিমেক এই সিনেমাটি দর্শকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর ‘হায় রাম’, ‘বিশ্বরূপম’-এর মতো দ্বিভাষিক প্রকল্পে কাজ করেছেন। তবে আর কখনো মুম্বাইকেন্দ্রিক ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করেননি। কারণ, তত দিনে তিনি শুধু অভিনেতা নন; পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং চিন্তাশীল শিল্পী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সময় কি তাঁর সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করেছে?
নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ থেকে বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়ে একাধিক তদন্ত, গ্রেপ্তার ও বিতর্ক সামনে আসে। অনেক প্রযোজক ও তারকা প্রকাশ্যে হুমকি পাওয়ার কথাও বলেছেন। পরে করপোরেট বিনিয়োগ ও কঠোর আর্থিক নিয়মের কারণে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। কিন্তু কমল হাসান যে সময়ে বলিউড ছেড়েছিলেন, তখন তাঁর উদ্বেগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ছিল না বলেই মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
একজন অভিনেতার চেয়ে বেশি কিছু
আজ ৭০-এর কোঠায় পৌঁছেও কমল হাসান ভারতীয় সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর ক্যারিয়ারে রয়েছে জাতীয় পুরস্কার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, রাজনৈতিক অধ্যায় এবং অসংখ্য পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র। অনেকে বলিউডে আরও বড় তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কমল হাসান সেই সুযোগ পেয়েও অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। কারণ, তাঁর কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা শুধু জনপ্রিয়তা ছিল না; ছিল স্বাধীনতা, শিল্পীসত্তা এবং নিজের নীতির প্রতি অটল থাকা।



