বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় মৌসুমি ফলের শাঁস এখন শুধু তৃষ্ণা মেটানোর উপাদান নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চলতি মৌসুমে তালের শাঁসকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে কোটি টাকার বাজার। স্থানীয় বাজারে চাহিদা মিটিয়ে তা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
তাল শাঁসের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
এক সময় গ্রামবাংলার পথঘাট, খেতের আইল ও বাড়ির আঙিনায় জন্মানো তালগাছকে তেমন অর্থনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হতো না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, গ্রীষ্মের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তালের শাঁসের চাহিদাও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে এই ফল এখন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফকিরহাটের তালগাছের সংখ্যা ও উৎপাদন
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে বর্তমানে ফলন্ত তালগাছের সংখ্যা ১০ হাজার ৫০৪টি। প্রতিটি গাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি কাঁদি এবং প্রতি কাঁদিতে গড়ে ১৫টি করে তাল ধরে। কৃষক পর্যায়ে মাঠ থেকে প্রতি পিস শাঁসযুক্ত তাল মাত্র ১ টাকায় বিক্রি হলেও ভোক্তা পর্যায়ে এর দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত ওঠে।
বছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বাণিজ্য
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু তালের শাঁসকে কেন্দ্র করেই ফকিরহাটের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতামত
সরেজমিন দেখা যায়, ফকিরহাট টাউন নওয়াপাড়া এলাকার তাল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, আগে তাল অনেক সময় গাছেই নষ্ট হয়ে যেত। এখন শাঁসের চাহিদা এত বেশি যে গাছ থেকে নামানোর আগেই অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখেন। এ উপজেলা থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তালের শাঁস নিয়ে যায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা
উপজেলার শুভদিয়া এলাকার বাসিন্দা ও ভোক্তা সুমাইয়া আক্তার বলেন, গরমে বাইরে বের হলে তালের শাঁস খেলে শরীর ঠান্ডা লাগে। বাচ্চারাও খুব পছন্দ করে। তাই মৌসুমে নিয়মিত কিনি।
প্রাকৃতিক খাবারের দিকে ঝোঁক
ফকিরহাট বাজারে শাঁস কিনতে আসা ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে কোমল পানীয়ের চেয়ে অনেক মানুষ প্রাকৃতিক খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। তালের শাঁস সেই সুযোগ তৈরি করেছে। দাম কিছুটা বেশি হলেও চাহিদা কমে না।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে তালগাছের ভূমিকা
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালগাছ একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। ফলে একসময় অবহেলিত এই ফল এখন ফকিরহাটের গ্রীষ্মকালীন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তালের শাঁসের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে কৃষক, সংগ্রহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়।
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাল একটি পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল বৃক্ষ। এটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবেও কাজ করে। একই সঙ্গে এর অর্থনৈতিক মূল্যও ক্রমেই বাড়ছে। এ কারণে আমরা তালগাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণে গুরুত্ব দিচ্ছি।
তালগাছ রোপণ কর্মসূচি
তিনি আরও জানান, উপজেলা কৃষি অফিস গত ১২ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫শটি তালের চারা রোপণ করেছে। এছাড়া গত বছর কৃষকদের প্রণোদনা ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে আরও প্রায় ২শটি চারা রোপণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।



