ভাস্কর নভেরা আহমেদ (২৯ মার্চ ১৯৩৯—৬ মে ২০১৫) তাঁর ভাস্কর্যে নানা অচেনা প্রাণী-অবয়ব মূর্ত করেছেন। সাপ, প্যাঁচা ছাড়াও রয়েছে অনেক অদ্ভুত মুখ। এসব প্রাণীর দেহ অলীক। প্যাঁচা ছিল তাঁর সঙ্গী; এই প্যাঁচার মৃত্যু হলে তিনি তার মমি বানিয়ে রেখেছিলেন। প্যাঁচার মধ্যে নানা রহস্যময়তা রয়েছে। নভেরা কি রহস্য ভালোবাসতেন? এই প্রাণীর রয়েছে ক্রূরতা, হিংস্রতাও।
ভাস্কর্যের অদ্ভুত প্রাণী
ভাস্কর্যের মধ্যে এসব প্রাণীর অবয়বে কখনো মনে হবে এগুলো সব পৌরাণিক চরিত্র, কোনোটা দেখতে ঠিক ক্যাটারপিলারের মতো, কোনোটা মথের মতো; হয়তো উড়তে পারে না, ডানা থাকলেও। অলক্ষ্যে, দৈবাৎ—এসব প্রাণীর মুখ কি নভেরা অবচেতনে দেখেছিলেন? সাপের ভাস্কর্য করেছেন। সাপের মতো শিহরিত মুখ নির্মাণ করেছেন—সেই সাপের ফণার ভাস্কর্য করেছেন নানা ভঙ্গিমায়, বারবার।
নভেরা আহমেদ তাঁর পোষা প্যাঁচার সঙ্গে। ষাটের দশকের ছবি। নভেরা ভাস্কর্যে স্পর্শযোগ্য ভর প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেন একমুহূর্তে তিনি জানতে পেরেছিলেন প্রকৃতি কীভাবে কাজ করে। তিনি এমন কিছু গোলাকার চোখের অদ্ভুত প্রাণীর ভাস্কর্য করেছেন, দৃষ্টিভ্রম হলে মনে হতে পারে বোলতা বা ভিমরুল; মনে হয়, হঠাৎ মনুষ্য সমাজ থেকে আত্মগোপন করে থাকা অবয়ব এসব। কারও কারও বড় বড় চোখ। খুদে জলপোকার মতো কোনোটা। শরীরের কোথাও ডানার অস্তিত্ব নেই অথচ পাখির পালক আছে, দিব্যি উড়বে এমন, দিব্য চঞ্চুসমেত একটা প্রোফাইল। সাঁড়াশির মতো লেজ ঝুলছে কোনোটার। পিঠ বরাবর শক্ত খোলের মতো, কাঠের বাক্স যেন। বোঝা যায়, নভেরার কল্পনাজগতে এসব অবয়ব ছিল, পাখির গলায় যেন কালো 'বো টাই' পরানো, ডোরাকাটা পোশাক মনে হয় হঠাৎ।
নভেরার কল্পনাজগৎ
নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য 'চান্দ্র পাখি'। আবার কখনো ডানা থেকে স্ফটিক ঝরে, এই ভাস্কর্যের মধ্যে পাখি নয় কিন্তু আবার নরম শিথিল শরীর আছে, ডানা মেলে দেবে আকাশে—এমন আগ্রাসী ভঙ্গিমা। তাঁর ভাস্কর্য–অবয়ব যেন কান-কোটির, গুবরেপোকা, পিঁপড়ের ডানা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন—এমন অদ্ভুত অলীক। এই জগৎ তিনি রচনা করেছেন। মুখগুলো যেন প্রাণী নয়, আবার চোখ বসানো সূর্যমুখীর পাপড়িতে। একটা প্রোফাইলে চোখ–মুখ বানিয়েছেন, বিস্ময়কর, পাতার আদল, কিন্তু ধারালো দাঁত আছে কি না, জানা যায় না।
নভেরার জীবনে কীটপতঙ্গের মায়াবী জগৎ ছিল—প্রতীকের অরণ্যে তারা বেড়ে উঠছিল। সমাজবদ্ধ প্রাণী নয় এরা, এদের চেহারা কিম্ভূতকিমাকার। লম্বাটে কুমোরে পোকার ঘর যেন, শৈশবে আমাদের ঘরের আসবাবে, দেয়ালে দেখা যেত এবড়োখেবড়ো মাটির ঢেলা গায়ে লেগে থাকা এই প্রাণী, রং ছিল মিশমিশে কালো। শুধু গলার কাছে একটু সরু হলুদ রং লটকে থাকত হাড়ের মতো।
প্রতীকী হিংস্রতা ও রহস্য
নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য 'ইকারুস–৩'। নভেরার প্রাণিজগৎ অদ্ভুত। দৈত্যাকৃতি, ভয়ার্ত শরীর—প্রতীকী হিংস্রতা কি? কিসের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি? আবার কখনো মনে হয়, পাখির ডানায় অনন্ত নক্ষত্রবীথির স্বপ্ন ছিল। তাঁর ভাস্কর্যের দিগন্ত ছুঁয়ে আছে এই কীটপতঙ্গের জগৎ। কোনো কোনো ভাস্কর্য মুখহীন, অবয়বহীন নিঃসীম ঘুমঘোর, কিন্তু প্রয়োজনে বিষদাঁত বের করবে, কামড়ে দেবে—এমন জীবন্ত। 'কুহক' নামে একটি ভাস্কর্য আছে তাঁর—না মানুষ, না পাখি। রহস্যঘেরা মধ্যরাতের কোনো স্বপ্নদৃশ্য মনে হয়। যেন কোনো এক প্রাচীন ঐশ্বরিক দানব, যূথবদ্ধ বিহঙ্গ—মুখ-ঠোঁট নেই...খেয়ালিপনায় দুর্বার দৃষ্টি মেলে দেয়। নভেরার এই কুহক যেন নৈঃশব্দ্যের শরীর। শরীর না যেন শুধু খোল, যেন শব্দহীন, মৌন বিহ্বলতা তার প্রত্যঙ্গে ছড়ানো, ছন্দ মিলিয়ে সে শব্দহীনতা শিখেছে। নির্বাকতা অন্তহীন।
'সাপ' ভাস্কর্যের সঙ্গে নভেরা আহমেদ। ষাটের দশকে তোলা ছবি। বিহ্বল পাখি যেন তার পালক হারিয়ে দিশাহারা—এমন দেহ, অবয়বে অদৃশ্য, আবার চোখের কোটরে কম্পমান দুটি মার্বেল। দরজার রহস্যময় বস্তু জগতের জীবাশ্ম আত্মা যেন, পাখা নেই এমন পাখিমুখ; আবার মনে হয়, পালক গজালে যথাসময়ে খোলস বদলে পতঙ্গ হয়ে উড়ে যাবে আকাশে। যেন তার কত জিনিস করার আছে, জন্তুর শরীর-শব্দ যেন হাওয়ায় ভাসে। ঘাস, শেওলা সমাকীর্ণ একটা বনভূমির ঘেরে নভেরা বেঁচেছিলেন বাংলার প্যাঁচা ছেড়ে, ভাস্কর্য অবয়বের মিশমিশে কালো ক্ষিপ্র দেহভঙ্গিমা কিংবা এমন অদ্ভুত সব অবয়ব নিয়ে—একটির মাথা–বুক–পেট নেই, নিজ নিজ দেহ নিঃসৃত প্রাণ, মাথার দিকের শক্ত খোলস যেন কোনো গোপন কুঠুরি। এই অলীক দুর্বার ভ্রমময় জগৎ ছিল নভেরার ভাস্কর্য পৃথিবীজুড়ে।
ছায়া ও দূরত্বের শিল্প
নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য 'লে জিন', মাধ্যম: ব্রোঞ্জে ঢালাই। নভেরা কি শহীদ মিনারে ছায়া তৈরি করেছেন? কারণ, ছায়া পদার্থহীন—এটি প্রকৃত দেহ নয়, সূর্যের মেঘের মতো ক্ষণস্থায়ী বিভ্রম। তাই এর সব সময় এমন একটি চিত্রের প্রয়োজন হয়েছে, যা তার পদার্থের অভাব স্থির করে। নভেরার ভাস্কর্য সব সময় ছায়া ধরতে স্বপ্ন দেখেছে। নভেরা কি চোখের নাগালের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেন? এমন কিছু প্রাণীর মুখ বানিয়েছেন নভেরা তাঁর পরিণত পর্বে, এমন অনেক ভাস্কর্য বানিয়েছেন, যা দেখে লোকে বলে, তাঁর ভাস্কর্য শৈল্পিক সৌন্দর্য প্রতিহত করে। তিনি হয়তো 'না বানিয়ে কীভাবে বানানো যায়', তা নিয়ে ভেবেছেন, তিনি হয়তো শিল্প নয় এমন একটি ফর্ম রচনা করতে চেয়েছেন। যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে বিধস্ত প্লেনের ভাঙা অংশ দিয়ে তিনি আমেরিকার পতাকা বানিয়েছিলেন।
