চাঁদে যাওয়া কি সত্যি নাকি নকল? ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সত্যতা
চাঁদে যাওয়া কি সত্যি নাকি নকল? ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সত্যতা

মানুষ শুধু চাঁদে যায়নি, গাড়িও চালিয়েছে। ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিনকে চাঁদে পাঠাতে নাসার প্রায় চার লাখ কর্মী আর ঠিকাদারের একসঙ্গে কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু এই পুরো ঘটনা একটি সাজানো নাটক, এমন ধারণা ছড়িয়ে দিতে একজন লোকের চেষ্টাই যথেষ্ট ছিল। যাঁর নাম বিল কেইসিং। এই লোকের কারণেই এখনো বহু মানুষ মনে করে, চাঁদে যাওয়া বুঝি একটা সাজানো নাটক। কথায় কথায় বলে, ‘আমার মনে হয়…মানুষ চাঁদে যায়নি।’

বিল কেইসিং ও তাঁর তত্ত্ব

শুরুতে চাঁদে না যাওয়ার ধারণাটি ছিল কেইসিংয়ের ‘মনে হচ্ছে’ বা ‘অনুভূতি’, যা পরে হয়ে যায় কেইসিংয়ের ‘দৃঢ় বিশ্বাসে’। তাঁর মনে হয়েছিল, চাঁদে যাওয়ার (কিংবা অন্তত চাঁদ থেকে নিরাপদে ফিরে আসা) মতো কারিগরি সক্ষমতা আমেরিকার নেই। কেইসিং আসলে আমেরিকার মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে কিছুটা যুক্তও ছিলেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি ‘রকেটডাইন’ নামক একটি সংস্থায় কাজ করেছিলেন, যারা স্যাটার্ন ফাইভ রকেটের ইঞ্জিন নকশায় সহায়তা করেছিল। ১৯৭৬ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার নাম ছিল আমরা কখনো চাঁদে যাইনি: আমেরিকার তিন হাজার কোটি ডলারের জালিয়াতি। নিম্নমানের ফটোকপি আর অদ্ভুত সব তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি তাঁর বিশ্বাসের সপক্ষে প্রমাণ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, তাঁর সেই ধারণাগুলো আজ পর্যন্ত হলিউডের সিনেমা, ফক্স নিউজের তথ্যচিত্র, রেডিট বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে টিকে আছে।

চন্দ্রাভিযানের প্রমাণ

চন্দ্রাভিযানের সপক্ষে পাহাড়সম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ কখনো বিশ্বাস করে না যে মানুষ চাঁদে গিয়েছে। যেমন চাঁদে ছয়টি অভিযানে সংগৃহীত হয়েছে ৩৮২ কেজি চাঁদের মাটি। রাশিয়া, জাপান ও চীন সেই মাটি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছে, এটি চাঁদের মাটি। নাসার লুনার রিকনসেন্স অরবিটারের পাঠানো ছবিগুলোতে মহাকাশচারীদের পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। তবু চাঁদ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জনপ্রিয়তা ১৯৬৯ সালের পর থেকে কেবল বেড়েছেই। যারা পৃথিবীকে চ্যাপ্টা বা ফ্ল্যাট আর্থ মনে করে কিংবা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকে অস্বীকার করে, তাদের কাছে চন্দ্রাভিযান ভুয়া হওয়াটা কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। তারা একে অকাট্য সত্য মনে করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আধুনিক সংশয়বাদ

পডকাস্টের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব জো রোগান কিংবা ইউটিউবার শেন ডসনও এই সংশয়বাদীদের দলে আছেন। এমনকি কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির এক সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক তাঁর ছাত্রদের কাছে দাবি করেছিলেন, চাঁদে নামার ঘটনাটি ছিল মিথ্যা। কেইসিং যখন ফটোকপির মাধ্যমে বিশ্বকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন, এখনকার ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা সেই তুলনায় অনেক এগিয়ে। তারা এখন ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে অদ্ভুত সব যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে।

আসলে এখন ইন্টারনেটের কারণে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে যা খুশি বলার সুযোগ পায়। ইন্টারনেট যত অবাধ হয়েছে, তত বেশিসংখ্যক মানুষ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভালোবেসেছে। এখন যেকোনো বড় কিছু ঘটুক না কেন, কেউ না কেউ এর উল্টো ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেই।

যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি

যুক্তরাজ্যের মানুষেরাও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। যুক্তরাজ্যের এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এক অতিথি দাবি করেছিলেন, কেউ চাঁদে হাঁটতে পারে না; কারণ, চাঁদ আসলে আলো দিয়ে তৈরি! এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ছয়জন ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে একজন মনে করেন, চন্দ্রাভিযানটি সাজানো ছিল। ২৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এই বিশ্বাস সবচেয়ে প্রবল।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মূল প্রশ্ন

কেইসিংয়ের সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই আজকের অবিশ্বাসের পেছনে আছে। যেমন ছবিতে কেন কোনো নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে না? ল্যান্ডিং মডিউলের নিচে কেন কোনো গর্ত নেই? কিংবা ছায়াগুলো কেন অদ্ভুতভাবে পড়েছে? যারা বিষয়টি বোঝেন, তাঁরা এসব ‘অসংগতি’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করেছেন। ক্যামেরা এক্সপোজারের সময় কিংবা শূন্যস্থানে বাতাসের অভাবই যে এসবের কারণ, তা তাঁরা বারবার দেখিয়েছেন। কিন্তু ২০০৫ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত কেইসিং তাঁর দাবিতে অটল ছিলেন। তাঁর মতে, পুরো বিষয়টি একটি স্টুডিওতে ধারণ করা জালিয়াতি। তিনি বলতেন, নাসার ব্যবস্থাপনা চাঁদে যাওয়ার আগপর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সেখানে ১৯৬৯ সালের পর হঠাৎ করেই একের পর এক মানব মিশন সফল হওয়াটা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব।

কেইসিং একটি বিষয়ে অন্তত ঠিক ছিলেন। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘স্পুতনিক–১’ উৎক্ষেপণ করে, তখন আমেরিকার মহাকাশ কর্মসূচি বলতে গেলে অস্তিত্বহীন ছিল। ১৯৬১ সালে জন এফ কেনেডি যখন ঘোষণা দিলেন, এই দশকের মধ্যেই মানুষ চাঁদে পৌঁছাবে, তখন বিষয়টি অবাস্তব মনে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি নাসা আমেরিকার বাজেটের ৪ শতাংশের বেশি ব্যয় করছিল। কিন্তু যখন সোভিয়েতরা মহাকাশে প্রথম নারী পাঠানো কিংবা প্রথম মহাকাশে হাঁটার মতো একের পর এক সাফল্য পাচ্ছিলেন, তখন আমেরিকানরা বেশ কিছু বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। যার মধ্যে অ্যাপোলো–১ মিশনে তিন মহাকাশচারীর মৃত্যু ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

২০২৬ সালের আধুনিক স্পেশাল ইফেক্ট প্রযুক্তি কোন পর্যায়ে গেছে, সেটা আমরা হলিউডের বহু মুভির মধ্যেই দেখি। স্ট্যানলি কুবরিকের ১৯৬৮ সালের সিনেমা ২০০১: আ স্পেস ওডিসি দেখলে বোঝা যাবে, তখনকার হলিউডে স্পেশাল ইফেক্ট কতটা সীমাবদ্ধ ছিল। সেটি ছিল এখনকার তুলনায় বেশ কাঁচা হাতের কাজ। ১৯৬৯ সালে নাসার কাছে তাই এমন কোনো স্পেশাল ইফেক্ট ছিল না, যা চাঁদে নামার ভিডিও নিখুঁত করে দেখাতে পারে। চাঁদে নামার ঘটনা ৬০ কোটি মানুষ টেলিভিশনে দেখেছিলেন। তাঁদের একজনও কোনো খুঁত ধরতে পারেননি। তাই যুক্তিটা হলো, স্টুডিওতে তখন সাজানো নাটক করার চেয়ে আসলে সরাসরি চাঁদে গিয়েই ভিডিও করা সহজ ছিল।

ফক্স নিউজের ভূমিকা

১৯৮৮ সালের এক সংবাদপত্রের অদ্ভুত খবর ছিল ‘চাঁদে মিলল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমারু বিমান’। সেটা বাদে চন্দ্রাভিযান নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আসলে আধুনিক যুগে প্রবেশ করে ২০০১ সালে। ওই বছর ফক্স নিউজ আমরা কি আসলেই চাঁদে নেমেছিলাম? শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র প্রচার করে। এক্স-ফাইলস–খ্যাত অভিনেতা মিচ পিলেগি সেটি উপস্থাপনা করেন। যেখানে পুরোনো সেই দাবিগুলোই নতুনভাবে দর্শকদের সামনে আনা হয়েছিল। সে সময় নাসার কর্মী লনিয়াস সেই যন্ত্রণার কথা মনে করে বলেছিলেন, ‘বহু বছর আমরা এসব কথায় কান দিইনি। কিন্তু ফক্স নিউজ যখন সরাসরি দাবি করে বসল যে আমরা চাঁদে নামিনি, তখন প্রশ্ন আর অভিযোগের পাহাড় জমে গেল।’

