বেলজিয়ামে ইসরাইলগামী ব্রিটিশ সামরিক সরঞ্জাম জব্দ
যুক্তরাজ্য থেকে ইসরাইলের উদ্দেশে পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের দুটি চালান জব্দ করেছে বেলজিয়াম। দেশটির সরকার ইসরাইলগামী কোনো সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী বিমানকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার বা যাত্রাবিরতি করতে দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তদন্ত ও জব্দের সময়সূচি
বুধবার (১৫ এপ্রিল) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত মাসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডিক্লাসিফাইড, বেলজিয়ান এনজিও ভ্রেডেসঅ্যাক্টি, আইরিশ ওয়েবসাইট দ্য ডিচ এবং ফিলিস্তিনি ইয়ুথ মুভমেন্ট সম্মিলিতভাবে ব্রাসেলস কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল যে লিঁয়জ বিমানবন্দর হয়ে যুক্তরাজ্য থেকে ইসরাইলে অস্ত্রের চালান যাচ্ছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৩ মার্চ ব্রিটেন থেকে রওনা হওয়া চালান দুটি ২৪ মার্চ বেলজিয়ামের লিঁয়জ বিমানবন্দরে জব্দ করা হয়। এক বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী চালান দুটি পরীক্ষা করে সেখানে ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম এবং সামরিক বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ খুঁজে পান, যা যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
ফৌজদারি তদন্ত ও প্রতিষ্ঠানের নাম
এই ঘটনায় বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটি। তদন্তে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বেলজিয়ামের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গোপন রাখলেও দক্ষিণ বেলজিয়ামের ওয়্যালুন আঞ্চলিক সরকার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি হলো মুগ, যা একটি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং যাদের কারখানা যুক্তরাজ্যে অবস্থিত। ডিক্লাসিফাইডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরেও উলভারহ্যাম্পটনে অবস্থিত এই কোম্পানির কারখানা থেকে বেলজিয়াম হয়ে ইসরাইলে পণ্য পাঠানো হয়েছিল। মুগ মূলত ইসরাইলি পাইলটদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত এম-৩৪৬ বিমানের জন্য যন্ত্রাংশ তৈরি করে থাকে।
রফতানি পদ্ধতি ও অতীত চালান
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সামরিক সরঞ্জামগুলো যুক্তরাজ্য থেকে সামরিক উপাদান হিসেবে নয়, বরং সাধারণ ‘এয়ারক্রাফট কম্পোনেন্ট’ (উড়োজাহাজের সরঞ্জাম) হিসেবে রফতানি করা হচ্ছিল। ট্র্যাকিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, মুগ কোম্পানি থেকে অন্তত ১৭টি চালান যুক্তরাজ্য থেকে লিঁয়জ বিমানবন্দর হয়ে ইসরাইলে পাঠানো হয়েছে।
একটি তথ্যের অধিকার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, বেলজিয়াম হয়ে ইসরাইলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো চিঠিপত্র বা তথ্য তাদের কাছে নেই।
ব্রিটেনের নীতি ও লাইসেন্স স্থগিত
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সরকার ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ৩৫০টি লাইসেন্সের মধ্যে ৩০টি স্থগিত করেছিল। গাজায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ‘স্পষ্ট ঝুঁকি’ থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ব্রিটেনের বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে, গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন সব সরঞ্জাম রপ্তানি তারা বন্ধ রেখেছে।
যথাযথ লাইসেন্স ছাড়া এ ধরনের পণ্য রপ্তানি করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। অন্যদিকে ওয়্যালুন সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, "আমাদের দৃষ্টিতে এই পণ্যগুলোর ট্রানজিট লাইসেন্স প্রয়োজন ছিল। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং আইন বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেব।"
বেলজিয়ামের দৃঢ় অবস্থান
বেলজিয়াম সরকারের আরেক মুখপাত্র সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ট্রানজিট লাইসেন্সের জন্য কোনো আবেদন করা হয়নি; যদি করা হতোও, তবে তা প্রত্যাখ্যান করা হতো। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসরাইলের সামরিক সরবরাহ নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে, বিশেষ করে গাজা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে।
বেলজিয়ামের এই পদক্ষেপ তাদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার দৃঢ় প্রত্যয় প্রদর্শন করেছে, যা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।



