তাইওয়ানিজ লেখক ইয়াং শুয়াং-জির সাক্ষাৎকার: বুকার পুরস্কার ও সাহিত্য
তাইওয়ানিজ লেখক ইয়াং শুয়াং-জির সাক্ষাৎকার

ইয়াং শুয়াং-জি একজন তাইওয়ানিজ লেখক, যিনি কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, মাঙ্গা, ভিডিও গেমের স্ক্রিপ্ট এবং সাহিত্যসমালোচনা লেখেন। তার উপন্যাস ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের পাশাপাশি ২০২৪ সালে অনুবাদ সাহিত্য বিভাগে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড এবং এশিয়া সোসাইটির প্রথম বাইফাং শেল বুক প্রাইজ অর্জন করে। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে বুকার ওয়েবসাইট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন লুবাইনা খানম।

প্রশ্ন: ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ উপন্যাসটি লেখার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কী কাজ করেছে?

উত্তর: কোরিয়া ও তাইওয়ান দুটি দেশই একসময় ছিল জাপানিজ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ। কিন্তু জাপানি সাম্রাজ্যের সেই ইতিহাস নিয়ে কোরিয়ানদের মাঝে একধরনের অভিন্ন ক্ষোভ দেখতে পাওয়া যায়, অন্যদিকে তাইওয়ানিজদের মাঝে বেশ জটিল ও দ্বান্দ্বিক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখতে পাওয়া যায়, সেখানে যেমন অরুচি রয়েছে, তেমনি রয়েছে একধরনের অতীত-প্রীতি বা নস্টালজিক অনুভূতি। সাম্প্রতিক সময়ের একজন তাইওয়ানিজের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, আমি চেয়েছিলাম তাইওয়ানের মানুষ অতীতে যেই জটিল এবং দ্বান্দ্বিকতাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, তার জটগুলোকে উন্মোচন করে দেখাতে, এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের পরিস্থিতিগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম জারি রাখতে হবে সেই জায়গাগুলোকে অন্বেষণ করতে।

প্রশ্ন: উপন্যাস লেখার প্রক্রিয়াটিকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে গেলেন?

উত্তর: ২০১৭ সালের শেষার্ধের কোনো এক সময়ে আমি উপন্যাসটির খসড়া পরিকল্পনা করি এবং প্রথম অধ্যায়টি লিখি। তবে প্রকল্পটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করি ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, এবং একই বছরের ২০ আগস্ট প্রথম খসড়াটি সম্পন্ন করি। ভ্রমণ ও খাবার—উপন্যাসটির এই দুটি কেন্দ্রীয় বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমার জীবনে দুটি স্পষ্ট পরিবর্তন আসে: আমার জমানো অর্থ ভাণ্ডারে টান পড়েছে, পাশাপাশি আমার ওজনও বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশ্ন: এই বছর আন্তর্জাতিক বুকার প্রাইজের ক্যাম্পেইন ছিল 'ফিকশন বিয়ন্ড বর্ডার্স', অনূদিত কথাসাহিত্য কীভাবে পাঠকদের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বাইরে তাকাতে সাহায্য করে বলে মনে করেন? এটি আপনার দৃষ্টিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: আমার মতো কেউ, যিনি কেবল একটি ভাষাতেই পড়তে পারেন, তার বৈশ্বিক দৃষ্টির ক্ষেত্রটি অনেক বেশি সংকুচিত হয়ে উঠতো যদি অনুবাদ সাহিত্য না থাকতো, আমার ক্ষেত্রে অনুবাদ সাহিত্য যেন দ্বিতীয় এক জোড়া চোখের মতোই কাজ করে। কেবল তাই নয়, আমার কাছে অনুবাদকেরা হলেন অতি আবশ্যক পথপ্রদর্শক, যারা পাঠকের হাত ধরে অজানা, অচেনা, অপরিচিত ভূখণ্ডের দুর্গম পথে-প্রান্তরে যাত্রা জারি রাখতে সাহায্য করেন।

প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার তাদের দশম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে এ বছর, এই পুরস্কারটি গত এক দশক জুড়ে অনূদিত সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে কীভাবে ভূমিকা পালন করেছে বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: গত দশ বছর ধরে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লেখক এবং অনুবাদককে সমমর্যাদায় স্বীকৃতি প্রদান করে আসছে, সমানভাবে মূল্যায়নের জায়গাটিতে জোর দেয়ার ফলে অনূদিত সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, এবং আমি মনে করি এটি পাঠকদের প্রকৃতপক্ষেই উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে যে, সাহিত্য অনুবাদ আসলে দুজন সৃজনশীল মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই কেবল সম্ভব।

প্রশ্ন: আপনি কি আমাদের এমন কোনো বইয়ের ব্যাপারে বলতে পারেন, যেটি আপনাকে শৈশবে 'বই পড়ার'-প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে?