আশ্চর্যের বিষয় হলো, নাসার কাছে ফোনগুলো ষড়যন্ত্রকারীদের কাছ থেকে আসছিল না, আসছিল উদ্বিগ্ন অভিভাবক আর শিক্ষকদের কাছ থেকে। তাঁরা বলছিলেন, ‘আমার সন্তান টিভিতে এসব দেখেছে, আমি এখন তাকে কী উত্তর দেব?’ এরপর কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাসা একটি ওয়েবসাইট খোলে এবং শিক্ষকদের জন্য কিছু তথ্য ও উপকরণ সেখানে দিতে শুরু করে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের স্থায়িত্ব

ফক্স নিউজের ওই অনুষ্ঠানে দাবি করা হয়েছিল, ২০ শতাংশ আমেরিকান চন্দ্রাভিযানকে মিথ্যা মনে করে। লনিয়াসের মতে, সাধারণ জরিপে এই হার ৪ থেকে ৫ শতাংশের বেশি হয় না। তবে প্রশ্ন ঘুরিয়ে–পেঁচিয়ে করলে অনেক সময় চমকপ্রদ ফলাফল পাওয়া যায়। সিরিয়াস কোনো পত্রিকা কিংবা সিনেমার ছোট একটি মন্তব্যও অনেক সময় মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়। যেমন ক্রিস্টোফার নোলানের ইন্টারস্টেলার সিনেমায় দেখা যায়, একজন স্কুলশিক্ষক বলছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধে জেতার জন্য চন্দ্রাভিযানের নাটক করা হয়েছিল। সিনেমার একটি ছোট সংলাপ হলেও এটি মানুষের মনে বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।

দ্য মুন: আ হিস্ট্রি ফর দ্য ফিউচার বইয়ের লেখক অলিভার মর্টনের মতে, এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব টিকে থাকাটা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। যখন সামনে প্রচুর প্রমাণসহ একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা (অ্যাপোলো–১১) আর কোনো প্রমাণ ছাড়া একটি বিশ্বাসযোগ্য তত্ত্ব (জালিয়াতির গল্প) থাকে, অনেকে দ্বিতীয়টিই বেছে নেয়। মর্টন বলেন, ‘অ্যাপোলো অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকান সরকার কাজের ক্ষেত্রে কতটা শক্তিশালী, তা দেখানো। আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উদ্দেশ্য হলো সেই সরকার মানুষকে মিথ্যা বিশ্বাস করানোর ক্ষেত্রে কতটা শক্তিশালী তা প্রমাণ করা।’ এই জালিয়াতির গল্প ডালপালা মেলতে পেরেছে; কারণ ১৯৭২ সালের পর আর কোনো চন্দ্রাভিযান হয়নি আর্টেমিস–২ অভিযানের আগপর্যন্ত। তাই ১৯৭০-এর দশকের সেই অবিশ্বাসের যুগে মানুষের কাছে এই জালিয়াতির গল্পগুলোই বেশি স্বস্তিদায়ক মনে হতে শুরু করেছিল।

এই ভুল ধারণার দায়ভারের কিছুটা জেমস বন্ডকেও দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের সিনেমা ডায়মন্ডস আর ফরএভার-এ দেখা যায়, শন কনারি একটি ক্যাসিনোর ভেতর দিয়ে নাসার এক স্থাপনায় ঢুকে পড়েছেন। সেখানে দেখা যায়, চাঁদের মতো সাজানো একটি সেট, যেখানে মহাকাশচারীরা মহড়া দিচ্ছেন। সেখান দিয়েই শুরু হয় এক পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। তবে এটি ছিল নেহাতই একটি কৌতুক। ১৯৭৮ সালের রোমাঞ্চকর সিনেমা ক্যাপ্রিকর্ন ওয়ান যখন মুক্তি পেল, তত দিনে সরকারের জালিয়াতিকে আর কৌতুক হিসেবে মানুষ মনে করতে পারল না। এই সিনেমার গল্প ছিল মঙ্গল গ্রহের এক ব্যর্থ অভিযান নিয়ে, যেখানে সত্য আড়াল করতে সরকার জালিয়াতির আশ্রয় নেয় এবং মহাকাশচারীদের হত্যার পরিকল্পনা করে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি–পরবর্তী সেই সময়ে আমেরিকান সরকারের পক্ষে এত বড় মিথ্যা বলা সম্ভব, এমন ধারণা মানুষের কাছে বেশ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিনোদনমূলক রূপ

