‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ বুকার পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়লো
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ বুকার জিতে ইতিহাস গড়লো

‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়েছে। এই প্রথম মান্দারিন ভাষায় লেখা কোনো উপন্যাস আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার পেয়েছে। লেখক ইয়াং শুয়াং-জি ও অনুবাদক লিন কিং যৌথভাবে এই সম্মাননা অর্জন করেছেন। বুধবার লন্ডনের টেট মডার্নে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড সমানভাবে ভাগ করে নেবেন লেখক ও অনুবাদক।

বিচারকমণ্ডলীর মূল্যায়ন

বিচারকমণ্ডলীর প্রধান নাতাশা ব্রাউন বলেন, “তাইওয়ান ট্রাভেলগ একসঙ্গে দুটি অসাধারণ কাজ করেছে, উপন্যাসটি একদিকে যেমন প্রেমের উপন্যাস, অন্যদিকে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন পোস্টকলোনিয়াল বিশ্লেষণও। এর বহুস্তরীয় নির্মাণ নিয়ে বিচারকদের মধ্যে সমৃদ্ধ আলোচনা হয়েছে। উপন্যাসটি মোহময় এবং সূক্ষ্মভাবে পরিশীলিত।”

কেন জয়ী হলো ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’?

নাতাশা ব্রাউন বলেন, “ভালোবাসা কি ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাকে অতিক্রম করতে পারে? ১৯৩০-এর দশকে জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা তাইওয়ানের প্রেক্ষাপটে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ এই প্রশ্নের জটিল দিকগুলোকে অনুসন্ধান করেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উপন্যাসে দেখা যায়, জাপানের লেখক আওয়ামা এবং তার তাইওয়ানি দোভাষী চিজুরু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তাইওয়ান সফরে বের হন। প্রথম দেখাতেই দুই নারীর মধ্যে আকর্ষণ তৈরি হয়। কিন্তু তাদের সম্পর্কের ভেতরে থাকা ক্ষমতার অসমতা ধীরে ধীরে জটিল আকার নিতে থাকে। চিজুরু রহস্যময় ও মোহনীয়, কিন্তু পুরোপুরি অধরা। আওয়ামা বারবার তার পেশাদারিত্বের মুখোশ ভেদ করার চেষ্টা করলেও চিজুরু নিজেকে আড়ালেই রাখে।

উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদের জটিলতাকেও গল্পের অংশ করে তুলেছে। ভূমিকা, ফুটনোট ও পরিশিষ্টের মতো বিষয়গুলো মূল প্রেমকাহিনিকে মেটাফিকশনাল স্তর দিয়েছে। লিন কিংয়ের অনুবাদ উপন্যাসটির নানা বর্ণনাভঙ্গির সূক্ষ্মতা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কী নিয়ে ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’?

এই উপন্যাস মূলত দুই নারীর প্রেম, ভাষা, ইতিহাস ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে রচিত এক মর্মস্পর্শী গল্প।

সময় ১৯৩৮ সালের মে মাস। তরুণ লেখক আওয়ামা চিজুকো জাপানের নাগাসাকি থেকে জাহাজে করে তাইওয়ানে আসেন। জাপানি ঔপনিবেশিক সরকারের আমন্ত্রণে এলেও তাদের রাজনৈতিক আয়োজন বা সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে তার আগ্রহ নেই। বরং তিনি তাইওয়ানের প্রকৃত জীবনযাপন ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে চান। শিগ্‌গিরই তার দোভাষী হিসেবে নিয়োগ পান আরেক তরুণী তাইওয়ানি নারী চিজুরু। বুদ্ধিমতী, যত্নশীল ও আকর্ষণীয় এই তরুণী চিজুকোর ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তোলে। ট্রেনযাত্রা, ব্রেইজড পোর্ক রাইস, শীতল তরমুজ চা আর দীর্ঘ আলাপের ভেতর দিয়ে চিজুকো ধীরে ধীরে তার প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু চিজুরু সবসময় একটি দূরত্ব বজায় রাখে। বিচ্ছেদের পরই চিজুকো বুঝতে পারেন, সেই দূরত্বের পেছনে কী কারণ ছিল।

লেখক ও অনুবাদক কারা?

