মহাকাশের ছবি বা ভিডিওতে সাদা রঙের বিশাল পোশাক পরে নভোচারীরা শূন্যে ভাসছেন বা চাঁদের বুকে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছেন। এই বিশেষ পোশাককে বলা হয় স্পেসস্যুট, যা মহাকাশের চরম প্রতিকূল পরিবেশে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু একটি স্পেসস্যুটের ওজন কত? এত বিশাল পোশাক পরে নভোচারীরা কীভাবে হাঁটাচলা করেন?
স্পেসস্যুটের ওজন নির্ভর করে নকশা ও ব্যবহারের স্থানের ওপর
এই প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই। স্পেসস্যুটের ওজন নির্ভর করে এর নকশা এবং এটি কোথায় ব্যবহার করা হবে, তার ওপর। মহাকাশযাত্রার ধরন ও গন্তব্য অনুযায়ী স্পেসস্যুটের কাজ ও গঠন বদলে যায়, সঙ্গে বদলে যায় ওজনও।
প্রথম দিকের স্পেসস্যুট ছিল হালকা
মহাকাশ অভিযানের শুরুতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারীদের মহাকাশযান থেকে বাইরে বেরোনোর পরিকল্পনা ছিল না। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল নভোযানের ভেতরে মিশন শেষ করে পৃথিবীতে ফিরে আসা। তাই তাঁদের স্পেসস্যুটগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে হালকা, মূলত বিমানের পাইলটদের ফ্লাইট প্রেসার স্যুটের পরিমার্জিত রূপ। এই ধরনের একটি স্যুটের ওজন ছিল মাত্র ১০ কেজির কাছাকাছি। নভোযানের ভেতরে বায়ু চাপ কমে গেলে বা জরুরি অবস্থায় এই পোশাক নভোচারীদের সুরক্ষা দিত।
মহাকাশে হাঁটার জন্য ভারী স্পেসস্যুট
পরিস্থিতি বদলে যায় যখন নভোচারীরা নভোযানের সুরক্ষিত ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে শূন্য মহাকাশে ভাসার বা চাঁদের বুকে হাঁটার পরিকল্পনা করেন। মহাকাশের বাইরে বায়ুমণ্ডল নেই, আছে চরম তাপমাত্রা, বায়ুশূন্যতা এবং মারাত্মক মহাজাগতিক বিকিরণ। এগুলো থেকে বাঁচতে স্পেসস্যুটে অনেকগুলো সুরক্ষামূলক স্তর বা লেয়ার থাকে, ফলে স্যুট কয়েক গুণ ভারী হয়ে ওঠে।
অ্যাপোলো স্পেসস্যুটের ওজন ৮২ কেজি
অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যে স্পেসস্যুট পরে চাঁদের বুকে হেঁটেছিলেন, পৃথিবীতে তার ওজন ছিল প্রায় ৮২ কেজি। এর মধ্যে পোশাক, পিঠে বাঁধা লাইফ-সাপোর্ট ব্যাকপ্যাক এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্যাকপ্যাকটি নভোচারীকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিত, কার্বন ডাই-অক্সাইড ফিল্টার করত এবং শরীর ঠান্ডা রাখত। ৮২ কেজি মানে প্রায় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওজনের সমান, যা পিঠে নিয়ে পৃথিবীতে হাঁটাচলা প্রায় অসম্ভব।
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণে ওজন কমে যায়
নভোচারীরা চাঁদে সহজে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতে পেরেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের কারণে। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যে স্পেসস্যুটের ওজন ৮২ কেজি, চাঁদের বুকে তার ওজন দাঁড়ায় মাত্র ১৩.৬ কেজির মতো। এত ভারী পোশাক পরা সত্ত্বেও অ্যাপোলো নভোচারীরা খুব সহজেই চাঁদের পৃষ্ঠে ঘুরে বেড়াতে পেরেছিলেন।
আধুনিক স্পেসস্যুট হালকা ও নমনীয়
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্পেসস্যুট তৈরির উপকরণেরও উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যে আধুনিক স্পেসস্যুটগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো অ্যাপোলো আমলের মতো বিশাল বা ভারী নয়। উন্নত উপাদানের কারণে এগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়। মহাকাশ স্টেশন পৃথিবীর কক্ষপথে ভাসমান অবস্থায় থাকায় সবকিছু ওজনহীন, তাই স্পেসস্যুটের ভর যা-ই থাকুক, শূন্য মাধ্যাকর্ষণে নভোচারীদের কোনো ওজন অনুভব করতে হয় না।
মঙ্গলে অভিযানের জন্য হালকা স্পেসস্যুটের প্রয়োজন
মহাকাশ প্রকৌশলীদের আসল চ্যালেঞ্জ এখন মঙ্গল গ্রহকে ঘিরে। মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ বল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রায় ৩৮ শতাংশ, যা চাঁদের অর্ধেকেরও বেশি শক্তিশালী। একটি ৮২ কেজির স্যুট মঙ্গলে প্রায় ৩১ কেজির মতো ভারী মনে হবে, যা নিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা হাঁটাচলা বা ভূতাত্ত্বিক গবেষণা করা অত্যন্ত কষ্টকর। এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৌশলীরা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের, ওজনে অনেক হালকা স্পেসস্যুট তৈরি করার কাজ করছেন। এই নতুন প্রজন্মের স্পেসস্যুটগুলোতে উন্নত উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নভোচারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি নড়াচড়াকে আরও সহজ করবে। ভবিষ্যতে যখন মানুষ মঙ্গলের লাল মাটিতে পা রাখবে, তখন এই হালকা ও অত্যাধুনিক স্পেসস্যুটগুলোই হবে তাদের বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস



