রিভিউ: 'রকস্টার' ছবিতে শাকিব খানের নতুন অভিনয় ও গল্পের জয়
রিভিউ: 'রকস্টার' ছবিতে শাকিব খানের নতুন অভিনয়

কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়...’। বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শাকিব খানের সাম্প্রতিক পথচলা যেন সেই নতুনের পতাকা ওড়ানোরই আরেক নাম। গত কয়েক বছরে তিনি শুধু নিজেকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টাই করেননি, বরং নতুন নির্মাতাদেরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ঈদুল আজহায় মুক্তিপ্রাপ্ত আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’ সে ধারাবাহিকতারই নতুন সংযোজন।

প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

মুক্তির আগে টিজার, পোস্টার ও গান দিয়ে ছবিটি যে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল, হলের পর্দায় তার অনেকটাই বাস্তব রূপ পেয়েছে। বিশেষ করে দর্শকের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে শাকিব খানের সম্পূর্ণ ভিন্ন উপস্থিতি।

‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’ কিংবা ‘প্রিন্স’-এ যাঁকে দেখা গেছে অ্যাকশন নায়কের রূপে, প্রায়ই মেশিনগান হাতে, সেই মানুষই এবার হাতে তুলে নিয়েছেন গিটার আর মাইক্রোফোন। ছবির একটি সংলাপে আগুন বলে, ‘এবার আমি মেশিনগান ছেড়ে গিটার হাতে নিলাম।’ সংলাপটি শুধু চরিত্রের নয়, যেন অভিনেতা শাকিব খানের নিজের ক্যারিয়ার নিয়েও এক আত্ম-উপহাস, আত্মস্বীকৃতি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গল্পের শুরু ও চরিত্র পরিচিতি

ছবির শুরুতেই স্টেডিয়ামজুড়ে হাজারো দর্শকের ‘আগুন, আগুন’ ধ্বনি। এরপর গ্রিনরুমে অপেক্ষমাণ এক নতুন শাকিব খানকে দেখে দর্শকও নতুন করে প্রস্তুত হন। সেখান থেকেই গল্প ফিরে যায় অতীতে।

আগুন এক সংগীত পরিবারে জন্ম নেওয়া তরুণ। তার বাবা ওস্তাদ জুনায়েদ (তারিক আনাম খান) দেশের খ্যাতিমান শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। কিন্তু বাবার পরিচয়ের ভেতরে আটকে না থেকে আগুন নিজের পথ খুঁজতে চায়। তাই সে বেছে নেয় রক সংগীত। ভাঙা পরিবারের সন্তান হিসেবে দাদির (দিলারা জামান) স্নেহে বড় হওয়া আগুনের শৈশবজুড়ে আছে নিঃসঙ্গতা ও মানসিক ক্ষত, যা চরিত্রটির ভেতরকার আগুনকে আরও গভীর করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একটি ব্যান্ডের সদস্য আগুন। ব্যান্ডের গান লেখে সে-ই, কিন্তু মঞ্চে তাকে গাইতে দেখা যায় না। কারণ শৈশব থেকে বয়ে আনা মঞ্চভীতি। ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় যখন একদিন অনুপস্থিত লিড ভোকালের জায়গায় মাইক্রোফোন হাতে তুলে নেয় আগুন। সেই এক রাতই বদলে দেয় তার জীবন।

প্রেম ও পতন

সেই কনসার্টেই পরিচয় মীরার (সাবিলা নূর) সঙ্গে। পরিচয় দ্রুত প্রেমে রূপ নেয়। একই সময়ে প্রথম গানেই ভাইরাল হয়ে যাওয়া আগুনের সামনে খুলে যায় বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের দরজা। খ্যাতি, অর্থ, আলো—সবই আসে দ্রুত। কিন্তু অনেক সময় আলোই সবচেয়ে বড় অন্ধকারের জন্ম দেয়। জনপ্রিয়তার চাপ, ভুল সঙ্গ ও ব্যক্তিগত ভাঙনের ফলে আগুন জড়িয়ে পড়ে নেশার জগতে। এরপর প্রশ্ন একটাই—সে কি নিজেকে উদ্ধার করতে পারবে, নাকি তলিয়ে যাবে নিজের তৈরি অন্ধকারে?

নামের কারণে ‘রকস্টার’কে অনেকে হয়তো পুরোপুরি মিউজিক্যাল ছবি ভাবতে পারেন। বাস্তবে এটি সংগীতকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও মূলত একটি রোমান্টিক ড্রামা। প্রেম, বিচ্ছেদ, সাফল্য ও আত্মধ্বংস—এসব পরিচিত উপাদানকেই নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে দর্শককে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করবে দুটি বিষয়—চমৎকার ভিজ্যুয়াল নির্মাণ এবং শাকিব খানের অভিনয়।

ভিজ্যুয়াল ও অভিনয়ের প্রশংসা

একজন সংগীতশিল্পীর জগৎ নির্মাণে ছবিটি বেশ যত্নশীল। ব্যান্ডের অনুশীলন, সদস্যদের খুনসুটি, বিদেশের বিশাল কনসার্ট—সবকিছুই যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। চিত্রগ্রাহক আবদুল মামুনের কাজ এখানে বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্মাতা সংযম দেখিয়েছেন। আগুনের ঘরের দেয়ালে বব মার্লে ও ওয়েসিসের পোস্টার শুধু সাজসজ্জা নয়, সংগীত কিংবদন্তিদের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা নিবেদনও বটে। অন্যদিকে সুউচ্চ ভবনের ছাদে বসে আগুন ও মীরার কথোপকথন ছবির অন্যতম স্মরণীয় রোমান্টিক মুহূর্ত।

শাকিব খানের জন্য ছবিটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল অ্যাকশনবিহীন অভিনয়। বন্দুক নেই, মারপিট নেই; আছে অনুভূতির ওঠানামা। ভাঙা শৈশব, ভুল সিদ্ধান্ত, প্রেম হারানোর কষ্ট—এসব প্রকাশে তিনি সফল। বিশেষত অসহায়ত্ব ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার দৃশ্যগুলোয় তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়। গায়ক ও প্রেমিক—দুই সত্তাতেই তিনি গ্রহণযোগ্য।

সহশিল্পীদের ভূমিকা

‘মীরা’ চরিত্রে সাবিলা নূরও যথার্থ। ‘তাণ্ডব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এরপর টানা তৃতীয় ঈদের ছবিতে উপস্থিত হয়ে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন নিজের বহুমাত্রিকতা। শাকিবের সঙ্গে তাঁর রসায়ন স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য। বিশেষ করে ‘আমি যাব হারিয়ে’ গানটি এবং কয়েকটি রোমান্টিক দৃশ্যে তাঁদের উপস্থিতি ছবির আবেগকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। ধীরগতির ব্যবহারও এসব মুহূর্তে কার্যকর হয়েছে।

তানজিয়া জামান মিথিলা অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই নজর কাড়েন। সুনিধি নায়েকের পর্দাসময় সীমিত। তারিক আনাম খান ও রোজী সিদ্দিকীর চরিত্রও ছোট, ফলে অভিনয়ের খুব বেশি সুযোগ তাঁরা পাননি। আগুনের বন্ধু আসলাম চরিত্রে কাজী সাব্বির ভালো করেছেন। দুই বন্ধুর বন্ধুত্ব, ঝগড়া আর খুনসুটি ছবিতে বাড়তি প্রাণ এনেছে। এমনকি একপর্যায়ে আসলামকে দেখে দর্শকের ‘কানকাটা আসলাম’-এর কথাও মনে পড়তে পারে।

সংগীত ও সীমাবদ্ধতা

ছবির গুরুত্বপূর্ণ দিক এর সংগীত। এতে মোট ১০টি গান রয়েছে। অধিকাংশ গানের কথা, সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন আহমেদ হাসান সানি। পাশাপাশি রাজীব হাসান, হাসান রোবায়েত ও অংকনের লেখা গানও রয়েছে। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন জাহিদ নিরব। ‘পিরিতি’, ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’, ‘আমি যাব হারিয়ে’ ও ‘বেশ কিছুদিন’—প্রকাশিত গানগুলোর প্রতিটির স্বাদ আলাদা। কোথাও আধ্যাত্মিক আবহ, কোথাও সংগ্রামী শিল্পীর গল্প, কোথাও নির্মল প্রেম আবার কোথাও বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস।

ছবিটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আগুনের সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠার যাত্রা ও পতনের প্রক্রিয়াটি আরও গভীরভাবে দেখানো যেত। গল্প বারবার প্রেমের সম্পর্কের দিকে বেশি ঝুঁকে গেছে। অনেক গান থাকলেও সব কটির সঙ্গে আবেগীয় সংযোগ তৈরি হয় না। পরিবার, সম্পর্ক কিংবা কিছু পার্শ্বচরিত্রের অবস্থানও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। কিছু দৃশ্যে অতিরিক্ত আবহসংগীত সংলাপকে আড়াল করেছে। আবার কয়েকটি দৃশ্য প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ মনে হয়েছে। সম্পাদক আনিস মাসুদের আরও সংক্ষিপ্ত ও দৃঢ় সম্পাদনার সুযোগ ছিল।

প্রথমার্ধে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত এগোলেও আগুনের বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রক্রিয়াটি পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধ তুলনামূলক বেশি সাবলীল। অতীতের ঘটনাগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবু পরিচালক ও সম্পাদকের জন্য আরও উন্নতির জায়গা রয়ে গেছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

সবশেষে বলা যায়, প্রথম চলচ্চিত্রেই আজমান রুশো প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সংগীতনির্ভর একটি গল্প বলতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে দর্শকের সামনে হাজির করতে চেয়েছেন এক ভিন্ন শাকিব খানকে। সেই সাহসী প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কারণ, শিল্পের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—নিজেকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতায়।