ইয়াং শুয়াং-জি একাধারে কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, মাঙ্গা ও ভিডিয়ো গেম স্ক্রিপ্ট লেখক এবং সাহিত্যসমালোচক। তাইওয়ান ট্রাভেলগ তার প্রথম উপন্যাস। এর আগে উপন্যাসটি ২০২৪ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেটেড লিটারেচার এবং এশিয়া সোসাইটির বাইফাং শেল বুক প্রাইজও জিতেছিল। বইটি ইতোমধ্যে জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান, ইতালীয়, ডাচ, ড্যানিশসহ বহু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে বা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

লিন কিং তাইওয়ানিজ-আমেরিকান লেখক ও অনুবাদক। বর্তমানে তিনি তাইপে ও নিউইয়র্কে বসবাস করেন। তার গল্প বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি পেন/ডাউ ছোটোগল্প পুরস্কার পেয়েছেন। ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ ছাড়াও তিনি ‘দ্য বয় ফ্রম ক্লিয়ারওয়াটার’ গ্রাফিক নভেল সিরিজ অনুবাদ করেছেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘উইব’ শিগ্‌গিরই প্রকাশিত হবে।

লেখক ও অনুবাদকের অনুভূতি

ইয়াং শুয়াং-জি বলেন, “কোরিয়া ও তাইওয়ান দুটি দেশই একসময় জাপানি সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল। কিন্তু কোরিয়ানদের মধ্যে সেই ইতিহাস নিয়ে স্পষ্ট ক্ষোভ থাকলেও তাইওয়ানিদের অনুভূতি অনেক বেশি দ্বিধামিশ্রিত, বিরক্তিকর ও নস্টালজিয়ার সংমিশ্রণ। সমকালীন তাইওয়ানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমি সেই জটিল অতীতকে বোঝার চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতে আমাদের কেমন সমাজ গড়া উচিত, তা অনুসন্ধান করেছি।” তিনি আরও বলেন, “২০১৭ সালের শেষ দিকে উপন্যাসটির পরিকল্পনা করি। ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে লেখা শুরু করি এবং একই বছরের ২০ আগস্ট প্রথম খসড়া শেষ হয়। ভ্রমণ ও খাবার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমার জীবনে দুটি বড় পরিবর্তন এসেছে—সঞ্চয় কমেছে, ওজন বেড়েছে।”

লিন কিং বলেন, “জাপানি শাসনে তাইওয়ানের মানুষ নিপীড়িত হয়েছিল, এটা সত্যি। কিন্তু তাই বলে তাদের পরিচয় বা ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি মুছে যায়নি। সেখানে এখনও হাসি, খাবার, সিনেমা, স্কুল, ছোটোখাটো ঝগড়া ও প্রেম ছিল। অন্যভাবে দেখানো মানে একটি সংস্কৃতিকে কেবল তার ট্রমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলা। ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।”

সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া

দ্য আটলান্টিকে টালিয়া জ্যাক্স লিখেছেন, “বহুস্তরীয় ব্যাখ্যা গল্পটির আবেগীয় কেন্দ্রকে যেমন দূরবর্তী করে তোলে, তেমনি পাঠক যখন সেখানে পৌঁছায়, অভিজ্ঞতাটি আরও গভীর হয়ে ওঠে।”

ওয়াশিংটন ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউ অব বুকসের মার্সি গেফনার লিখেছেন, “‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ শুধু খাদ্যরসিক বা ভ্রমণপিপাসুদের গল্প নয়; উপন্যাসটি দুই নারীর হৃদয়ে প্রবেশের যাত্রা, যারা হয়তো প্রেম ও সামাজিক বৈষম্যের ব্যবধানকে মেলাতে পারবে, হয়তো পারবে না।”

ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডার্সের লরেন ইউ-টিং বো লিখেছেন, “‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ তাইওয়ানের জটিল ইতিহাসকে নির্ভীকভাবে ধারণ করেছে। জাপানি ঔপনিবেশিক সময়ের সাংস্কৃতিক মিশ্রণ যেমন এতে উঠে এসেছে, তেমনি সেই সময়ের মানুষের কঠিন সামাজিক অভিজ্ঞতাও ধরা পড়েছে।”