ষাট ও সত্তরের দশকে মানুষের মুখে মুখে একটি কথা ফিরত, ‘আমরা যদি মানুষকে চাঁদে পাঠাতে পারি, তবে কেন অমুক কাজটা করতে পারছি না?’ কিশোর আলোর ১১০তম মিটিংয়েও এমন আলোচনা চলে এল। আমরা যদি চাঁদে যেতে পারি, ক্যানসার কেন নির্মূল করতে পারছি না? আসলে আমেরিকা এত শক্তিশালী একটা রাষ্ট্র, সরকার চাইলে একটি অসাধ্য লক্ষ্য পূরণ করতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধে জিতবে। তাদের দেশে কোনো শহরে আর হোমলেস মানুষ থাকবে না বা ক্যানসারের ওষুধ তারা আবিষ্কার করে ফেলবে। এ রকম আরও বহু আছে, তারা চাইলেই ইরান যুদ্ধে জিতে যাবে না। সরকার আসলে ততটা শক্তিশালী নয়, যতটা মানুষ এসব যুক্তি দেওয়ার সময় বলার চেষ্টা করে। ক্যানসারের প্রসঙ্গ এনে মানুষ আসলে চাঁদে অভিযান নিয়ে জালিয়াতির গল্পকে উসকে দিতে চায়।

চন্দ্রাভিযান নিয়ে এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খেয়াল করলে দেখবে, এখানে কী ঘটেছে তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয় কী ঘটেনি, তা নিয়ে। অবিশ্বাসকারীরা সবাই কিন্তু একই রকম করে ভাবে না। এদের মধ্যে ভাগ আছে। কেউ ভাবে আগের অভিযানগুলোও ভুয়া। যেহেতু আর্টেমিস–২ মহাকাশযান চাঁদে নামেনি। আবার কেউ লাইকা নামের কুকুর বা ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশে যাওয়া নিয়েও সন্দেহ করে। শুরুর দিকে এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ কাজ করত। কিন্তু এখন এটি একরকম বিনোদন। রিল বানিয়ে বেশি ভিউ অর্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব না বিনোদন, সেটা স্পষ্ট করে তুমি আর আলাদা করতে পারবে না।

অভিযানে যুক্তদের প্রতিক্রিয়া

যদিও এটি চাঁদে অভিযানে যুক্ত থাকা মানুষদের জন্য বেশ বিরক্তিকর। যেমন ২০০২ সালে বাজ অলড্রিন এক ষড়যন্ত্রকারীকে ঘুষি মেরেছিলেন। আধুনিক ইন্টারনেটের যুগে ইউটিউবে ভিডিও খুঁজলে বহু জালিয়াতিবিষয়ক তথ্যচিত্র পাবে। খেয়াল করলে দেখবে, সেগুলো রাশিয়ার পক্ষ থেকে বানানো হয়নি। আমেরিকার অভিযান নিয়ে আমেরিকার শত্রুদেশ যেখানে প্রশ্ন করছে না, চীন যেখানে প্রশ্ন করছে না। তারা যদি প্রমাণ করতে পারত যে আমেরিকা মিথ্যা বলেছে, তাহলে রাশিয়ানরা নিজেদের সম্মান পুনরুদ্ধার করার একটি দারুণ সুযোগ পেতেন। চীনারা নিজেদের শক্তিশালী আর আমেরিকাকে দুর্বল দেখাতে পারতেন। সেটা ঘটেনি!

