একজন লেখকের মূল চরিত্রকে আড়াল করে তাকে অপবাদ দেওয়া কিংবা তাকে অপব্যবহার করা মূলত দুর্বৃত্তের কাজ; আর যারা এটি করে, তারা আসলে দুর্বৃত্ত। নজরুল জাতিগত বিদ্বেষের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি এমন একটি সমতার সমাজ স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে সকল জাতি এবং সকল লিঙ্গের মানুষের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ মানবিক পরিবেশ থাকবে। এই কারণেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সাথেও একাত্মতা বোধ করতেন। তাঁর সম্পাদিত ‘লাঙল’ পত্রিকা, ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা এবং তাঁর কবি-প্রতিভার মধ্যে আমরা এই বিপ্লবী চেতনার স্পষ্ট স্বাক্ষর পাই। আর এই বিপ্লবী চেতনা রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর কোনো সংঘাত তৈরি করেনি, কারণ রবীন্দ্রনাথও অন্তর্গতভাবে একজন বৈষম্যবিরোধী মানুষ ছিলেন।
নজরুলকে ব্যবহারের অপচেষ্টা
নজরুলকে সামাজিকভাবে বা সাম্প্রদায়িক উপায়ে ব্যবহার করার একটা অপচেষ্টা বহুদিন থেকেই চলছে। তবে নজরুলকে যারা যথাযথভাবে পাঠ করতে সক্ষম, তাদের পক্ষে এই ধরনের অপপ্রচার চালানো বা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, ভারত বিরোধিতা আর সাম্প্রদায়িকতা কিন্তু এক বিষয় নয়। ভারত বিরোধিতা মানে ভারতের আধিপত্যবাদ কিংবা ভারত যদি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে যৌক্তিক প্রতিবাদ করা। কিন্তু ভারত বিরোধিতার কথা বলে ফাঁকা আওয়াজ তোলা এবং তার মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ঢুকিয়ে কিংবা সাম্প্রদায়িকতার রং দিয়ে মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটাকে আড়াল করাই এই অপচেষ্টাকারীদের মূল উদ্দেশ্য। এটি মূলত দুই দেশের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকেই সহায়তা করে।
কে করছে এই অপচেষ্টা?
এই অপচেষ্টাটি বহুদিন থেকেই একশ্রেণির লোক উদ্দেশ্যমূলকভাবে করে আসছে। যাদের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ভরা এবং যারা সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারাই মূলত এগুলো প্রচার করে। অন্যদিকে, সমাজের মধ্যে এমন কিছু মানুষও থাকেন যাদের এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো সঠিক ধারণা নেই; তাদেরকে চট করে এই বাস্তব বিষয়গুলো বোঝানো সম্ভব হয় না। কিন্তু কেউ যদি যথাযথভাবে খোঁজখবর নেয় বা জানার চেষ্টা করে, তবে সে পরিষ্কার দেখতে পাবে যে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উষ্ণ।
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক
নজরুল রবীন্দ্রনাথকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর বিভিন্ন লেখালেখির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ রয়েছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথও নিজের বই নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন। নজরুল যখন জেলে বন্দী ছিলেন, তখনও রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্য লিখেছেন। যদিও দুজনের লেখার ধরন আলাদা ছিল, তবুও তাদের চিন্তার মধ্যে কিছু অভিন্ন বিষয় ছিল। যেমন—দুজনেই অত্যন্ত মানবিক ছিলেন এবং একটি মুক্তচিন্তার, মুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন; যা নানাভাবে তাদের লেখার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। নজরুল অবশ্য এসব ব্যাপারে তুলনামূলক বেশি উচ্চকিত এবং অনেক সরল ছিলেন।
লেখার বৈচিত্র্য
রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে যেখানে একটি সুগভীর ও বহমান ধারা ছিল, নজরুল সেখানে খুব কম সময়ের মধ্যেই বিষয়গুলোকে সরাসরি সামনে নিয়ে এসেছেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কিংবা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি, সেগুলোর মধ্যে পরিষ্কার দেখা যায় যে ধর্মের নামে যারা ভণ্ডামি করে কিংবা ধর্মের নামে যারা শোষণ ও নিপীড়ন চালায়, তাদের বিরুদ্ধে নজরুল সবসময় অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। হিন্দু এবং মুসলিম উভয় ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর প্রবল সমালোচনা ছিল। এখন যারা সমাজে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়, তাদের পক্ষে নজরুলকে হজম করা সম্ভব নয়; কারণ এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা নজরুলের কবিতার মধ্যেই রয়েছে।
