আজকের দিনে অনেক নারী তারকা নিজের সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিজীবন কিংবা পেশা নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন। কিন্তু ১৯৩০–৪০-এর দশকের ভারতে, যখন মেয়েদের অভিনয়ে আসাটাই ছিল একপ্রকার ‘সামাজিক বিদ্রোহ’, তখন লীলা চিটনিস হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক ভারতীয় নারীর প্রতীক।
প্রথম জীবন ও শিক্ষা
১৯০৯ সালে কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে জন্ম নেওয়া লীলা চিটনিসের বাবা ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। সে সময় ভারতীয় সমাজে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা প্রায় বিরল ঘটনা ছিল। কিন্তু লীলা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রি অর্জন করেন—যা সেই যুগে একজন নারীর জন্য বিশাল অর্জন।
বিয়ে ও সংসার জীবন
মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের পছন্দে তাঁর বিয়ে হয় চিকিৎসক গজানন যশবন্ত চিটনিসের সঙ্গে। দুজনেই ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী পরিবার থেকে এলেও দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। বিয়ের পর খুব দ্রুত চার সন্তানের মা হন লীলা। তখনকার ভারতীয় সমাজে নারীর কাজ বলতে সংসার, সন্তান আর স্বামীর সেবা—এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু লীলার ভেতরে ছিল অন্য এক সত্তা। সাহিত্য, নাটক আর অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছিল।
অভিনয়ে আগমন
১৯৩০-এর দশকে ভারতীয় সিনেমা তখনো গড়ে উঠছে। সম্মানিত পরিবারের মেয়েরা অভিনয়ে আসতেন না বললেই চলে। অভিনেত্রীদের সমাজ ‘ভালো চোখে’ দেখত না। সেই সময়ে লীলা চিটনিসের অভিনয়ে আসা ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। লীলা প্রথমে থিয়েটারে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে সুযোগ পান। তাঁর অভিনয়ে ছিল শিক্ষিত, মার্জিত ব্যক্তিত্বের ছাপ—যা সে সময়ের দর্শকের কাছে নতুন মনে হয়েছিল। খুব দ্রুতই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
বম্বে টকিজ ও অশোক কুমারের সাথে জুটি
লীলা চিটনিসের ক্যারিয়ারে বড় বাঁক আসে বম্বে টকিজের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে। সে সময় বম্বে টকিজ ছিল ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টুডিওগুলোর একটি। লীলা চিটনিস সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন অশোক কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে। তাঁদের জুটি সে সময় বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে তাঁরা ছিলেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম সফল রোমান্টিক জুটি। সে সময়ের ভারতীয় সিনেমায় নারীদের চরিত্র অনেকটাই একমাত্রিক ছিল। কিন্তু লীলা পর্দায় আনলেন আত্মবিশ্বাসী, শিক্ষিত ও আবেগপ্রবণ আধুনিক নারীর চিত্র। তাঁর অভিনয় ছিল সংযত, স্বাভাবিক এবং নাটকীয়তাহীন—যা পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেত্রীদের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।
ভারতের প্রথম ‘লাক্স গার্ল’
আজ বলিউড তারকারা বড় বড় ব্র্যান্ডের মুখ হন—এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংস্কৃতির শুরুর দিককার অন্যতম মুখ ছিলেন লীলা চিটনিস। ১৯৪১ সালে তিনি হন ভারতের প্রথম ‘লাক্স’ মডেল। সেই সময় কোনো নারী তারকার প্রসাধনীর ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে আসা ছিল বিরাট ঘটনা। তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে তাঁকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় চলচ্চিত্র তারকাদের ব্যবহার করে ব্র্যান্ড প্রচারের নতুন ধারা শুরু হয়। পরে এই ধারায় যুক্ত হন মধুবালা, হেমা মালিনী, শ্রীদেবী থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের বহু তারকা।
ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম
পর্দায় সফল হলেও ব্যক্তিজীবনে সুখী ছিলেন না লীলা চিটনিস। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তাঁর স্বামী মদ্যপ ছিলেন এবং সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত। শেষ পর্যন্ত তিনি স্বামীর থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আজকের দিনে বিবাহবিচ্ছেদ সাধারণ ঘটনা হলেও ১৯৪০-এর দশকে একজন ভারতীয় নারীর জন্য এই সিদ্ধান্ত ছিল ভয়ংকর কঠিন। বিশেষ করে চার সন্তানের মা হয়ে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসা সমাজ সহজভাবে নেয়নি। কিন্তু লীলা থামেননি। তিনি নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন এবং ক্যারিয়ারে আরও উঁচুতে উঠেছেন। সেই অর্থে তিনি ছিলেন ভারতীয় বিনোদনজগতের প্রথম দিককার ‘সিঙ্গেল মাদার আইকন’দের একজন।
অভিনেত্রী থেকে ‘মা’ চরিত্রে
সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সিনেমা, বদলে যায় নায়িকার বয়সও। কিন্তু সবাই সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। লীলা চিটনিস পেরেছিলেন। ১৯৫০-এর দশক থেকে তিনি ধীরে ধীরে মায়ের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। ভারতীয় সিনেমায় ‘মা’ চরিত্রকে আবেগের এক বিশেষ জায়গায় নিয়ে যেতে তাঁর ভূমিকা ছিল বড়। লীলা বহু জনপ্রিয় তারকার মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তাঁর মুখে ছিল কোমলতা, কণ্ঠে ছিল মমতা, আর অভিনয়ে ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। ফলে দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘চিরন্তন ভারতীয় মা’-এর প্রতীক। পরবর্তী সময়ে নিরুপমা রয় বা রাখী গুলজার পর্দায় যেভাবে মাতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর আগের প্রজন্মে সেই জায়গা তৈরি করেছিলেন লীলা চিটনিস।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
লীলা চিটনিসের শেষ জীবনও সুখের ছিল না। একসময় যাঁর জনপ্রিয়তায় সিনেমা হল ভরে যেত, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধীরে ধীরে বিস্মৃত হতে থাকেন। জীবনের শেষ সময়ে লীলা যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানেই দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আলঝেইমার রোগেও ভুগেছিলেন বলে জানা যায়। ২০০৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এত বড় অবদান রাখার পরও নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁর নাম জানেন না।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে



