শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া (১ জানুয়ারি ১৯২৯—৭ জুন ২০১১) ও তাঁর আঁকা চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
মোহাম্মদ কিবরিয়ার ছবিতে প্রথমে যা টানে, সেটা রঙ নয়, রঙের নিচে যে স্তর আছে, সেটা। ক্যানভাসের গায়ে সময়ের মতো জমে থাকা একটা ভূগোল। কখনো মসৃণ, কখনো খসখসে, কখনো পুরোনো দেয়ালের মতো উঠে আসা। কিবরিয়া বলতেন, টেক্সচার তাঁর কাছে শুধু সারফেসের বৈশিষ্ট্য নয়, এটা ছবির ভেতরের দ্বান্দ্বিকতার ইঙ্গিত।
মানুষীয় ধারার বাইরে
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের যে ধারা, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে কামরুল হাসান পর্যন্ত, সেটা মূলত ‘মানুষীয়’ ধারা। দুর্ভিক্ষের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের মানুষ, মাটির মানুষ। এই ধারায় ছবি একটা সাক্ষ্য দেয়; ঘটনার, সময়ের, যন্ত্রণার। কিবরিয়া এই ধারার বাইরে। তবে বিপরীতে নন, অন্য কোথাও। তিনি সাক্ষ্য দেন না, তিনি একটা অবস্থা তৈরি করেন। পার্থক্যটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান ভ্রমণ ও শিল্পদর্শন
১৯৫৯ সালে মোহাম্মদ কিবরিয়া জাপানে গেলেন। যাওয়ার আগের বছর একটা লিথোগ্রাফ করেছিলেন, ‘ফুল হাতে বালক’। একটা শিশুর অবয়ব, কিন্তু শরীরজুড়ে জালের মতো রেখা, দুই পাশে কালো স্তম্ভ। এটা সম্ভবত তাঁর শেষ ফিগারেটিভ কাজগুলোর একটা। এর পর থেকে তাঁর ক্যানভাসে মানুষ আর ফেরেনি। কিন্তু মানুষ চলে যাওয়া মানে ছবি ফাঁকা হয়ে যাওয়া নয়, বরং উল্টো। ফিগার থাকলে দর্শক ফিগারের দিকে যায়, তার গল্পে, তার পরিচয়ে। ফিগার না থাকলে দর্শকের নিজের ভেতরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিবরিয়া এই ফাঁদটা জেনেশুনে তৈরি করেছিলেন। জাপানে তিনি লিথোগ্রাফ, উডকাট, এচিং শিখলেন। কিন্তু আসল শিক্ষাটা কৌশলের ছিল না।
জাপানি উদ্যানের দর্শন, যেখানে পাথর, জল, শূন্যতা আলাদা আলাদা সত্তা হিসেবে একসঙ্গে থাকে, একে অপরকে সংজ্ঞায়িত করে, এটা তাঁর দেখার অভ্যাস বদলে দিল। তাঁর ছবিতে এর পর থেকে স্পেস ফাঁকা নয়; বরং স্পেস নিজেই একটা উপস্থিতি। এই ধারণা পশ্চিমা অ্যাবস্ট্র্যাকশন থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। জ্যাকসন পোলক বা উইলেম দ্য কুনিং যেখানে জেশ্চার, তুলির দাগ, শরীরের উত্তাপ ও তাৎক্ষণিকতাকে সামনে আনেন, কিবরিয়া সেখানে উল্টো কাজ করেন। তাঁর ছবিতে তুলি দেখা যায় না, প্রক্রিয়াটা লুকানো। কারণটা নান্দনিক নয়, দার্শনিক। আমেরিকান অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিজম শিল্পীর উপস্থিতি জাহির করে। আমি এঁকেছি, এই আমার হাতের দাগ। কিবরিয়া নিজেকে সরিয়ে নেন; যা থাকে, সেটা অনুভূতির অবশিষ্ট, শিল্পীর নয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এটাকে বলেছিলেন ‘ভয়েডিং অব কনটেন্টস’ বা বিষয়বস্তুকে শূন্য করা।