নজরুলের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
তিনি হিন্দু নাকি মুসলিম—তা জিজ্ঞেস না করে সবাইকে মানুষ হিসেবে দেখতেন। তাঁর কবিতায় যখন তিনি বলেন—“কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র”—তখন পরিষ্কার বোঝা যায় যে, শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কথা বলার সময় তিনি তাদেরকে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে দেখেননি। বরং যারা মানুষকে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত করে দেখে, তিনি তাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি যেমন অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় ইসলামি গান লিখেছেন, ঠিক তেমনি সমান শক্তিশালীভাবে শ্যামাসংগীতও রচনা করেছেন। নজরুলের মতো এমন গভীর শ্যামাসংগীত স্বয়ং হিন্দু ধর্মের মানুষের পক্ষেও লেখা কঠিন। তিনি মূলত ইসলামি গান এবং শ্যামাসংগীত—দুটোই মানুষের ভেতরের আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার জায়গা থেকে লিখেছেন। বিষয়টি এমন নয় যে, তিনি হিন্দু ধর্মের শ্যামাসংগীত লিখে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন, কিংবা ইসলামি সংগীত লিখে হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করছেন। তাই সাম্প্রদায়িকতার কোনো দিক নজরুলের জীবন ও দর্শনের সাথে কোনোভাবেই মেলানো যায় না।
নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা
নজরুল একইসঙ্গে সাম্যবাদী ছিলেন এবং তিনি রুশ বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখালেখির মধ্যে প্রবলভাবে শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী বিষয়গুলোই প্রধান হিসেবে উঠে এসেছে। তাছাড়া নজরুলও তো ওই অঞ্চলেরই মানুষ ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথও একই অঞ্চলের মানুষ; এমন তো নয় যে নজরুল বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন। নজরুলও ওই একই অবিভক্ত অঞ্চলের মানুষ ছিলেন। ফলে বাংলা সাহিত্যের এবং এই অঞ্চলের ধারাবাহিকতায় আমরা রবীন্দ্রনাথকেও আমাদের আপন লোক মনে করি, আবার নজরুলকেও আমাদের নিজেদের লোক মনে করি। সীমান্ত দিয়ে কখনো সাহিত্যকে ভাগ করা যায় না। এই দুজনের কবিতা ও গান আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করে।
মুক্তিযুদ্ধে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের গান
এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আমরা দেখেছি যে, এই দুজনের গানই আমাদের মুক্তিসংগ্রামের একটা মস্ত বড় শক্তি হয়েছিল। তাই যারা আজ রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তারা মূলত সাম্প্রদায়িক শক্তি, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি; তারাই প্রধানত এই কাজগুলো করে থাকে। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো না বুঝে, না জেনেই তাদের পেছনে তাল দিতে পারে। তবে সামান্য একটু খোঁজখবর নিলেই স্পষ্ট দেখা যাবে যে, নজরুল হচ্ছেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং সাম্যবাদের পক্ষের একজন দৃঢ় মানুষ। তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিজের ‘গুরু’ বলতেন। এই দুজনের হাত ধরেই আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে, আমাদের চিন্তার জগৎ সমৃদ্ধ হয়েছে; এবং ভবিষ্যতেও আমাদের পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হয়ে থাকবেন এই রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল।
শ্রুতিলিখন : উমামা জামান মিম



