নায়িকা গুলশান আরা চম্পা। শুটিংয়ের কারণে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও কেটেছে ঈদের দিন। একাধিকবার। তাঁর বিশ্বাস, বাংলাদেশের মতো ঈদের আনন্দ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। শৈশবের ঈদ, অভিনয়জীবনের ঈদ, আর এবার সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের মধ্য দিয়ে কাটানো ঈদুল আজহা—সব মিলিয়ে ঈদ তাঁর কাছে স্মৃতি, ভালোবাসা আর ত্যাগের গল্প।
শৈশবের ঈদ
পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় কেটেছে তাঁর শৈশব। তখন ঈদ মানেই ছিল উৎসবের অপেক্ষা। কোরবানির ঈদের চেয়ে রোজার ঈদই তাঁকে বেশি টানত। ঈদের চাঁদ দেখার অপেক্ষা, নতুন জামা পরার আনন্দ—সবকিছু ঘিরে অন্য রকম উচ্ছ্বাস কাজ করত। আর কোরবানির ঈদে ছোটবেলায় মন কিছুটা খারাপ থাকত। তবে কোরবানির মাংস বিলি করাটা বেশ উপভোগ করতেন। আনন্দ নিয়েই কাজটা করতেন। বড় হয়ে, বিয়ের পর সেই কাজটা তিনি আরও বেশি দায়িত্ব নিয়ে করতেন।
কোরবানির ঈদে তাদের বাসায় গরু ও ছাগল দুটোই কোরবানি হতো। হাট থেকে কিনে আনার পর তিনি গরু-ছাগল খুব আদর করতেন। তিনি তিন বোনের পরিবারে বড় হয়েছেন। দুজন তাঁর বড়। তাই সুচন্দা আপা ও ববিতা আপার আদরের ছিলেন।
পর্দার তারকা হলেও ঘরের কাজে কখনো ছাড় পাননি। তিন বোনই সিনেমার কাজের বাইরে ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সংসারের নানা কাজ করতেন। ঈদ এলে তাঁর ওপর পড়ত মাংস বণ্টনের দায়িত্ব। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার কাজটি তাঁকে করতে হতো। বিয়ের পর নিজের সংসারেও সেই দায়িত্বই পালন করেছেন।
ঈদের পোশাকের স্মৃতি
শৈশবের ঈদের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি হলো নতুন পোশাক, মাথার ফিতা, চুড়ি আর জুতা ঘিরে। বাবা নতুন জামা-জুতা কিনে না দিলে ঈদ পূর্ণই হতো না। বলতেন, নতুন জামা, মাথার ফিতা, হাতের চুড়ি আর নতুন জুতা তাঁর চাই-ই চাই। একদম নাছোড়বান্দা ছিলেন।
কোরবানির ঈদ তাঁর জন্য তিন দিন চলত। তাই তিন দিনের জামাকাপড় চাইতেন। রোজার ঈদ অবশ্য আরও বেশি, পাঁচ দিন। ঈদের আগের রাতে জামা বালিশের নিচে আর জুতা পাশে রেখে ঘুমাতেন। তারপর একটু পরপর ঘুম থেকে উঠে দেখতেন, সব ঠিক আছে কি না। জামা আছে তো, জুতা আছে তো, ফিতা আছে তো—এসব দেখেই আবার ঘুমাতেন। কখন ভোর হবে, সকাল হচ্ছে না কেন—অস্থির হয়ে থাকতেন।
অভিনয়জীবনের ঈদ
অভিনয়জীবনে ঈদ মানেই ছিল নতুন সিনেমা মুক্তির আনন্দ। ঈদের দিন হলে না গেলেও পরদিন বোরকা পরে দর্শকের ভিড়ে বসে নিজের সিনেমা দেখতেন। কখনো নাজ, কখনো মধুমিতা কিংবা মিরপুরের সনি সিনেমা হল—প্রতিটি হলে আলাদা স্মৃতি আছে তাঁর।
অভিনয়জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঈদগুলোর একটি কেটেছিল ভারতের ওডিশায়। সঠিক সময়টা মনে নেই, কিন্তু মনে আছে সেটা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। তিনি তখন কাজ করছিলেন সন্দীপ রায় পরিচালিত 'টার্গেট' সিনেমায়। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ওম পুরী। কোরবানির ঈদের দিনও চলছিল শুটিং। ইউনিটের সবাই এত আন্তরিক ছিলেন যে তাঁকে কখনোই বিদেশে আছি, এমনটা বুঝতে দেননি। শুটিং পেছানোর সুযোগ থাকলেও তিনি নিজেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মনে হয়েছিল, ঈদ তো জীবনে আবার আসবে। কিন্তু এত মানুষের শিডিউল একবার নষ্ট হলে সেটি মেলানো কঠিন। তাই কাজটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। সেবার ঈদের দিনেও কাজ করেছিলেন।
ঈদের শিক্ষা
চম্পার কাছে কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি জীবনের গভীর এক শিক্ষা। ত্যাগ, ভালোবাসা আর ভাগাভাগির শিক্ষা। এই ঈদ আমাদের শেখায়, মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান জিনিসও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করতে পারে। সেই ত্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আত্মশুদ্ধি, বিনয় ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার এক সুন্দর বার্তা। কোরবানির মাধ্যমে শুধু একটি পশু উৎসর্গ করা হয় না, বরং মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাও ত্যাগের প্রতীকী চর্চাও হয়। সেই ত্যাগের আনন্দই শেষ পর্যন্ত সমাজে সহমর্মিতা, ভাগাভাগি আর মানবিকতার সম্পর্ক আরও সুন্দর করে তোলে।
হজের ঈদ
এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা তাঁর জীবনে বিশেষ আনন্দ নিয়ে এসেছে। বহুদিনের স্বপ্ন ছিল হজ পালন করার। নানা কারণে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও যাওয়া হয়নি। অবশেষে এবার সৌদি আরবে হজ পালন করতে এসেছেন। পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে আছে। মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঈদটা এবারই কাটতে যাচ্ছে। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে অন্য রকম এক অনুভূতির মধ্যে আছেন।
অনুলিখন: মনজুর কাদের



