কবি জাফর জাতাল্লি (১৬৫৮-১৭১৩) দিল্লির নার্নাউল গ্রামে (বর্তমান হরিয়ানা) এক সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম মির মুহাম্মদ জাফর এবং 'জাতাল্লি' তাঁর তখল্লুস, যার অর্থ 'যে আবোলতাবোল বকে'। তিনি ফারসি ও হিন্দি ভাষায় এবং 'রেখতা' শৈলীতে দক্ষ ছিলেন।
মোগল পতনের সাক্ষী
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালির আক্রমণে দিল্লি ধ্বংস হয়। এই সময়ে 'শের-আশোবর' (দুর্ভাগ্যের কবিতা) ধারার সূচনা হয়, যার পথিকৃৎ ছিলেন জাফর জাতাল্লি।
ফররুখসিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ
বাদশাহ ফররুখসিয়ার যখন নতুন সিক্কা চালু করেন, তাতে তাঁর প্রশংসা খোদিত ছিল। জাতাল্লি তার প্যারোডি করে লেখেন: 'সিক্কায়ে জাদ বার্গান্দুম ওয়া মথ ওয়া মাতার / বাদশাহ হ্যায় তসমা কাশ ফররুখসিয়ার' (মুদ্রাগুলো ডাল ও মটরদানার, কারণ জুতার ফিতে দিয়ে মানুষ মারেন বাদশাহ ফররুখসিয়ার)। এই ব্যঙ্গের জন্য ফররুখসিয়ার তাঁকে জুতার ফিতে গলায় পেঁচিয়ে হত্যার আদেশ দেন।
ভাষার অগ্রদূত
জাতাল্লি ফারসি ও উর্দুকে মিশ্রিত করে একটি অনন্য শৈলী তৈরি করেন। তিনি 'রেখতা' ভাষায় লিখতেন, যা পরবর্তীতে উর্দু নামে পরিচিত হয়। তাঁর ভাষা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল, কারণ তিনি স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করতেন।
গাণ্ডুনামা ও অন্যান্য রচনা
জাতাল্লির 'গাণ্ডুনামা' গ্রন্থে তিনি বাহাদুর শাহের মতো অযোগ্য শাসকদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি লিখেছেন: 'বাদশাহি হ্যায় বাহাদুর শাহ কি / বনবনাকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে' (বাহাদুর শাহের রাজত্ব এসেছে বনবন করে পাছামারানি খেলা খেলো)।
উত্তরসূরি ও প্রভাব
জাতাল্লির কাব্যধারা পরবর্তীতে হাতিম, মির্জা রফি সওদা, মির তকি মির এবং শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ও মির্জা গালিবের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়। তাঁর রচনা উর্দু সাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সমকালীন সমাজের চিত্র
জাতাল্লি তাঁর কবিতায় সমাজের নিপীড়িত মানুষের কথা তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন: 'গয়া ইখলাস আলম সে / আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়' (দুনিয়া থেকে আনুগত্য হারিয়ে গেছে, আজব এক সময় এসেছে)। তাঁর কবিতা সাধারণ মানুষের দুর্দশা ও শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
দুর্ভাগ্যবশত, জাতাল্লির 'গাণ্ডুনামা' বা অন্যান্য লেখার কোনো অনুবাদ নেই। এমনকি নাগরী হরফে হিন্দিতেও এগুলো অনূদিত হয়নি। তাঁর পাণ্ডুলিপি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে।



