বিএফডিসি কমপ্লেক্স প্রকল্প: নির্মাণ কাজে বিলম্ব, চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসির কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না, যা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পের কাজ মাত্র ৫০ দশমিক ৬৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে, এবং ২০২৬ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও বিলম্বের কারণ
২০১৮ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে, এবং ২০২৩ সালের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তি স্থাপন করা হয়। কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রকল্প শেষের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও, বর্তমানে ১২ তলার মূল ভবনের মধ্যে ১১ তলার কাজ শেষ হয়েছে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চললে ২০২৭ সালের জুন মাসেও প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না।
বিলম্বের পেছনে বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা:
- প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব ও ঘন ঘন বদল
- কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব
- অর্থ ছাড়ে জটিলতা ও মূল্য সমন্বয়ের মামলা
- ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটভূমির প্রভাব
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহিদ হাসান বলেন, "এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না কবে কাজ শেষ হবে। অর্থ ছাড় না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে আমরা নিজেরাই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।"
বিএফডিসির আর্থিক সংকট ও প্রভাব
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিএফডিসির আয় বছরে ৫২ কোটি টাকা হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক আর্থিক সংকটে ভুগছে। বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান বলেন, "আমাদের কপাল পোড়া। তিনটি ফ্লোর ভেঙে এ কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে, এতে প্রতিষ্ঠানের আয় আরও কমে গেছে। কর্মীদের বেতন–বোনাস সরকারের কাছ থেকে ঋণ করে চালাতে হচ্ছে।"
প্রকল্পের কাজ চলার কারণে বিএফডিসিতে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে আছে, এবং ২০১৬ সালের পর নতুন কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। নির্মাতারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ভাড়া নিতে অনিচ্ছুক, যা চলচ্চিত্র উৎপাদনকে ব্যাহত করছে।
কমপ্লেক্সের সুবিধা ও গুরুত্ব
এই কমপ্লেক্সে নিম্নলিখিত সুবিধা থাকার পরিকল্পনা রয়েছে:
- তিনটি স্ক্রিন বিশিষ্ট সিনেপ্লেক্স
- শুটিং ফ্লোর, মেকআপ রুম, এবং পোস্টপ্রোডাকশন স্টুডিও
- স্যুভেনির শপ, ফুড কোর্ট, এবং আবাসিক হোটেল
- জাদুঘর, লাইব্রেরি, এবং নাট্যমঞ্চ
- প্রায় ৩০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএফডিসি বাংলা চলচ্চিত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কমপ্লেক্সটি সম্পন্ন হলে চলচ্চিত্রশিল্পের ভিত্তি মজবুত হবে এবং বিএফডিসি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অগ্রগতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ ছাড় করা হলেও তা পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, যার মূল কারণ ভবনের নির্মাণ কাজের ধীরগতি।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল সিনেমার জগতে প্রবেশ করতে গিয়ে বিএফডিসি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। কমপ্লেক্সটি দ্রুত সম্পন্ন না হলে চলচ্চিত্র শিল্পের পুনরুজ্জীবন কঠিন হয়ে পড়বে, এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।



