মাইকেল জ্যাকসনের জীবনকাহিনী নিয়ে বায়োপিক: জাফর জ্যাকসনের অভিনয় ও বিতর্ক
প্রয়াত কিংবদন্তি পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের জীবন নিয়ে নির্মিত হলিউড সিনেমা 'মাইকেল'-এ তাঁর ভাতিজা জাফর জ্যাকসন প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন। আইএমডিবি তালিকায় ছবিটির নাম মাইকেল জ্যাকসন রাখায় শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কেননা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও প্রশ্ন রয়েছে। অপেক্ষার অবসান ঘটছে ২৪ এপ্রিল, যখন বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে এই সিনেমাটি। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, 'বোহেমিয়ান র্যাপসোডি'-র মতোই 'মাইকেল' সিনেমাটি মুক্তির পর ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করতে পারে, যদিও এটি শুধু জ্যাকসনের জীবনের ইতিবাচক দিকই তুলে ধরছে।
প্রকল্পের সূচনা ও চ্যালেঞ্জ
২০১৮ সালে 'বোহেমিয়ান র্যাপসোডি' সিনেমার সাফল্যের পর প্রযোজক গ্রাহাম কিং ঘোষণা দেন, তিনি আরেকজন সংগীত কিংবদন্তিকে নিয়ে বায়োপিক বানাবেন, যার ফলশ্রুতিতে 'মাইকেল' প্রকল্পের জন্ম হয়। তবে শুরু থেকেই এই ছবিটি সহজ ছিল না, কারণ মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ। ১৯৯৪ সালে জর্ডান চ্যান্ডলারের সঙ্গে আদালতের বাইরে সমঝোতা এবং ২০০৫ সালে একটি ফৌজদারি মামলায় খালাস পাওয়া সত্ত্বেও, এই অভিযোগগুলি তাঁর ইমেজকে প্রভাবিত করেছে। জ্যাকসনের এস্টেটের আইনজীবীরা দাবি করেন, মাইকেল জ্যাকসন নির্দোষ ছিলেন এবং এটি আদালতের রায় দ্বারা সমর্থিত, তবুও এই বিতর্কিত বিষয়গুলি একটি বড় বাজেটের হলিউড সিনেমা নির্মাণকে জটিল করে তুলেছে।
তারকাবহুল দল ও নির্মাণ প্রক্রিয়া
২০২৩ সালে ঘোষণা করা হয়, 'মাইকেল' সিনেমার চিত্রনাট্য লিখবেন জন লোগান এবং পরিচালনা করবেন অ্যান্টনি ফুকো। অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন কোলম্যান ডমিঙ্গো, মাইলস টেলার এবং নিয়া লং। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, মাইকেল জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করছেন তাঁরই ভাতিজা জাফর জ্যাকসন, যা দর্শকদের মধ্যে অতিরিক্ত আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। ২০০৯ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুর পরও মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং বেড়েছে, স্পটিফাইয়ে তাঁর মাসিক শ্রোতা প্রায় ৬৫ মিলিয়ন। এই বিশাল 'মাইকেল জ্যাকসন ইন্ডাস্ট্রি'র নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে এই বায়োপিক, যা বিতর্কের মাঝেও দর্শকদের আকর্ষণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিতর্কিত অংশ বাদ ও সিক্যুয়েলের সম্ভাবনা
প্রাথমিকভাবে ধারণা ছিল, সিনেমাটিতে জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলিও দেখানো হবে, বিশেষ করে জর্ডান চ্যান্ডলার-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হবে। কিন্তু পরে সেই পরিকল্পনা বদলে যায়, এবং বর্তমান সংস্করণে শুধু জ্যাকসনের শৈশব, 'দ্য জ্যাকসন ৫'-এর সঙ্গে তাঁর যাত্রা, বাবার কঠোর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি, একক শিল্পী হিসেবে সুপারস্টার হয়ে ওঠা এবং ১৯৮৮ সালের 'ব্যাড' ট্যুরের জাঁকজমকপূর্ণ কনসার্ট দিয়ে সমাপ্তি টানা হয়েছে। হলিউড রিপোর্টারের মতে, ১৯৯৪ সালের সমঝোতার একটি শর্ত ছিল যে জর্ডান চ্যান্ডলারকে কোনো চলচ্চিত্রে দেখানো যাবে না, ফলে নতুন করে দৃশ্য লেখা হয় এবং ২০২৫ সালে ২২ দিন অতিরিক্ত শুটিং করা হয়, যা ১০-১৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। মুক্তির সময়ও পিছিয়ে ২০২৬ সালে নিয়ে আসা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাদ পড়া অংশগুলো ভবিষ্যতে সিক্যুয়েলে ব্যবহৃত হতে পারে, এবং স্টুডিও লায়নসগেট ইঙ্গিত দিয়েছে যে এটি আসলে 'পার্ট ওয়ান', যেখানে একজন কিংবদন্তির উত্থান দেখানো হবে।
সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
বিতর্কের পাশাপাশি, প্রশ্ন উঠছে যে এত বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন মাইকেল জ্যাকসন এখনো এত জনপ্রিয়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সমালোচক লুডোভিক হান্টার-টিলনির মতে, তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নেই, এবং অনেকেই তাঁকে 'ভিকটিম' হিসেবে দেখেন, পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ শিল্পী। অন্যদিকে, ২০১৯ সালের বিতর্কিত তথ্যচিত্র 'লিভিং নেভারল্যান্ড'-এ দুই ব্যক্তি অভিযোগ করেন যে শিশু অবস্থায় তাঁরা জ্যাকসনের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, এবং নির্মাতা ড্যান রিড দাবি করেন যে বায়োপিকের প্রাথমিক স্ক্রিপ্টে অনেক ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছিল। তবে জ্যাকসনের এস্টেট এই অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কেবল ইতিবাচকভাবে সিনেমায় মাইকেলকে উপস্থাপন করা হলে সমালোচকরা কীভাবে নেন এবং সার্বিক প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটা মুক্তির পরই বোঝা যাবে।