আসলে সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সত্য প্রকাশ করার মতো সব প্রযুক্তিই ছিল। তারা সবকিছু আড়ি পেতে শুনছিল। রুশ মহাকাশচারী আলেক্সেই লিওনোভ কয়েক বছর আগে বলেছেন, ‘আমরা রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে বসে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম। আমরা মনেপ্রাণে চেয়েছিলাম, ওরা সফল হোক। আমরা জানতাম, কারা সেই মহাকাশযানে আছে, ওরাও আমাদের চিনত।’

সময় যত গড়িয়ে যায়, সাক্ষীরা বিদায় নিতে থাকে, ততই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা মুছে যেতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা বড় গণহত্যার ক্ষেত্রেও এটি ঘটে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও এমন দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধারা মারা যেতে থাকেন। একই সময়ে যদি কেউ মিথ্যা বলে বা অস্বীকার করে, তখন সাক্ষীর অভাবে সেটা প্রমাণ করা কঠিন হতে থাকে। একসময় ইতিহাস আর বাস্তবতার বদলে কাল্পনিক গল্পগুলোই আলোচনার মূল হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যতের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

বেশির ভাগ ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করা মানুষ বিষয়টিকে একটি সাময়িক মজার বিষয় হিসেবে দেখে। নাসা আবার চাঁদে গেল, মানুষ চাঁদে ফিরল, এখন নতুন করে চাঁদে যাওয়া নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই তত্ত্বের জায়গা দখল করে নেবে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে নতুন কোনো জালিয়াতির গল্প, এটা আগেভাগেই বলে দেওয়া যায়। এখন যেমন চলছে, আর্টেমিস চাঁদে গেল, নভোচারীরা নামলেন না কেন? সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের বলব, একটা সার্চ করো না? একটু নিজের এআই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করো, ডিটেইল জেনে যাবে।

তবু তোমাদের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন আর উত্তর না দিয়ে পারা গেল না। দেখো, কোনোটি তোমার চোখে পড়েছে কি না।

প্রশ্ন ও উত্তর

১. আর্টেমিস–২ চাঁদে নামেনি কেন?

সন্দেহ: যদি সত্তরের দশকে মানুষ চাঁদে নামতে পারে, তবে ২০২৬ সালে এসে আর্টেমিস–২ কেন কেবল চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবে? তাদের দাবি, নাসা আসলে চাঁদে নামার প্রযুক্তিই হারিয়ে ফেলেছে বা আগেরবার নামেনি।

উত্তর: এটি প্রযুক্তির অভাব নয়; বরং একটি পরিকল্পিত ‘টেস্ট ফ্লাইট’। অ্যাপোলো মিশনের সময়ও অ্যাপোলো–৮ ও ১০ মিশনগুলো চাঁদে না নেমে কেবল কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে ফিরে এসেছিল। মানুষ নিয়ে চাঁদে নামার আগে মহাকাশযানের জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা ও গভীর মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার ক্ষমতা পরীক্ষা করা জরুরি। আর্টেমিস–২ মিশনের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আর্টেমিস–৪ মিশনে মানুষ চাঁদে নামবে। ধাপে ধাপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এগোনোর প্রক্রিয়া।

আবার অ্যাপোলোর সময় নাসা অনেক ঝুঁকি নিয়েছিল। আর্টেমিস মিশনে নাসা মহাকাশচারীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। অ্যাপোলোর লক্ষ্য ছিল কেবল পদচিহ্ন রাখা, কিন্তু আর্টেমিসের লক্ষ্য হলো চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা। এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরনের রকেট (এসএলএস) ও ক্যাপসুল (অরায়ন) তৈরি করতে হয়েছে, যা আগের প্রযুক্তির চেয়ে হাজার গুণ বেশি জটিল এবং উন্নত। মানুষের চাঁদে নামা দেখতে আর্টেমিস–৪ অভিযান পর্যন্ত অপেক্ষা করো।

২. স্পেসস্যুট কেন এমন হালকা?

সন্দেহ: অ্যাপোলোর সময়কার স্পেসস্যুটগুলো দেখতে অনেক ভারী এবং মজবুত ছিল। আর্টেমিস মিশনে যে আধুনিক স্যুটগুলো দেখানো হচ্ছে, সেগুলো দেখতে পাতলা এবং সিনেমার পোশাকের মতো। তাদের দাবি, এগুলো আসলে মহাকাশে সুরক্ষা দিতে পারবে না।

উত্তর: গত ৫০ বছরে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। অ্যাপোলোর স্যুটগুলোতে হাঁটাচলা করা খুব কঠিন ছিল (আর্মস্ট্রং বারবার পড়ে যাচ্ছিলেন)। আধুনিক স্যুটগুলো অনেক বেশি নমনীয় এবং হালকা উপাদান দিয়ে তৈরি। এই পোশাক মহাকাশচারীদের হাত-পা সহজে নাড়াতে সাহায্য করবে। আধুনিক স্যুটগুলো পাতলা মনে হলেও এগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী রেডিয়েশন ফিল্টার করে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সাজানো। এর সঙ্গে পুরোনো ডায়াল টেলিফোনের সঙ্গে আধুনিক স্মার্টফোনের পার্থক্যের তুলনা করে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারো।