উত্তর: আকিরা তোরিয়ামার 'ড্রাগন বল'। ১৯৮৪ সালের দিকে এই বইটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে, যেই বছর আমি জন্মেছিলাম। এর ধারাবাহিক প্রকাশনা যখন শেষ হয় তখন আমার বয়স এগারো; সবমিলিয়ে মোট ৪২ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইটির সৃষ্টিশীল জগৎ আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে 'বই পড়তে হয়' এবং কীভাবে 'গল্প নির্মাণ করতে হয়'। একজন সৃজনশীল মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে আমার স্থির সঙ্কল্পের এটাই ছিল সূচনা বিন্দু।

প্রশ্ন: কোন বই লেখক হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল?

উত্তর: দুর্ভাগ্যবশত, নির্দিষ্ট কোনো একটা বইয়ের নাম বলতে পারছি না, তবে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানের নিজস্ব রোমান্সধর্মী উপন্যাসের জনপ্রিয়তার যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই আমাকে প্রথমবারের মতো কথাসাহিত্য লিখতে উৎসাহিত করেছিল। আমরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা সবাই মিলে ঠিক করলাম একটি 'লেখক চক্র' তৈরি করব, তাদের মাঝে আমিই একমাত্র মানুষ যে পরবর্তীতে লেখালেখি চালিয়ে গিয়েছি।

প্রশ্ন: এমন কোনো বই কি আছে যেটি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বা ভাবনার জগৎকে বদলে দিতে পেরেছে?

উত্তর: প্রায় ২ হাজার পূর্বে রচিত কনফুসিয়াসবাদের মৌলিক ভিত্তিগ্রন্থ 'The Analects'। আমি কৈশোরে পদার্পণ করে প্রথমবারের মতো বইটি পড়েছিলাম। কনফুসিয়াসবাদী চেতনাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এর চৈনিক সংস্কৃতির প্রতি আমার তীব্র অনুরাগ তৈরি হয়েছিল, এই বইটিই আমাকে কলেজে প্রবেশের পর চৈনিক সাহিত্যকে প্রধান বিষয় হিসেবে বেছে নিতে তাড়িত করেছিল। পরবর্তীতে প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায়, এই একই পাঠ্য আমার মাঝে জিজ্ঞাসা তৈরি করেছিল যে কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন শাসকগোষ্ঠী নানান ঐতিহাসিক পর্বে এই চিন্তাধারাকে নিজ স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করেছে।

প্রশ্ন: মান্দারিনে লেখা কোন বইটি প্রত্যেক চৈনিকের পড়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: কোনো একক সুনির্দিষ্ট বইয়েরই অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত বলে আমি বিশ্বাস করি না। তবে চৈনিক ভাষাভাষী কিংবা বিভিন্ন সংস্কৃতির চৈনিক অক্ষর ব্যবহারকারীদের মাঝে যারা জগৎকে বুঝতে চায় বা বিশ্ববীক্ষা তৈরি করতে চায়—তাদের জন্য 'Analects' হতে পারে বিশ্বদর্শনকে বোঝার একটি দারুণ উৎস। আমি তাদেরকে পরামর্শ দেব এটিকে সংশয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করতে।

প্রশ্ন: কোন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার মনোনীত বই সবার পাঠ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: আমি আবারও আমার পূর্ববর্তী প্রশ্নটির মতোই বলব, কোনো একক বইকেই আমি সকলের জন্য অবশ্য পাঠ্য বলে মনে করি না। কিন্তু উ মিং-ই রচিত 'The Stolen Bicycle' উপন্যাসটি আমার ব্যক্তিগতভাবে বেশ পছন্দ। ড্যারিল স্টার্ক অনূদিত এই উপন্যাসটি ২০১৮ সালে বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় জায়গা পেয়েছিল, ভীষণ চমৎকার একটি উপন্যাস।