আলোকচিত্রের জাদুকর রঘু রাই: এক অনন্য চিত্রভাষার নির্মাতা
আলোকচিত্রের জাদুকর রঘু রাইয়ের জীবন ও কর্ম

রঘু রাই (১৮ ডিসেম্বর ১৯৪২ - ২৬ এপ্রিল ২০২৬) ভারতীয় উপমহাদেশের এক কিংবদন্তি আলোকচিত্রী। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি যুদ্ধ থেকে শুরু করে ধ্রুপদি শিল্পকলা—সবকিছুই নিজের ক্যামেরায় নান্দনিকভাবে ধারণ করেছেন। তাঁর তোলা ছবি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

শুরুর জীবন ও ক্যারিয়ার

রঘু রাইয়ের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের (অধুনা পাকিস্তানের ঝং) এক গ্রামে। তিনি ছিলেন মা-বাবার কনিষ্ঠ সন্তান। বাবা চেয়েছিলেন তিনি ইঞ্জিনিয়ার হন। তাই তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে দিল্লিতে সরকারি চাকরি নেন। কিন্তু তা ভালো লাগেনি। তাঁর বড় ভাই এস পল ইতিমধ্যে একজন প্রতিষ্ঠিত ফটোগ্রাফার ছিলেন। রঘু তাঁর আগ্রহের কথা ভাইকে জানালে পল তাঁকে এক বন্ধুর কাছে পাঠান। ১৯৬২ সালে সেই বন্ধুর কাজ দেখতে গ্রামে যান এবং নিজের মতো করে শিখতে শুরু করেন। ফটোগ্রাফি তাঁর জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে যায়। ১৯৬৫ সালে তিনি দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি অকপট ও উচ্চ-কন্ট্রাস্ট আলোকচিত্রে নিজের স্বাক্ষর ও শৈলী বিকাশ করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি

রঘুর কর্মজীবনের শুরুর দিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ঘটে। ১৯৭১ সালে তিনি শরণার্থী, যুদ্ধ এবং পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের শক্তিশালী চিত্র ধারণ করেন। এই কাজ তাঁকে ভারত ও বিশ্বে বিশেষ পরিচিত করে তোলে। ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাঁকে ফ্রেন্ডস অব লিবারেশান ওয়ার অনার দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৭১ সালে কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কারতিয়ের-ব্রেসোঁ তাঁর এক প্রদর্শনী দেখে তাঁকে ম্যাগনাম ফটো এজেন্সিতে যোগ দিতে অনুরোধ জানান। ১৯৭৭ সালে তিনি ম্যাগনামের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে দ্য স্টেটসম্যান ছেড়ে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮০ সালে ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনে আলোকচিত্র সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি ও অন্যান্য কাজ

১৯৮৪ সালে রঘুর ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সমাহিত শিশুর চিত্র বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। এটি শিল্প বিপর্যয়ের ভুতুড়ে প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর বিচারক ছিলেন বেশ কয়েকবার। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মাদার তেরেসা, দালাই লামা, ইন্দিরা গান্ধীর ওপর দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। খাজুরাহো, তাজমহল, কলকাতা, মুম্বাই শহরসহ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০টির বেশি। সারা বিশ্বের প্রায় সব বিখ্যাত প্রকাশনা ও গ্যালারিতে তাঁর ছবি ছাপা ও প্রদর্শিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক

২০১২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতে 'বাংলাদেশ দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম' নামে একক প্রদর্শনীতে তিনি প্রথম তাঁর তোলা মুক্তিযুদ্ধের ছবি প্রদর্শন করেন। তিনি বলেছিলেন, 'বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সীমাহীন মূল্য দিতে হয়েছে।' ২০১৯ সালে ঢাকায় ছবিমেলায় অংশ নিয়ে বলেছিলেন, 'তথাকথিত রাজনীতি নয়, শিল্পী ও সাংবাদিকদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের কাজ।'

ব্যক্তিগত জীবন ও দর্শন

রঘু ছিলেন গুরুভক্ত এবং বিশ্বাস করতেন মানুষের সৃজনশীল ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি 'পিকচার কামস ফ্রম গড' দীর্ঘদিন ম্যাগনামের ওয়েবসাইটে ছিল। তিনি গাছ ভালোবাসতেন এবং পুরো ভারত থেকে শত শত দুষ্প্রাপ্য গাছ এনে নিজের স্কুলে রোপণ করেছিলেন। তাঁর বেশ কয়েকটি বই শুধু গাছ নিয়েই।

রঘু রাই ২৬ এপ্রিল ২০২৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর তোলা ছবি চিরকাল আমাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।