নভেরার শেষ জীবন ও সমাধি
সেদিন ভোররাতে অন্ধকার ইগল ডানা মেলেছে সবে। নভেরার মৃত্যুমুহূর্ত আগত, দূরে জমে বরফ হয়ে আছে কুয়াশার নদী, জঙ্গল পাহাড়ঘেরা সবুজ এক বনানী, এই ক্রান্তীয় দেশ থেকে বহুদূরের পথ পাড়ি দিয়েছিলেন নভেরা। ২৫ বছরের তরুণী আবিষ্ট হয়ে দেখেছেন রদ্যাঁ, দেখেছেন হেনরি মুর, দেখেছেন হেপওয়ার্থ। এই বাংলার একটি মেয়ের দেখার চোখ বদলে দিল এই শহর-পৃথিবীর বিষণ্ণতম শিল্পীকে, ঘুমের চৌকাঠ পেরিয়ে, নক্ষত্রের কিংখাব পরা আকাশের নিচে। প্যারিসের রোশ-গিওঁর কমিউনাল সিমেট্রিতে তাঁর সমাধি হয়েছে, সিনের পাড়ে, পাহাড়ের পাদদেশে, ঘন সবুজ ভেক্সাঁ প্রকৃতি উদ্যানের মাঝে। শঁতমেল ফ্রান্সের ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের পঁতোয়াজ জেলায় একটি ছোট্ট হ্যামলেট (গ্রামের চেয়েও ছোট জনপদ) প্যারি থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এই অঞ্চলের সবুজ ল্যান্ডস্কেপ, সিনের বাঁকানো তীর আর আলোছায়ার খেলা একসময় মুগ্ধ করেছিল ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী ভ্যান গঘ, কামিল পিসারো ও ক্লোদ মনেকে।
নভেরা আহমেদের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যের ছবি সম্বলিত প্রদর্শনীর ক্যাটালগ। জিভের্নি খুব কাছেই। বাড়ি থেকে খুব কাছে লা রোশ-গিওঁতেও। এই পুরো বনানী যেন নভেরার শিল্পের মতোই—নিভৃত, রহস্যময়, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম। গ্রীষ্মে গাছপালা ও ফুলে ভরা, শরৎ-শীতে এক নাটকীয় নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এই সিমেট্রি প্যারির সুন্দর কবরগুলোর একটি, যেখানে নভেরা শুয়ে আছেন, লা রোশ-গিওঁ ও তার আশপাশে সিন নদী চুনাপাথরের খাড়া পাহাড়ের নিচ দিয়ে বাঁক নিয়ে এগিয়ে যায়। সারি সারি গাছের এক অনন্ত নক্ষত্রবীথি, পাখির কলকাকলিতে ভরপুর এই সমাধি...
শঁতমেলের এই বাড়িতে থাকতেন নভেরা। এই বারান্দায় বসে তিনি পাখিকে খাবার দিতেন। ছবি: গ্রেগয়া ব্রুনস। রহস্যময় নভেরার জগৎ, ইতিহাসের জাদুমুহূর্ত যেন, সমাধিক্ষেত্রের দিকে হেঁটে গেল সবাই একটি কফিন আর দুটি শব নিয়ে... এমন আশ্চর্যই খুঁজেছিলেন নভেরা।
অসংখ্য পাখির ছবি এঁকেছেন নভেরা। জীবন্ত একটা পাখির খোঁজ মেলে, যাকে নভেরা বারান্দায় বসে খাবার দিতেন। নভেরার মৃত্যুদিনে এই পাখি এসে হাজির হয়েছিল, হুটোপুটি অস্থির ডানা ঝাপটানো পাখিটিও শেষে তমশা ঘনালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। রহস্যময় নভেরার জগৎ, ইতিহাসের জাদুমুহূর্ত যেন, সমাধিক্ষেত্রের দিকে হেঁটে গেল সবাই একটি কফিন আর দুটি শব নিয়ে... এমন আশ্চর্যই খুঁজেছিলেন নভেরা।