রঙের দর্শন
কিন্তু এই শূন্যতা ফাঁকা নয়। ১৯৭৫-এর ‘পেইন্টিং ইন ব্ল্যাক’, ১২০ বাই ১২০ সেন্টিমিটারের ক্যানভাসে কালোর ভেতরে কালো। কিন্তু টেক্সচারের কারণে এটা দেয়াল নয়, দরজা। একই সময়ের ‘ব্ল্যাক, ব্রাউন অ্যান্ড ইয়েলো’, সাতটা আলাদা প্যানেল, প্রতিটায় একই রঙের ভিন্ন মৃত্যু বা জন্ম। এই দুটি ছবি পাশাপাশি দেখলে বোঝা যায়, কিবরিয়ার কাছে রং কখনো শুধু রং নয়, রং একটা অবস্থা। রং নিয়ে তাঁর নিজস্ব দর্শন ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, রঙের স্বাধীন সত্তা আছে, কিন্তু সেটা রেখা, স্পেস, টেক্সচার থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। রং স্বাধীন, কিন্তু দায়িত্বহীন নয়। এই টানাপোড়েনটাই তাঁর ছবিকে বাঁচিয়ে রাখে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন
‘মেমোরিয়াল’, ১৯৮০। মুক্তিযুদ্ধের ৯ বছর পর। মিউটেড গ্রে আর বার্ন্ট আম্বারে আঁকা। কোনো আগুন নেই, কোনো আর্তনাদ নেই; যা আছে, সেটা স্মৃতির রং, যে রং সময়ের সঙ্গে ধূসর হয়ে যায়, কিন্তু মুছে যায় না। কিবরিয়া সামাজিক বাস্তবতা থেকে সব সময় দূরে থেকেছেন বলে যে অভিযোগ আছে, এই একটা ছবি সেই অভিযোগকে জটিল করে দেয়। তিনি ১৯৭১–কে এড়াননি। অন্যভাবে ধরেছেন, চিৎকার দিয়ে নয়, নীরবতা দিয়ে।
‘স্বাধীনতা’, ১৯৯৬, উদ্যাপনের ছবি নয়। নিচে কমলা-হলুদের উত্তাপ, ওপরে নীল-বেগুনির শীতলতা। দুটি জগৎ পাশাপাশি, কোনো রেজোল্যুশন নেই, কোনো মিলন নেই। স্বাধীনতা মানে দুটো বিপরীত শক্তির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান—এই রাজনৈতিক বোঝাপড়া অনেক শিল্পীর কাছে অনুপস্থিত থাকলেও কিবরিয়ার ক্যানভাসে তা স্বাভাবিকভাবেই এসেছে।
বর্ণমালার রহস্য
এই ভাষার সবচেয়ে রহস্যময় উদাহরণ সম্ভবত ১৯৬৫-এর ‘বর্ণমালা’। কমলা জমিনের ওপর কালো আকৃতি, বাংলা হরফের মতো দেখতে, কিন্তু পড়া যাচ্ছে না। ভাষা আছে, অর্থ নেই। অথবা অর্থ আছে, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না। কিবরিয়া এখানে একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। চেনা আকৃতিকে অচেনা করে দিলেন। দর্শক পড়তে চান, পারেন না। এই না-পারার মধ্যে একটা অস্বস্তি আছে এবং সেই অস্বস্তিটাই ছবির কাজ। এই চিত্রকর্মটা ১৯৫২-এর মাত্র ১৩ বছর পর, যে বছরে ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে বর্ণমালা দেখলে ছবিটা আরও জটিল হয়ে ওঠে। কিবরিয়া কি বলছেন, ভাষা আসলে কখনো পুরোপুরি পড়া যায় না?
শেষ জীবন ও কোলাজ
১৯৯৮ সালে চারুকলার ৫০তম বার্ষিকীর সময়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতাল, দীর্ঘ অসুস্থতা। এরপর তাঁর কাজে মৃত্যুচিন্তা ঢুকল। কিন্তু ভয় হিসেবে নয়, একটা সংহতি হিসেবে। ‘ক্ষয়’, ২০০১, পুরোনো দেয়ালের মতো চুন খসছে, ভেতর বেরিয়ে আসছে। কিন্তু এই ক্ষয়কে তিনি বিষাদের চোখে দেখেছেন, তা বলা যাবে না, এটা রূপান্তরের ছবি। এই সময়ে কোলাজ এল। পুরোনো কাগজ, ছেঁড়া কাপড়, ম্যাগাজিনের পাতা, যা একসময় অন্য কিছু ছিল, তাকে নতুন প্রসঙ্গে রাখলেন। কোলাজ মানে স্বীকার করা যে সবকিছুর একটা আগের জীবন আছে। ক্যানভাসে যা আছে, সেটা শেষ কথা নয়, একটা স্তরমাত্র।
২০০৩-এর ‘সানরাইজ’, নরম কমলা ওপরে, নীল নিচে, কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু আলো। অসুস্থতার পর এটা একটা ঘোষণার মতো। ২০০২-এর কোলাজগুলোতে দেখা যায় পুরোনো কাগজের চামড়া, তার ভাঁজ, তার ক্ষয়; এগুলো ছবির উপাদান হিসেবে ঢুকে পড়ছে। ২০০৪-এর কাজগুলোতে আরও স্পষ্ট। নিচে প্রায় ভাঙা ইটের মতো টেক্সচার, ওপরে ধূসর-নীল, বাঁয়ে একটা ছেঁড়া ক্যানভাসের টুকরা। এটা ধ্বংসের ছবি, কিন্তু ধ্বংসকে সুন্দর করে দেখানো হয়েছে। কিবরিয়া যেন বলছেন, ভাঙাটাও একটা ফর্ম। ক্যানভাসে যা আছে, সেটা শেষ কথা নয়, একটা স্তরমাত্র এবং সেই স্তরের নিচে আরও স্তর আছে, যা দর্শক দেখতে পান না কিন্তু অনুভব করেন।
শিল্পের সামাজিক দায়
কিবরিয়ার বিরুদ্ধে একটা পুরোনো অভিযোগ আছে—তিনি সামাজিক বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন। দুর্ভিক্ষ নেই, মুক্তিযুদ্ধ নেই, শহরের যন্ত্রণা নেই। অভিযোগটা সত্য, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কিবরিয়ার ছবি তাৎক্ষণিক আঘাত করে না। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে ধীরে ধীরে কিছু একটা সরে যায়, ছবির ভেতর থেকে নয়, দর্শকের ভেতর থেকে। এটাই তাঁর শিল্পের কাজ ছিল। রং দিয়ে কথা বলা নয়; রং দিয়ে একটা প্রশ্ন তৈরি করা, যার উত্তর দর্শককেই খুঁজতে হবে।
প্রশ্নটা হলো, শিল্পের সামাজিক দায় মানে কি শুধু বিষয় বেছে নেওয়া? কিবরিয়া বিষয় বেছে নেননি, কিন্তু একটা ভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন; দর্শককে তাঁর নিজের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব। যে সমাজে মানুষ বাইরের শব্দে এতটাই ডুবে থাকে যে ভেতরের কথা শুনতে পায় না, সেখানে এ ধরনের কাজ একটা রাজনৈতিক অবস্থান।
কিবরিয়ার ছবি তাৎক্ষণিক আঘাত করে না। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে ধীরে ধীরে কিছু একটা সরে যায়, ছবির ভেতর থেকে নয়, দর্শকের ভেতর থেকে। এটাই তাঁর শিল্পের কাজ ছিল। রং দিয়ে কথা বলা নয়; রং দিয়ে একটা প্রশ্ন তৈরি করা, যার উত্তর দর্শককেই খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের শিল্পে এ ধরনের দাবি খুব কম শিল্পী করেছেন—দর্শককে বিশ্বাস করো, তাঁকে একা ছেড়ে দাও, সে নিজেই পৌঁছাবে।



