বনি ইসরায়েল থেকে আধুনিক ইসরায়েল: ইতিহাস, সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন
বনি ইসরায়েল থেকে আধুনিক ইসরায়েল: ইতিহাস ও সংঘাত

বনি ইসরায়েলের চার হাজার বছরের ঐতিহাসিক যাত্রা

কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তেহরানের এক সড়কের পাশের দেয়ালচিত্রে ইহুদি জাতির প্রাচীন ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। এই জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো, যার সূচনা কেনান অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধারা থেকে বনি ইসরায়েলের উদ্ভব ঘটে, বিশেষত হজরত ইসহাক (আ.) ও হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে। হজরত ইয়াকুব (আ.) ‘ইসরায়েল’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর বংশধরেরাই বনি ইসরায়েল নামে পরিচিত।

নবী-রাসুলদের মাধ্যমে ধর্মীয় নির্দেশনা

বনি ইসরায়েলের মধ্যে বহু নবী-রাসুল প্রেরিত হয়েছিলেন, যেমন হজরত মুসা (আ.), হজরত দাউদ (আ.), হজরত সুলাইমান (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.)। তাঁদের মাধ্যমে এই জাতি ধর্মীয় ও সামাজিক দিকনির্দেশনা লাভ করলেও ইতিহাসে বারবার অবাধ্যতা ও বিচ্যুতির কারণে তারা শাস্তি ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.) মিসরের শাসনকর্তা হয়ে তাঁর পরিবারকে সেখানে নিয়ে আসেন, যার ফলে বনি ইসরায়েল মিসরে বসবাস শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে ফারাওদের অধীনে চলে যায়।

মিসর থেকে মুক্তি ও ফিলিস্তিনে প্রবেশ

মিসরে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সময় বনি ইসরায়েল স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ফেরাউনের শাসনে তারা দাসত্ব ও নির্যাতনের শিকার হয়। হজরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে তারা মিসর ত্যাগ করে এবং লোহিত সাগর অতিক্রম করে মুক্তি লাভ করে। তবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে তারা ৪০ বছর সিনাইয়ে ঘুরে বেড়ায়। পরে হজরত ইউশা বিন নুন (আ.)-এর নেতৃত্বে তারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাষ্ট্র গঠন ও পতনের চক্র

ফিলিস্তিনে প্রথমে বিচারকদের মাধ্যমে শাসন চললেও পরবর্তী সময়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তালুত (আ.), দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর সময়ে বনি ইসরায়েলিদের প্রথম রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ ইসরায়েল রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা প্রায় ১২০ বছর স্থায়ী ছিল। সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে প্রথম রাজ্য দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দ্বিতীয় রাষ্ট্র হিসেবে সৃষ্টি হয়:

  • উত্তরাঞ্চল ইসরায়েল
  • দক্ষিণাঞ্চল ইয়াহুদা

উত্তর রাজ্য খ্রিষ্টপূর্ব ৭২২ সালে অ্যাসেরীয়দের হাতে এবং দক্ষিণ রাজ্য খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ব্যাবিলনীয়দের হাতে পতিত হয়। এতে ইহুদিরা নির্বাসিত হয়, যা ইতিহাসে ইহুদিদের প্রথম নির্বাসন নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে পারস্য সম্রাট সাইরাস তাদের জেরুজালেমে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন।

গ্রিক ও রোমান শাসন এবং নির্বাসন

গ্রিক শাসনামলে হেলেনীয় সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পায়, যার বিরুদ্ধে মাক্কাবি বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং বনি ইসরায়েলিরা তৃতীয়বারের মতো একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ সালে রোমানরা এই রাষ্ট্রেরও অবসান ঘটায়। রোমান শাসনের সময় ৭০ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম ধ্বংস হলে ইহুদিরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে; যা ইতিহাসে ইহুদিদের দ্বিতীয় বৃহৎ নির্বাসন হিসেবে পরিচিত।

মুসলিম শাসন ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

পরবর্তী সময়ে তারা খ্রিষ্টান ও মুসলিম শাসনের অধীনে বসবাস করে। ৬৩৬ সালে খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর আমলে জেরুজালেম মুসলিমদের অধীনে আসে, যেখানে ইহুদিরা দীর্ঘ সময় বসবাসের সুযোগ পায়। আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি হয় ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে ইহুদি নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে ব্যাপক অভিবাসন ঘটে এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব: আধুনিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত

বর্তমানে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব আধুনিক ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামরিক প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল, মধ্যপাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের সহযোগী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক কৌশল, আঞ্চলিক প্রভাব ও প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও হুমকি

আমেরিকান সাবেক কর্নেল ডেভিস তাঁর চ্যানেলে বলেছেন, ‘আমেরিকা-ইসরায়েল মিলে চেষ্টা করলেও ইরানকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। কেননা আমেরিকার সেই সামরিক সক্ষমতা বর্তমানে নেই; যদি না পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, আর আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্র কোনো দিনই ব্যবহার করবে না।’ সমসাময়িক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংঘাত সরাসরি সামরিক জয়ের চেয়ে কৌশলগত টিকে থাকার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ইরান অসম যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি আমেরিকার এবিসি নিউজের এক সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘ইরান ঠিকই এই যুদ্ধের পর উঠে দাঁড়াবে নিজের শক্তি দিয়ে। আর আমেরিকার সাহায্য ছাড়া উঠে দাঁড়াতে ৪০ বছর লেগে যাবে ইসরায়েলের।’ ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বলেছেন, ‘ইসরায়েল-আমেরিকা যদি স্থল অভিযান শুরু করে, তবে তাদের জন্য ৭০ লাখ তরুণ ইরানি অস্ত্র হাতে অপেক্ষায় রয়েছে।’

সভ্যতার দাবি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে প্রস্তরযুগে ফেরত পাঠানোর হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ‘ইরান কোনো দেশ নয়, একটা সভ্যতা। আমেরিকানরা যখন গুহায় বাস করত, তখন সাইরাস দ্য গ্রেট ইরানে বসে মানবাধিকার রচনা করছিলেন।’ ইরান হয়তো ‘ইউ আর উইনিং, ইফ ইউ আর নট লুজিং’ তত্ত্ব অনুসরণ করছে। তারা জেতার চেষ্টা নয়, টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

তাহলে মাত্র ২০০ বছরের দেশ আমেরিকা আর ৭৮ বছরের দেশ ইসরায়েল কী করে ৬০০০ বছরের পুরোনো সভ্যতার দেশ ইরানকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে নিতে চাইছে—বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন এখন এটাই? এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।