ইলন মাস্ক এখন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার
ইলন মাস্ক এখন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার

শুক্রবার ইলন মাস্কের মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোম্পানি স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে রেকর্ড-ভাঙা অভিষেক হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা লাখ কোটি ডলারের মালিক হয়েছেন ইলন মাস্ক।

বর্তমান সম্পদের পরিমাণ

ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১১ হাজার কোটি ডলার। তিনি অনেক দিন ধরেই বিশ্বের শীর্ষ ধনী। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন, অ্যামাজনের জেফ বেজোস ও ফরাসি বিলাসপণ্যের গ্রুপ এলভিএমএইচের প্রধান বার্নার্ড আর্নল্টের মতো ধনকুবেরদের আরও ছাড়িয়ে গেছেন।

উত্থানের ইতিহাস

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে প্রযুক্তিজগতে প্রথম আলোড়ন সৃষ্টি করেন মাস্ক। তবে তিনি সব সময় ধনীদের তালিকার শীর্ষে ছিলেন না। তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, গত ছয় বছরে উল্কার গতিতে ইলন মাস্কের উত্থান হয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বিশ্বের ৩৫তম ধনী ব্যক্তি ছিলেন তিনি, তখন তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত সাড়ে ছয় বছরে তাঁর সম্পদমূল্য বেড়েছে ৩৮ গুণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু ওই বছর থেকেই তাঁর সম্পদ লাফিয়ে বাড়তে থাকে। সে বছর মাস্কের দুটি বড় কোম্পানি—বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলা এবং মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের শেয়ারমূল্য দ্রুত বাড়তে শুরু করে। দুটি কোম্পানিতেই মাস্কের বড় অংশীদারত্ব আছে।

উত্থান-পতনের গল্প

টেসলার শেয়ারদরের ওঠানামা, স্পেসএক্সের বাড়তি মূল্য ও ট্রাম্প প্রশাসনে মাস্কের দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে মাস্কের চলার পথ বেশ নাটকীয়। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির খেতাব পান ইলন মাস্ক। সেবার তিনি ক্ষণিকের জন্য জেফ বেজোসকে ছাড়িয়ে যান। এরপর সময়-সময় তাঁর উত্থান-পতন হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাস্ক যখন বেজোসকে ছাড়িয়ে প্রথম বিশ্বের শীর্ষ ধনী হন, তখন তাঁর সম্পদমূল্য ছিল ১৯৫ বিলিয়ন বা ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এরপর সে বছর টেসলার শেয়ারদর বাড়লে নভেম্বর মাসে তাঁর সম্পদমূল্য বেড়ে হয় ৩৪০ বিলিয়ন বা ৩৪ হাজার কোটি ডলার।

এরপর মাস্কের সম্পদমূল্য কমে যায়। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে যখন টুইটার কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়, তখন তাঁর সম্পদমূল্য ২০৪ বিলিয়ন বা ২০ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর সম্পদমূল্য কমে হয় ১২৪ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এক বছরে মাস্কের সম্পদমূল্য ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি কমে যায়। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন নির্বাচনের সময় মাস্কের সম্পদমূল্য ছিল ২৬৪ বিলিয়ন বা ২৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের মে মাসে যখন তিনি ট্রাম্প প্রশাসন ছেড়ে আসেন, তখন তাঁর সম্পদমূল্য ৩৮৭ বিলিয়ন বা ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন স্পেসএক্সের আইপিও বাজারে আসার খবর বেরোয়, তখন মাস্কের সম্পদমূল্য ৬৩৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে স্পেসএক্স ও এক্সএআই একীভূত হওয়ার সময় মাস্কের সম্পদমূল্য ছিল ৬৭০ বিলিয়ন বা ৬৭ হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ছাড়ার পর মাস্কের সম্পদমূল্য উল্কার গতিতে বেড়েছে।

মহামারির সময় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যে বাড়বাড়ন্ত হয়, তার সুফল পেয়েছেন মাস্ক। তবে ২০২২ সালে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম পড়ে গেলে তাঁর সম্পদমূল্যে ভাটা পড়ে। আবার ২০২৫ সালের শুরুতেও মাস্কের সম্পদমূল্য অনেকটা কমে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ থেকে টেসলার শেয়ারদর কমে যায়।

কিন্তু প্রতিবারই মাস্ক আরও শক্তি নিয়ে ফিরেছেন। এখন ট্রিলিয়নিয়ার মাস্ক তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ল্যারি পেজের চেয়ে প্রায় চার গুণ এবং মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি ধনী।

সম্পদের প্রকৃতি

মনে রাখা জরুরি, মাস্কের সম্পদ মূলত শেয়ার সম্পদ। এই সম্পদের মূল্য বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে নিজের এক্সে অ্যাকাউন্টে এই প্রযুক্তি মোগল বলেন, তাঁর নিট সম্পদের ‘শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম’ নগদে অর্থে আছে।

বর্তমানে টেসলায় মাস্কের অংশীদারত্ব ১২ শতাংশ, স্পেসএক্সে ৪২ শতাংশ। তাঁর অনেক শেয়ার আবার ব্যক্তিগত ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা হয়েছে। নগদের বদলে কাগজের সম্পদের ওপর এমন নির্ভরতা একধরনের অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে এই প্রযুক্তি গুরুর ছোট ব্যবসায়ও অংশীদারত্ব আছে, এর মধ্যে টানেল নির্মাণকারী দ্য বোরিং কোম্পানি ও নিউরালিংক উল্লেখযোগ্য।

প্রযুক্তি খাতের প্রভাব

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা আর্থিক ও শিল্পের মতো খাতে সম্পদ গড়েছেন। কিন্তু এখনকার ধনীদের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৫ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর মধ্যে মাত্র দুজন ছিলেন প্রযুক্তিজগতের। এখন সেই সংখ্যা সাত, আর শীর্ষ ছয়জনই প্রযুক্তি খাতের।