টাইম ম্যাগাজিনের শীর্ষ প্রভাবশালী তালিকায় জায়গা পেলেন জাফর পানাহি
ইরানের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি এবার টাইম ম্যাগাজিনের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় নিজের স্থান করে নিয়েছেন। এই সম্মাননা তাঁর দীর্ঘদিনের শিল্পীসুলভ সংগ্রাম ও সৃজনশীল প্রতিবাদের প্রতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতিরই প্রতিফলন।
সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাফর পানাহি বহু বছর ধরেই ইরানে সিনেমার সেন্সরশিপের জটিলতা ও রাষ্ট্রীয় চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। তবুও তিনি নিরন্তর সিনেমা নির্মাণ করে গেছেন, যা তাঁকে বারবার ঝুঁকির সম্মুখীন করেছে। সিনেমা বানানোর অপরাধে তিনি বেশ কয়েকবার কারাবরণও করেছেন।
অস্কারে মনোনয়নপ্রাপ্ত এই পরিচালক সম্পর্কে টাইম আরও বলেছে, ‘দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চলা দমন-পীড়নের কঠোর বাস্তবতা জাফর পানাহির সিনেমায় বারবার উঠে এসেছে। তিনি সেন্সরশিপকে প্রতিরোধের এক শক্তিশালী ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন।’ স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত বহু ইরানির জীবনহানির সময় পানাহির চলচ্চিত্র সেই বাস্তবতাকে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছে।
কারাগার থেকে স্বর্ণপাম জয়
গত বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম পুরস্কারজয়ী ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ সিনেমার চিত্রনাট্য তিনি কারাগারে বসেই লিখেছিলেন। পরে গোপনে ইরানে শুট করা হয়েছে এই সিনেমাটি, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যে থাকা একটি জাতির ন্যায়বিচারের সীমিত প্রত্যাশা ও মানসিক ক্ষতের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
জেলে যাওয়া নিয়ে ইরানের এই নির্মাতা একবার বলেছিলেন, ‘আমি এক বছরের জন্য কারাগারে যাব, তারপর বের হয়ে নতুন একটি চিত্রনাট্য লিখব।’ তাঁর এই দৃঢ় প্রত্যয়ই বাস্তবে রূপ পেয়েছে, যা শিল্পের জন্য তাঁর অঙ্গীকারেরই প্রমাণ।
এক ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু গৌরবময় ক্যারিয়ার
জাফর পানাহি ইরানের চলচ্চিত্র জগতের ভাষা বদলে দেওয়া কয়েকজন নির্মাতার মধ্যে অন্যতম। তিনি ক্যারিয়ারের শুরুতে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম পুরস্কার জিতে নেয়।
পরবর্তীতে ‘দ্য মিরর’ (১৯৯৭) এবং ‘দ্য সার্কেল’ (২০০০) এর মতো মাস্টারপিস সিনেমার মাধ্যমে তিনি রূপক অর্থে প্রতিবাদী গল্প বলতে থাকেন। কিন্তু ২০০৬ সালে একটি সিনেমার জন্য তাঁকে থেমে যেতে হয়, যেখানে নারীদের পুরুষ সেজে ফুটবল খেলা দেখার গল্প বলা হয়েছিল। ইরানে নারীদের মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখা নিষেধ ছিল বলে এই সিনেমার কারণে তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অদম্য সৃজনশীলতা
শাস্তির তালিকা এখানেই শেষ নয়, জাফর পানাহির সিনেমা নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার প্রদান ও দেশত্যাগের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সরকার তাঁর হাত-পা বেঁধে ফেলতে চাইলেও তিনি থামেননি, বরং গোপনে সিনেমা নির্মাণ করে ইরানের বিপ্লবী মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
১৯৬০ সালের ১১ জুলাই ইরানের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জাফর পানাহি। মাত্র ১০ বছর বয়সেই চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটে। তিনি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে গোল্ডেন বার্লিন বেয়ারসহ চারটি পুরস্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া কানের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম পেয়েছেন দুবার, সব মিলিয়ে কান থেকে ৫টি পুরস্কার অর্জন করেছেন।
এ বছর তিনি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ সিনেমার মাধ্যমে অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তার আরেকটি মাইলফলক। জাফর পানাহির জীবন ও কাজ প্রমাণ করে যে, শিল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপই হলো স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অদম্য স্পৃহা।



