হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে আকস্মিকভাবে সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মিত্র সৌদি আরব তাদের বিমানঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ট্রাম্পের এই পিছুটান। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, গত রোববার ট্রাম্প কারও সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই হুট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর ঘোষণা দিলে সৌদি নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি প্রার্থনার জবাবে সৌদি আরব সাফ জানিয়ে দেয়, তারা রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন সামরিক বিমান ওড়াতে দেবে না। এমনকি এই অভিযানে সহায়তা করার জন্য সৌদি আকাশসীমাও ব্যবহার করা যাবে না। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, সংকট নিরসনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ফোনালাপ হলেও কোনো সমাধান আসেনি। শেষ পর্যন্ত আকাশসীমা ও ঘাঁটির সুবিধা ফিরে পেতে ট্রাম্প এই অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হন।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে কাতার ও ওমানের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও বিস্মিত হয়েছে। কাতার নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্প তখনই কথা বলেন যখন অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের একজন কূটনীতিক জানান, ওমান সরকারের সঙ্গেও ট্রাম্প আগে কোনো সমন্বয় করেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কূটনীতিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আগে ঘোষণা দিয়েছে, পরে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।’ তবে তিনি এও যোগ করেন যে, এতে তারা মনঃক্ষুণ্ন হননি।
মার্কিন সামরিক পরিভাষায় মিত্র দেশের জমি ব্যবহারের অনুমতিকে বলা হয় ‘এবিও’ (এক্সেস, বেসিং এবং ওভারফ্লাইট)। এই অভিযানের জন্য সৌদি আরব ও জর্ডানের বিমানঘাঁটি এবং কুয়েত ও ওমানের আকাশসীমা ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়া হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কোনো অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে জাহাজগুলোকে সুরক্ষার আওতায় রাখতে আকাশপথে নজরদারি ছিল অপরিহার্য।
ইরানের অবরোধ ভাঙতে ট্রাম্প ঘটা করে এই অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত মঙ্গলবারও পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযানের সাফল্য নিয়ে কথা বলছিলেন। কিন্তু এর মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্প নিজেই সব থামিয়ে দেন। অভিযান বন্ধের আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল, তাদের পাহারায় দুটি মার্কিন জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেছেন, একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি সই হওয়ার সুযোগ দিতেই এই অভিযান ‘সাময়িক বিরতি’ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান। বুধবার ওভাল অফিস থেকে ট্রাম্প জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দুই পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে এবং ইরান এখন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী।
নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে তিনি দ্রুত একটি সমাধান চাইছেন। পিবিএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আগামী সপ্তাহে চীন সফরে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দেখা করার আগেই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি এও হুঁশিয়ারি দেন যে, আলোচনা ব্যর্থ হলে তিনি আবারও ইরানে ভয়াবহ হামলা শুরু করবেন।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সেখানে দুটি বিশাল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার মোতায়েন আছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এবং এর আগের বোমাবর্ষণ অভিযান ‘এপিক ফিউরি’ দুটি আলাদা বিষয়। ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, ‘আমি মনে করি যুদ্ধ থামার ভালো সুযোগ আছে। কিন্তু যদি ইরান কথা না শোনে, তবে তাদের ওপর এমন বোমা হামলা হবে যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না।’