৩. ক্যামেরার ছবির মান বা রেজোল্যুশন নিয়ে প্রশ্ন

সন্দেহ: নাসা কেন আর্টেমিস–২ মিশনের একদম নিখুঁত লাইভ ভিডিও দেখায়নি? যদি ভিডিওটি একটু ঝাপসা হয় বা সিগন্যাল কেটে যায়, তবে নাসা এর মাধ্যমে জালিয়াতি লুকিয়ে রাখবে।

উত্তর: মহাকাশ থেকে তথ্য পাঠানো ইউটিউব ভিডিও আপলোড করার মতো সহজ কাজ নয়। কারণ, এতে ব্যান্ডউইডথের সীমাবদ্ধতা আছে। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বে হাই ডেফিনেশন ভিডিও সিগন্যাল পাঠানো বেশ বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ। সিগন্যালটি ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আসতে হয়। আবার সূর্য থেকে আসা তেজস্ক্রিয় কণা অনেক সময় রেডিও সিগন্যালে ব্যাঘাত ঘটায়। এই যান্ত্রিক গোলযোগগুলোই প্রমাণ করে, মিশনটি সত্যিকারের মহাকাশে ঘটেছে, কোনো স্টুডিওতে নয়।

আবার পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। ফলে রেডিও সিগন্যাল যেতে-আসতে প্রায় ১ দশমিক ৩ সেকেন্ড সময় লাগে। এই ‘ডিলে’ বা দেরি হওয়াটাই প্রমাণ করে, সিগন্যালটি মহাকাশ থেকে আসছে। নাসা এখন লেজার কমিউনিকেশন ব্যবহার করছে, যা দিয়ে মহাকাশ থেকে উচ্চমানের ভিডিও পাঠানো সম্ভব, তবে তা কখনোই ভিডিও গেমের মতো ‘ইনস্ট্যান্ট’ হবে না।

৪. চাঁদ কেন সাদা-কালো দেখায়?

সন্দেহ: অনেকে সন্দেহ করে, নাসা কেন অ্যাপোলো অভিযানের মতো আর্টেমিসের ভিডিওগুলোকেও সাদা-কালো বা ধূসর দেখাচ্ছে? তাদের মতে, এটি জালিয়াতি আড়াল করার একটি কৌশল।

উত্তর: এটি কোনো যান্ত্রিক কারসাজি নয়, বরং চাঁদের মাটির আসল বৈশিষ্ট্য। চাঁদের মাটি মূলত সিলিকা, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ আগ্নেয়গিরির পাথুরে গুঁড়া দিয়ে তৈরি, যা প্রাকৃতিকভাবেই ধূসর বর্ণের। চাঁদে বায়ুমণ্ডল না থাকায় সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে ও তীব্র প্রতিফলন তৈরি হয়। ফলে ছায়াগুলো একদম ঘন কালো হয় এবং আলোকিত অংশগুলো অতিরিক্ত উজ্জ্বল দেখায়। এই ‘হাই কনট্রাস্ট’ পরিবেশের কারণেই চাঁদকে আমাদের চোখে ধূসর বা সাদা-কালো মনে হয়।

৫. স্টারলিংক বা স্যাটেলাইট কেন ছবি বা ভিডিওতে দেখা যায়নি

সন্দেহ: এখন পৃথিবীর চারপাশে হাজার হাজার স্টারলিংক ও অন্যান্য স্যাটেলাইট আছে। সন্দেহবাদীদের প্রশ্ন হলো, আর্টেমিস–২ মিশনের ফুটেজে কেন এই স্যাটেলাইটগুলো দেখা যাবে না? যদি না দেখা যায়, তবে সেটা জালিয়াতি।

উত্তর: মহাকাশ বিশাল বড় একটি জায়গা। স্যাটেলাইটগুলো আকারে বেশ ছোট ও সেগুলো অরায়ন মহাকাশযান থেকে শত শত মাইল দূরে ছিল। ক্যামেরার লেন্সে এগুলোকে বড়জোর একটি ধূলিকণার মতো দেখাবে, যদি না সেগুলো একদম কাছে থাকে। অরায়ন যখন পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়েছে, তখন এর গতিবেগ স্যাটেলাইটগুলোর চেয়ে অনেক অনেক বেশি ছিল। ফলে সেগুলো আলাদাভাবে শনাক্ত করা কঠিন।